জন্মের পর থেকে ৪৭ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল নুর নবি। ছুটি পাওয়ার পর ফের অবস্থার অবনতি হওয়ায় হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পা ভেঙে আট দিন ভর্তি ছেলে জয়দেব সাহা। মা সন্ধ্যাদেবী জানেন না, কবে ছেলের অস্ত্রোপচার হবে। ১১ বছরের অনুভবের চোখে গুলতি থেকে ছোড়া ইটের টুকরো লেগে প্রায় দৃষ্টিহীন হওয়ার উপক্রম! চিকিৎসক-নার্সদের হাতে-পায়ে ধরেও ছেলেকে ভর্তি করাতে পারেননি মা সুনীতা মণ্ডল।

নুর, জয়দেব বা অনুভবের এই পরিণতিই শুক্রবারের সামগ্রিক ছবি আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। চার দিনের আন্দোলনের জেরে এমনিতেই জরুরি বিভাগে রোগী আসা কমে গিয়েছে। যাঁরা এসেছেন, তাঁরাও দুর্বিসহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী। হয় বেসরকারি বা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, নয়তো সারা কলকাতা ঘুরে বেড়াতে হয়েছে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। আরজি কর কর্তৃপক্ষ অনড়। নতুন করে কাউকে ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়।

শুধু আরজি করই নয়, কার্যত গোটা শহর কলকাতার ছবিই শুক্রবার ছিল এই রকম। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হোক বা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কিংবা এসএসকেএম, কোনও হাসপাতালেই নতুন কোনও রোগী কার্যত ভর্তি নেওয়া  হয়নি। আউটডোর, জরুরি পরিষেবা বন্ধ রেখে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন চিকিৎসকরা। তার মধ্যে আবার দিনভর বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে গণইস্তফা দিয়েছেন প্রবীণ চিকিৎসকরাও। ফলে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাই কার্যত ভেঙে পড়েছে।

আরও পড়ুন: ডাক্তার নিগ্রহের প্রতিবাদে মিছিল শহরে, জনজোয়ারে শামিল বিদ্বজ্জনরাও

তিনটে হাসপাতাল ঘুরে ৪৭ দিনের শিশুকে নিয়ে আরজি করের জরুরি বিভাগে ভাঙড়ের আজমিরা বিবি। —নিজস্ব চিত্র।

ভিতরের পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। যাঁরা ভর্তি রয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসা চলছে নামমাত্র। রুটিন পরিদর্শন দূরে থাক, সারা দিনে কোথাও কোথাও ওয়ার্ডে এক বার দেখা মিলেছে চিকিৎসকের। কোথাও কোথাও কাজ চালাচ্ছেন নার্সরা। সেই নার্সও আবার সব সময় থাকছেন না ওয়ার্ডে। রুটিন ওষুধপত্র দেওয়া হচ্ছে। নতুন কোনও চিকিৎসার উদ্যোগ বা ব্যবস্থা কোনওটাই নেই। কার্যত বিনা চিকিৎসাতেই হাসপাতালের বেডে পড়ে রয়েছেন রোগীরা।

উল্টো দিকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পরিবার পরিজনরাও স্বস্তিতে নেই। বরং প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন তাঁরা। কী চিকিৎসা হচ্ছে, বা আদৌ কোনও চিকিৎসা হচ্ছে কি না, তা নিয়েই সংশয়ে রোগীর পরিবারের সদস্যরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনআরএস-এর এক নার্স বলেন, ‘‘ওয়ার্ডে যদি নিয়মিত রোগীর দেখভাল না হয়, আমরা কী করতে পারি। সিস্টার ইনচার্জের কাছে চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র লিখে দিয়ে যান। ইঞ্জেকশনও দিতে হয় মুমূর্ষু রোগীকে। জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতির কারণে সেই রুটিন চেক-আপ বাধাপ্রাপ্তহচ্ছে। ফলে যাঁরা ভর্তি রয়েছেন তাঁদের চিকিৎসাও ঠিকমতো করতে সমস্যা হচ্ছে।’’

৫০ দিন আগে আরজি কর হাসপাতালে পুত্রসন্তান প্রসব করেন ভাঙড়ের আজমিরা বিবি। ‘প্রিম্যাচিওর’ এবং ওজন কম হওয়ায় জন্মের পর থেকেই এই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মা-ছেলে। মঙ্গলবার নুর নবি নামে ওই শিশুকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পরের দিনই পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ফের কলকাতায় নিয়ে আসেন বাবা-মা। শিশুমঙ্গলে গেলে সেখানে ভর্তি না নেওয়ায় পার্ক সার্কাসের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালের অত খরচ বহন করা সম্ভব নয় বলে শুক্রবার ফের আরজি কর হাসপাতালেই নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রথমে ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল। পরে কার্যত হাতে-পায়ে ধরার পর ভর্তি নিলেও চিকিৎসক-নার্সরা জানিয়ে দিয়েছেন, ঠিক মতো চিকিৎসা না হলে তাঁদের কিছু করার নেই।

আরও পড়ুন: আন্দোলনে আরও গতি, ১৭ জুন দেশ জুড়ে হাসপাতাল ধর্মঘটের ডাক দিল আইএমএ

নুরের মতো সৌভাগ্য হয়নি অনভবের। গুলতি থেকে ছোড়া ইটের টুকরো লেগে একটা চোখ কার্যত দৃষ্টিহীন হতে বসেছে অনুভব। কিন্তু তাতেও ‘নিরুপায়’ আরজি কর হাসপাতাল। বাঁ চোখে আঘাত লাগার পর বসিরহাট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে আরজি করে রেফার করা হলেও ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল। এর পর ছেলেকে নিয়ে শিশুমঙ্গল হাসপাতালে ছুটেছেন মা সুনীতাদেবী। সেখানে ভর্তি করার পর ব্যান্ডেজ খুলে দেখা যায় চোখ পুরোপুরি ফেটে গিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। ওই হাসপাতাল অবশ্য অনুভবকে ভর্তি নিয়েছে।

আরও পড়ুন: সরকারের ‘মাল্টি অর্গান ফেলিওর’ হয়েছে, দায়ী মুখ্যমন্ত্রীর দম্ভ, তোপ বিজেপির

আবার বাইক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে গত শুক্রবার থেকে আরজি করে ভর্তি হন জয়দেব সাহা। আন্দোলনের জেরে তাঁর চিকিৎসা কার্যত বন্ধ। কবে অস্ত্রোপচার হবে, সে বিষয়ে কিছুই জানানো হচ্ছে না তাঁদের, অভিযোগ মা সন্ধ্যাদেবীর।

চন্দননগর হাসপাতাল থেকে রেফার করা অন্তঃসত্ত্বা প্রতিমা বেরাকে হাসপাতালের গেট থেকেই ফিরিয়ে দেন জুনিয়র চিকিৎসকেরা। —নিজস্ব চিত্র।

আবার কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে সন্তানসম্ভবা প্রতিমা বেরা এসেছিলেন চন্দননগর থেকে। চন্দননগর হাসপাতাল থেকে দুপুর দুটোর সময় রেফার করা  হয়। বিকেল পাঁচটা নাগাদ মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছন। কিন্তু হাসপাতালের সব গেট বন্ধ ছিল। জুনিয়র ডাক্তাররা দরজার কাছে এসে বলেন, ‘‘আমরা কর্মবিরতি পালন করছি। সিনিয়ররাও কাজ করছেন না। আমরা রোগী ভর্তি নিতে পারব না। আমরা কোনও দায়িত্ব নিতে পারব না। আপনারা বরং অন্য কোনও হাসপাতালে যান।

আরও পড়ুন: সরকারি ডাক্তারদের গণইস্তফার ঢেউ, ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

কিন্তু অন্যত্রও যে নিশ্চয়তা নেই ভর্তির! এসএসকেএম থেকে এনআরএস কিংবা চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল মেডিক্যাল— সর্বত্রই ছবিটা এক। আন্দোলনে চিকিৎসকরা। কার্যত কাউকেই ভর্তি নেওয়া হয়নি। দিনভর হাসপাতালে হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার এই করুণ চিত্রই ধরা পড়েছে।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।