• ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

টিএমসিপির কৌশল নিয়েই ময়দানে এবিভিপি, কলেজে কলেজে ফের বাড়ছে সংঘর্ষ 

ABVP-TMCP
প্রতীকী ছবি। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

Advertisement

ভোট বন্ধ হয়ে রয়েছে অন্তত তিন বছর ধরে। ২০১৬ সালের পরে আর এ রাজ্যের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। রাজ্যের প্রায় সব কলেজে সে সময়ে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে পরবর্তী তিন বছর ধরেও ছাত্র সংসদ কক্ষগুলো দখলে রেখেছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ (টিএমসিপি)। কিন্তু গত কয়েক মাসে তৃণমূলের কৌশলেই তৃণমূলকে ঘায়েল করার চেষ্টা শুরু করেছে গেরুয়া ছাত্র সংগঠন। ফলে কলেজে কলেজে ফের শুরু হয়েছে সংঘর্ষ। দ্রুত ভোটে যাওয়ার কথাও ভাবতে হচ্ছে উচ্চশিক্ষা দফতরকে।

লোকসভা ভোটের আগে থেকেই রাজ্যের নানা প্রান্তে মিটিং-মিছিল বাড়াতে শুরু করেছিল সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। উত্তর দিনাজপুরের দাঁড়িভিটে ছাত্রদের উপরে গুলি চলা এবং তার জেরে দুই ছাত্রের মৃত্যুর পরে আরও বেশি করে এবিভিপি ময়দানে নামে। লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশিত হওয়ার পরে স্বাভাবিক কারণেই আরও বেড়ে যায় গেরুয়া ছাত্র সংগঠনটির কর্মকাণ্ড। টিএমসিপির একচ্ছত্র দাপট এবং নিজেদের সংগঠনে অনর্গল রক্তক্ষরণের জেরে যখন সিপিএম এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এসএফআই ও ছাত্র পরিষদের উপস্থিতি এ রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর, তখন বিকল্পের খোঁজও শুরু হয়েছে সঙ্গত কারণেই। তাতেই অনেকখানি উঠে এসেছে এবিভিপি। সেই উত্থানকে আরও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাও শুরু হয়ে গিয়েছে।

বছর তিনেক যে হেতু ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়নি, সে হেতু বিভিন্ন কলেজের ছাত্র সংসদ কক্ষের দখল নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে এবিভিপি। সর্বত্র নয়, লোকসভা নির্বাচনে যে সব এলাকায় খুব ভাল ফল হয়েছে বিজেপির, সেই সব অঞ্চলের কলেজগুলিকেই আপাতত নিশানা করেছে গেরুয়া শিবির। প্রথমে কলেজে ইউনিট খুলছে এবিভিপি। তার পরে মিছিল বা জমায়েত করে ইউনিয়ন রুমে (ছাত্র সংসদ কক্ষ) ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে তারা। ‘‘নির্বাচন যখন হচ্ছে না, তখন ছাত্র সংসদে কেউই ক্ষমতায় নেই। তা সত্ত্বেও যদি টিএমসিপি ইউনিয়ন রুমে বসে থাকতে পারে, তা হলে আমরাও পারি,’’—বলছেন এবিভিপি পশ্চিমবঙ্গ ও আন্দামানের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অপাংশুশেখর শীল।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে যে রকম হিংসার ছবি তৈরি হচ্ছিল রাজ্যের একের পর এক কলেজে, তার প্রেক্ষিতেই ভোট বন্ধ করে দিয়েছিল উচ্চশিক্ষা দফতর। তবে যে সময়ে নির্বাচন বন্ধ হয়েছে, তত দিনে রাজ্যের প্রায় সব কলেজে সংসদ টিএমসিপির দখলে। তাই নির্বাচন বন্ধ হওয়ার পরেও টিএমসিপির কোনও সমস্যা হয়নি। শেষ নির্বাচনে সংসদ যে দলের হাতে ছিল, পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তারাই সংসদ চালাবে— এই কথা বলেই সর্বত্র ইউনিয়ন রুমে অধিষ্ঠান করছিল টিএমসিপি। রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় তৃণমূল আসীন, তাই টিএমসিপি-কে জোর করে ইউনিয়ন রুম থেকে বার করে দেওয়ার দুঃসাহসও কোনও কলেজ কর্তৃপক্ষ দেখাননি।

কিন্তু বিজেপি এ রাজ্যে তৃণমূলের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার পরিস্থিতি করতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে সঙ্ঘ পরিবারের ছাত্র সংগঠন। অপাংশুরা বলছেন, ‘‘হয় অবিলম্বে সর্বত্র ছাত্র সংসদ নির্বাচন করাতে হবে। না হলে আমরাও ইউনিয়ন রুমে ঢুকতে শুরু করব।’’

আরও পড়ুন: বারাসত আদালতেও আগাম জামিনের রক্ষাকবচ পেলেন না রাজীব কুমার

এ বারের লোকসভা নির্বাচনে গোটা উত্তরবঙ্গে একটি আসনেও জিততে পারেনি তৃণমূল। স্বাভাবিক কারণেই উত্তরবঙ্গে এখন এবিভিপির দাপট চোখে পড়ার মতো। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, দুই দিনাজপুর এবং মালদহের একাংশে টিএমসিপির সঙ্গে জোর টক্কর শুরু হয়েছে এবিভিপির। টিএমসিপির এককালের দাপুটে সভাপতি তথা বর্তমানে বিজেপি যুব মোর্চা নেতা শঙ্কুদেব পন্ডা অবশ্য বলছেন, ‘‘শুধু উত্তরবঙ্গে নয়। নদিয়া, উত্তর চব্বিশ পরগনা, হুগলি, হাওড়া, পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামেও এবিভিপি এখন খুব শক্তিশালী।’’ ভোট হলে এই সব জেলার অধিকাংশ কলেজে টিএমসিপি এখনই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে বলে শঙ্কুদেবের দাবি।

অপাংশুশেখর শীলও একই কথা বলছেন। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের যে জেলাগুলির কথা যুবনেতা শঙ্কু বলছেন, ঠিক সেগুলির কথাই উঠে আসছে ছাত্রনেতা অপাংশুর কথাতেও।

কিন্তু যতটা সহজে এই সব মন্তব্য করছেন শঙ্কুদেব বা অপাংশুশেখর, এবিভিপির জন্য কি পরিস্থিতি ততটা অনুকূল এখনও হয়েছে? অবিলম্বে নির্বাচনের দাবি গেরুয়া সংগঠনটি তুলছে ঠিকই। কিন্তু নির্বাচন হলে ক’টা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে পারবে এবিভিপি, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ যথেষ্টই। রাজ্যে কলেজের সংখ্যা ৫০০-র আশেপাশে। তার মধ্যে শ’তিনেক কলেজে এবিভিপি ইউনিট খুলেছে বলে অপাংশু জানাচ্ছেন। আর শঙ্কু বলছেন, ‘‘এর মধ্যে ১৫০ থেকে ১৭৫টা কলেজে এবিভিপি জেতার মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে।’’

টিএমসিপি অবশ্য নস্যাৎ করছে সে তত্ত্ব। সংগঠনের সহ-সভাপতি মণিশঙ্কর মণ্ডলের কথায়, ‘‘লোকজন নিয়ে কলেজে ঢুকে পড়লেই কি কলেজ জেতা যায়? বিভিন্ন কলেজে এবিভিপি পতাকা-ব্যানার-পোস্টার লাগিয়েছে ঠিকই। কিন্তু তাতে ছাত্ররা কোথায়! সব জায়গায় বাইরের লোকজন নিয়ে কলেজে ঢুকে ওই সব করছে আর গুন্ডামি করছে।’’ দক্ষিণবঙ্গে এবিভিপির অস্তিত্বই স্বীকার করতে রাজি নন টিএমসিপি নেতারা। উত্তরবঙ্গেও গেরুয়া সংগঠনের পায়ের তলা থেকে মাটি সরতে শুরু করেছে বলে তাঁদের দাবি। মণিশঙ্করের কথায়, ‘‘উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুরের বেশ কিছু কলেজে এবিভিপি কিছুটা বেড়েছিল। ভোটের ফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আমাদের ঢুকতেই দিচ্ছিল না। কিন্তু সেই অবস্থাও আর নেই। ছাত্র-ছাত্রীরাই রুখে দাঁড়িয়েছেন। আবার কলেজগুলো আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।’’ মণিশঙ্কর বলেন, ‘‘নির্বাচন নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। আমরা নির্বাচনের জন্য সব সময় প্রস্তুত।’’

সত্যিই কি উত্তরবঙ্গেও ফের পিছু হঠতে শুরু করেছে এবিভিপি? দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা বিজেপির সভাপতি শুভেন্দু সরকার পত্রপাঠ উড়িয়ে দিচ্ছেন সে দাবি। বলছেন, ‘‘সব কিছুরই একটা সময় রয়েছে। তাই অযথা দাবি-পাল্টা দাবি করে লাভ নেই। সময় হোক, দেখতে পাবেন দক্ষিণ দিনাজপুরের কলেজগুলোয় সমর্থন এখন কোন দিকে।’’

আরও পডু়ন: সৌদিতে তেল খনিতে জঙ্গি হানায় অশনিসঙ্কেত ভারতে! মন্দা ত্বরান্বিত হবে, বলছেন অর্থনীতিবিদরা

বিজেপির যুবনেতা শঙ্কুদেব পন্ডা অবশ্য উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের পরিস্থিতির মধ্যে খুব একটা ফারাক দেখছেন না। এ রাজ্যে টিএমসিপির উত্থান শিখরে পৌঁছেছিল শঙ্কুর হাত ধরেই। তিনি যখন টিএমসিপির সভাপতি, তখনই রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনকে মোটামুটি বিরোধীশূন্য করে ফেলার পথে হেঁটেছিল শাসক দলের ছাত্র শাখা। তা নিয়ে বিতর্কও বিস্তর হয়েছিল। বিরোধী পক্ষকে মনোনয়নই জমা দিতে না দেওয়ার যে কৌশল বাম জমানায় এসএফআই নিয়েছিল, তৃণমূল তার ঘোর সমালোচক ছিল। কিন্তু শঙ্কুর জমানায় ওই কৌশল আরও ব্যাপক ভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করেছিল তৃণমূলের ছাত্র শাখাই। সেই শঙ্কুই এখন গেরুয়া অফিসে বসে প্রশ্ন করছেন, ‘‘তৃণমূল ছাত্র পরিষদ আর আছে নাকি রাজ্যে?’’

তৃণমূল ছাত্র পরিষদ যদি আর না থেকে থাকে, তা হলে বিভিন্ন কলেজে এবিভিপির সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে কাদের? সম্প্রতি উত্তর চব্বিশ পরগনার এপিসি কলেজ বা বিবেকানন্দ কলেজে ঢোকার চেষ্টা করেও এবিভিপি ঢুকতে পারল না কেন? কারা আটকাল? শঙ্কুদেব পন্ডা বললেন, ‘‘বলছি তো, তৃণমূল ছাত্র পরিষদ বলে আর কিছু নেই। এখন যেটা রয়েছে, সেটা হল তৃণমূল পার্থ পরিষদ। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কতগুলো চামচা শুধু ঘুরে বেড়াচ্ছে আর সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা আদায় করছে, চাকরি-বাকরি নিচ্ছে। এদের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা নেই।’’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
বাছাই খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন