ছেলেবেলাটা আর পাঁচ জনের মতো করে কাটেনি তাঁর। ছেলেকে আগলে রাখতে মায়ের ভরসা ছিল একটা রবারের বল। তা দিয়েই কোথা হতে যে ছেলের সময় কেটে যেত তা ঠাহর করতে পারতেন না নবদ্বীপের বেলডাঙার বাসিন্দা সুলতা বিশ্বাস। তাঁর ছেলে, অমিতবাবু কথা বলতে পারেন না। কিন্তু ছেলেবেলার সেই রবারের বলটাই হয়ে উঠল অমিতের সব প্রতিবন্ধকতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর হাতিয়ার। প্রায় গোটা শরীর দিয়েই একটা ফুটবল নিয়ে কারসাজি দেখাতে শুরু করল সে। পোশাকি ভাষায় যার নাম ‘জাগলিং।’ এখন সেটা তার দিন গুজরানের পেশাও বটে। শুধু নদিয়াই নয়, অমিতের জাগলিং দেখার জন্য আব্দার আসে ভিন জেলা থেকেও।
বুধবার দাঁইহাটের বেড়াগ্রামে লেক গার্ডেন্স ফুটবল মাঠে জাগলিং দেখাল অমিত। সাদা জার্সি পরা অমিতকে দেখামাত্রই মাঠের চারদিকে গোল করে থাকা আট থেকে আশি, সকলেরই চোখে-মুখে খানিক আগ্রহ। তারপর স্রেফ বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের ডগায় ফুটবলটা ঘোরানো শুরু করতেই হাততালির বন্যা মাঠ জুড়ে। এ দিন অমিতের জাগলারির দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পুরপ্রধান বিদ্যুৎ ভক্ত। সব দেখে তিনিও উচ্ছ্বাস চেপে না রেখে বলে ফেলেন, ‘‘প্রতিভার বিকাশে কোনওকিছুই যে প্রতিবন্ধক নয়, অমিত তার প্রমাণ।’’
শুরুটা তবে সহজ ছিল না। সুলতাদেবী নাগাড়ে বলতে থাকেন অমিত আর দুই মেয়েকে নিয়ে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। অমিতের বাবা পেশায় তাঁত শ্রমিক। তাই বাড়ির বড় ছেলে অমিতের পক্ষে শুধুমাত্র জাগলিং দেখানোর কাজটা একেবারেই সহজ ছিল না বলে জানান সুলতাদেবী। এখন অবশ্য বছর আঠারোর অমিতের রোজগারে সংসারের খানিক সুরাহা হয়। সুলতাদেবী জানান, প্রতিটি প্রদর্শনী পিছু চারশো-আটশো টাকা করে মেলে।
যদিও এ সব সাংসারিক জটিলতায় মন নেই অমিতের। জাগলিং-এর একটার পর একটা প্রদর্শনীতে মাঠ জুড়ে হাততালি পড়ামাত্রই অমিতও যেন অভিবাদন চায় তার দর্শকদের। সে অভিবাদনেও রয়েছে জাগলারির ছোঁয়া। আর ছেলের সাফল্যে খানিক চোখ ছলছল করে ওঠে সুলতাদেবীর।
ফের ভিন গাঁয়ের মাঠে জাগলারির প্রদর্শনী দেখানোর জন্য প্রস্তুতি নেয় অমিত। প্রস্তুত হন সঙ্গী সুলতাদেবীও।