Advertisement
E-Paper

‘মন চায় নতুন এক বিশ্বজয়ী’

ফাইনালকে ঘিরে নিঃসন্দেহে আবেগের স্রোত বইবে। একটা দল জিতবে, তাদের সমর্থকদের জন্য হয়তো জীবনেরই অন্য অর্থ তৈরি করে দেবে রবিবারের মস্কো। আবার এক দলের ভক্তদের স্বপ্নভঙ্গ হবে। এটাই ফুটবল।

জ়িকো

শেষ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৮ ০৩:৪৭
প্রতিপক্ষ: বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিন ­অনুশীলনে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ (বাঁ দিকে) ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে। গেটি ইমেজেস

প্রতিপক্ষ: বিশ্বকাপ ফাইনালের আগের দিন ­অনুশীলনে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচ (বাঁ দিকে) ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে। গেটি ইমেজেস

আমরা ব্রাজিলীয়রা ফুটবলকে মনে করি চলমান কবিতা। ফুটবল সত্যিই কিছু কিছু সময়ে কবিতার মতোই। মনেপ্রাণে চাইব, আজ বিশ্বকাপ ফাইনালে যে-ই জিতুক বা হারুক, ফুটবল যেন সুন্দর হয়ে ওঠে।

ফাইনালকে ঘিরে নিঃসন্দেহে আবেগের স্রোত বইবে। একটা দল জিতবে, তাদের সমর্থকদের জন্য হয়তো জীবনেরই অন্য অর্থ তৈরি করে দেবে রবিবারের মস্কো। আবার এক দলের ভক্তদের স্বপ্নভঙ্গ হবে। এটাই ফুটবল। তার গোলাকার আকৃতির মতোই জীবনটাও একটা বৃত্তের মতো। বিশ্বকাপে যে বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে চলেছে রবিবার।

দুঃখিত, আমি বোধ হয় একটু বেশি দার্শনিক হয়ে পড়ছি। আসলে এই খেলাটা আমাকে এত কিছু দিয়েছে যে, লিখতে বসলেই নানা রকম আবেগ এসে ভিড় করে। ফুটবল মাঠে সময় কাটানোর ফলে আমি যে এটাও জানি, ফুটবল যেমন ভরিয়ে দিতে পারে, তেমন নিঃস্বও করে দিতে পারে। আমি নিজে যেমন বিশ্বকাপ জিততে পারিনি। আমাদের সোনার টিম ছিল। জ়িকো, সক্রেটিসের ব্রাজিল। তবু তারা জেতেনি বিশ্বকাপ।

অস্ত্র: মাঝমাঠের লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়ার সামনে চ্যালেঞ্জ পোগবা। গেটি ইমেজেস

একটা বাচ্চা ছেলেও বলে দিতে পারবে, ফ্রান্স কত শক্তিশালী দল। প্রত্যেকটা বিভাগে ওদের দারুণ সব ফুটবলার রয়েছে। তবে ক্রোয়েশিয়াও দেখিয়ে দিয়েছে, ওদের হাল্কা ভাবে নিলে কী মারাত্মক ভুল হতে পারে। ওদের দলেও বিশ্বের সেরা ক্লাবগুলোতে খেলা অনেক ফুটবলার রয়েছে। তবু কোনও সন্দেহ নেই যে, ফ্রান্স দলটাতে প্রতিভা বেশি। ১৯ বছরের কিলিয়ান এমবাপে থেকে শুরু করে আঁতোয়া গ্রিজ়ম্যান, পল পোগবা, এনগোলো কঁতে, অলিভিয়ের জিহু— বিশ্ব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত সব নাম রয়েছে ওদের দলে। তাতেও শেষ হয় না।

ফ্রান্সের গোলকিপার হুগো লরিস বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং সেটা ও এই বিশ্বকাপে দেখিয়েও দিয়েছে। এর সঙ্গে সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের জুটি রয়েছে ওদের। বার্সেলোনার স্যামুয়েল উমতিতি এবং রিয়াল মাদ্রিদের রাফায়েল ভারান। তারা শুধু দারুণ ভাবে রক্ষণই সামলায় না, উঠে গিয়ে গোলও করে আসতে পারে। দু’জনেই এ বারের বিশ্বকাপে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি গোল করে দলকে জিতিয়েছে।

মাঠে নেমে খেলার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ফ্রান্স এবং ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলারদের জন্য জীবনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৯০ মিনিট হাজির হতে যাচ্ছে রবিবার। প্রশ্ন উঠতে পারে, ৯০ মিনিট কেন? ১২০ মিনিট পর্যন্তও তো খেলা গড়াতে পারে। এ বারের বিশ্বকাপে অতিরিক্ত সময়, টাইব্রেকারেই তো নিষ্পত্তি হচ্ছে বেশির ভাগ ম্যাচের। আমার কিন্তু কেন জানি না মনে হচ্ছে, ফাইনালের ফয়সালা হয়ে যাবে ৯০ মিনিটেই। ফ্রান্সের দিদিয়ে দেশঁ এবং ক্রোয়েশিয়ার জ্লাটকো দালিচ দারুণ রণনীতি গড়তে পারেন। ওঁরা ফুটবল কোচিংয়ে মাস্টার। তবু বিশ্বকাপ ফাইনালে হার-জিতের ফয়সালা হতে লাগে একটা ভাল বা খারাপ মুহূর্ত। শুধু স্কিলই ফাইনালে শেষ কথা বলবে না, স্নায়ুর চাপ কারা কেমন ভাবে সামলাচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, ফ্রান্স যদি প্রথমে গোল করে তা হলে ওরা গোল ধরে রাখতে পারবে। কারণ, ফ্রান্সের রক্ষণ বেশ মজবুত। ক্রোয়েশিয়া যদি আগে গোল করে দেয়, তা হলেই দেখার যে, ওরা সেটা ধরে রাখতে পারে কি না। আমার মনে হয়, ক্রোয়েশিয়া আগে গোল করলে ‘ওপেন’ ম্যাচ হবে।

বিভাগ ধরে ধরে দেখা যাক দু’দলের কারা কোথায় এগিয়ে—

গোলকিপার: সামান্য হলেও ফ্রান্সের উগো লরিস এগিয়ে ক্রোয়েশিয়ার দানিয়েল সুবাসিচের চেয়ে। সুবাসিচ খুব ভাল গোলকিপার। মোনাকোর হয়ে অনেক বছর ধরেই খুব সফল। অবিশ্বাস্য কিছু ‘সেভ’ ও এই বিশ্বকাপে করেছে। দলকে টাইব্রেকারে জিতিয়ে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি, হুগো লরিসকে দেখে আমার অন্য গ্রহের গোলকিপার মনে হয়।

রক্ষণ: স্যামুয়েল উমতিতি এবং রাফায়েল ভারানের উপস্থিতির জন্য রক্ষণেও এগিয়ে ফ্রান্স। ওরা শারীরিক ভাবেও অনেক বেশি শক্তিশালী। ক্রোয়েশিয়ার ভিদা এবং লোভেনের জুটিকে অসম্মান করছি না। তবু মানতে বাধ্য হচ্ছি, ফ্রান্সের ডিফেন্স অনেক ক্ষিপ্র এবং শক্তিশালী।

মিডফিল্ড: ফাইনালের ফয়সালা করে দিতে দু’দলের মিডফিল্ডারদের লড়াই। ফ্রান্সের এনগোলো কঁতের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদ্রিচের দ্বৈরথ খুবই আকর্ষণীয় হতে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, শুধু এই দ্বৈরথটাই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিতে পারে। যদি মদ্রিচ এই দ্বৈরথটা জিততে পারে, মেসি বা রোনাল্ডোর ছায়া থেকে অবশেষে বেরিয়ে আসতে পারবে ও। ফুটবল বিশ্ব নতুন এক নায়ককে পেতে পারে— লুকা মদ্রিচ। ক্রোয়েশিয়ার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে মিডফিল্ডে রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা জুটি লুকা মদ্রিচ ও ইভান রাকিতিচের উপরে। বিশ্বের সেরা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড জুটি ওরা। ফাইনালে লড়াইটা হবে বিশ্বের সেরা আক্রমণাত্মক জুটির সঙ্গে বিশ্বের সেরা রক্ষণাত্মক জুটি ফ্রান্সের কঁতে এবং পল পোগবার। মিডফিল্ডে ফ্রান্স রক্ষণের দিক থেকে এগিয়ে থাকবে কিন্তু আক্রমণে এগিয়ে ক্রোয়েশিয়া। মদ্রিচ ৯০ মিনিট ধরে যে কোনও ম্যাচকে শাসন করার ক্ষমতা ধরে। তবে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কঁতের সামনে আজ ওর বড় পরীক্ষা।

আক্রমণ: এই জায়গায় দু’দলই সেয়ানে-সেয়ানে। ক্রোয়েশিয়ার পেরিসিচ, মাঞ্জুকিচরা কিন্তু ফ্রান্সের গ্রিজ়ম্যান, এমবাপে, জিহুদের চেয়ে খুব একটা পিছিয়ে নেই। ক্রোয়েশিয়া ৪-১-২-২-১ ছকে খেলবে। সম্ভবত মাঞ্জুকিচকে উপরে ছেড়ে রাখবে ওরা। দেশঁ ৪-৩-৩ ছকে
খেলতে পারেন।

দেশঁ নিজে ইতিহাসের সামনে। যদি রবিবার ফ্রান্স জেতে, তা হলে মারিয়ো জাগালো এবং বেকেনবাউয়ারের পরে ত়ৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে তিনি ফুটবলার ও ম্যানেজার দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতার বিরল কীর্তি ছোঁবেন। খেলোয়াড়দের গুণগত মানের দিক থেকে দেখতে গেলে, ফাইনালে এগিয়ে ফ্রান্স। কিন্তু এই বিশ্বকাপ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে কোনও কিছুই নিশ্চিত নয়। আমরা তাই নতুন এক বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন পেতেই পারি।

এ বারের বিশ্বকাপ যে অনিশ্চয়তা আর আন্ডারডগদের প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সেটা ফুটবলপ্রেমীরা বেশ উপভোগও করেছেন।

ফ্রান্স তাই যতই প্রতিভা আর গুণগত মানে এগিয়ে থাকুক, আমার হৃদয় চায় ক্রোয়েশিয়া। ফুটবলে আসুক না এক নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!

Zico Luka Modric FIFA World Cup 2018 Croatia France Football
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy