Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৬ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

ফুটবলে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন তুলে দিয়েছিল প্রিয়-ই

দু’দিন পরেই লস অ্যাঞ্জেলেসের বিল্টমোর হোটেলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির তখনকার সভাপতি সামারাঞ্চের সঙ্গে দেখা করে প্রিয় ভারতে অলিম্পিক গেমসে

চিরঞ্জীব
২১ নভেম্বর ২০১৭ ০৩:৫২
সংগঠক: ক্রীড়া প্রশাসনে আলাদা সম্মান আদায় করে নিয়েছিলেন প্রিয়রঞ্জন। —ফাইল চিত্র

সংগঠক: ক্রীড়া প্রশাসনে আলাদা সম্মান আদায় করে নিয়েছিলেন প্রিয়রঞ্জন। —ফাইল চিত্র

১৯৮৩। দিল্লিতে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির অধিবেশন। অশোক হোটেলে কথা হচ্ছিল তদানীন্তন ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জের সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে জানাই, তার আগের বছর ভারতের জাতীয় ফুটবল টুর্নামেন্ট সন্তোষ ট্রফিতে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলা ও গোয়া। শুনে ফিফা সভাপতি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, চ্যাম্পিয়ন তো হয় একটাই টিম।

হ্যাভেলাঞ্জের মিটিং রুমে যখন কথা হচ্ছে, তখন বাইরে অপেক্ষা করছেন তদানীন্তন এআইএফএফ সভাপতি খলিফা জিয়াউদ্দিন। কলকাতার সাংবাদিকের সঙ্গে কথা শেষ হতেই হ্যাভেলাঞ্জ ডাকলেন জিয়াউদ্দিনকে।

হ্যাভেলাঞ্জের প্রশ্ন, ‘খলিফা, এ কী ব্যাপার? তোমাদের দেশে চ্যাম্পিয়ন আবার এক সঙ্গে দু’টো দল হয় নাকি? এর পর যেন কখনও এমনটা না হয়। বিশ্বকাপ, অলিম্পিকে এটা হয় না।’

Advertisement

হ্যাভেলাঞ্জের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর সোজা গিয়ে গোটা ঘটনাটা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সিকে বললাম। প্রিয় তখন এআইএফএফের অন্যতম কর্তা। সবটা শুনে প্রিয় বলল, ‘তুমি কিন্তু এটা খবর করবে। আমার কোনও প্রতিক্রিয়া দেবে না। তুমি খবর করার পর এআইএফএফের অন্য সদস্যদের বলে এগজিকিউটিভ কমিটির মিটিংয়ে এটা তুলব। যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ব্যাপারটা তুলে দিতে হবে। সত্যিই তো, বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকে না থাকলে ভারতীয় ফুটবলেই বা কেন থাকবে?’

আরও পড়ুন: শ্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি (১৯৪৫-২০১৭)

এআইএফএফের এগজিকিউটিভ কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি উঠতেই জিয়াউদ্দিন বুঝতে পারেন, অন্য সদস্যরা প্রিয়রঞ্জনকে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে কতটা সম্মান করেন। তা ছাড়া, প্রিয় রাজনীতির লোক। ওর চালে মাত হয়ে যায় জিয়াউদ্দিন। উনি ১৯৮৯ পর্যন্ত এআইএফএফের সভাপতি ছিলেন ঠিকই, তবে ১৯৮৩-র পর ভারতীয় ফুটবল থেকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়নের মতো হাস্যকর জিনিসটা এক রকম উঠে যায়। যার নেপথ্য কারিগর প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি।

প্রিয়র সঙ্গে পরিচয় গত শতকের ছয়ের দশকের গোড়ায়। তখন আমি সাংবাদিক হলেও মাঠের রিপোর্টার হইনি। প্রিয়ও শুধু রাজনীতিবিদ, ক্রীড়া সংগঠক হয়নি। এর পর দু’জনেই খেলার মাঠের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ফলে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ল। আমার চেয়ে সাত বছরের ছোট প্রিয়। সম্পর্কটা ছিল দাদা-ভাইয়ের।

ফুটবলকে প্রিয় কত ভালবাসত, দিল্লিতে ওর কত প্রভাব ছিল, সেটা সে দেখিয়ে দিয়েছিল ১৯৮২-তে কলকাতায় প্রথম জওরলাল নেহরু গোল্ড কাপ ফুটবলের আয়োজন করে। তখনও সল্টলেক স্টেডিয়াম বা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন তৈরি হয়নি। খেলা হয়েছিল ইডেন গার্ডেন্সে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গাঁধীকে দিয়ে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করিয়ে প্রিয় চমকে দিয়েছিল।

তবে ক্রী়ড়া সংগঠক ও ইস্টবেঙ্গল সমর্থক প্রিয়রঞ্জনকে শুধু ফুটবলের মধ্যে আটকে রাখাটা ভুল। সেটা বুঝেছিলাম ১৯৮৪-তে মার্কিন মুলুকে, লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকসে গিয়ে। ভারতীয় হকি দলের প্রথম ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামে চা-কফির স্টলে হঠাৎই দেখা প্রিয়র সঙ্গে, ওর সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় (বর্তমানে তৃণমূল সাংসদ)। প্রিয় বলল, ‘রোজই ভারতীয় হকি দলের খেলা দেখতে আসব। গ্যালারিতে বসে চিৎকারও করব।’ প্রিয়র হাতে দেখি ছোট সাইজের জাতীয় পতাকা।

একদিন প্রিয় বলল, ‘ভারতে অলিম্পিক্স গেমস করলে কেমন হবে? তুমি তো মস্কো, লস অ্যাঞ্জেলেস দু’জায়গাতেই অলিম্পিক্সের প্রস্তুতি দেখেছ।’’ বললাম, তুমি মূলত ফুটবলের লোক। বিশ্বকাপ ফুটবল করলে কেমন হয়? প্রিয় বলল, ‘সেটা সম্ভব নয়। বিশ্বকাপ করতে গেলে অনেকগুলো স্টেডিয়াম দরকার দেশের বিভিন্নি শহরে। সেই পরিকাঠামো আমাদের নেই।’ প্রিয়র যুক্তি ছিল, ১৯৮২-তে এশিয়ান গেমস হওয়ায় অলিম্পিক্স করার উপযোগী আধুনিক পরিকাঠামো দিল্লিতে তৈরি হয়েছে। সেটাকেই আরও উন্নত করে তুলতে বোধহয় খুব বেশি খরচ হবে না। প্রিয় বলে, ‘প্রস্তাবটা আমি মিসেস গাঁধীকে দেব। তুমি দেখো, উনি ঠিক ব্যবস্থা করবেন।’

দু’দিন পরেই লস অ্যাঞ্জেলেসের বিল্টমোর হোটেলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির তখনকার সভাপতি সামারাঞ্চের সঙ্গে দেখা করে প্রিয় ভারতে অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করার প্রস্তাব পেশ করেছিল। ভারতের কোনও শহর এখনও অলিম্পিক্সের আয়োজন করতে পারেনি, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে প্রিয়র ওই উদ্যোগ ছিল অবশ্যই প্রশংসনীয়।

দেশে ফিরে প্রিয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানায়। ইন্দিরা গাঁধী প্রাথমিক সায়ও দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রিয়র স্বপ্ন শেষ হয়ে যায় সে বছরই ইন্দিরার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে।

প্রিয়র আর একটা স্বপ্নও সত্যি হয়নি। সেটা অবশ্য ফুটবল নিয়ে। ২০০৬-এর সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ব্রাজিলে যান। ব্রাজিল ফুটবলের দেশ। প্রিয় চেয়েছিল, ওই সফরে ফুটবল নিয়ে ব্রাজিলের সঙ্গে আমাদের ‘মউ’ স্বাক্ষরিত হোক। যাতে ফুটবলে কলাকৌশলের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের কাছ থেকে আমরা সাহায্য পাই। মনমোনহন সিংহ মউ সই করে এলেও সেটা রূপায়িত হয়নি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্যদের একাংশের আপত্তিতে। ওটা প্রিয়র মনে খুব লেগেছিল।



Tags:
Priya Ranjan Dasmunsiপ্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি Football AIFF

আরও পড়ুন

Advertisement