চিকিৎসক নিগ্রহের প্রতিবাদে রাস্তায় প্রতিবাদী মানুষের জনজোয়ারের সাক্ষী রইল কলকাতা। শুধুমাত্র আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তাররাই নন, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, আইনজীবী, সমাজকর্মী, কলেজ পড়ুয়া, অভিনেতা, চিত্র পরিচালক, গায়ক এবং অসংখ্য সাধারণ নাগরিকএই মিছিলে শামিল হন। রাজ্য প্রশাসনের কাছে একটাই দাবি তাঁদের, চিকিৎসা কেন্দ্রে ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

এনআরএস-এ চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনায় গত তিন ধরে উত্তপ্ত গোটা রাজ্য। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, শিকেয় উঠেছে চিকিৎসা পরিষেবা। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজ্য প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে মীমাংসা হয়নি। বরং কাজে না ফিরলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তাতে সঙ্কট আরও বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত এবং তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। সেই দাবি নিয়েই শুক্রবার বিকালে এনআরএস চত্বর থেকে চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত মিছিল বেরোয়।

এ দিন মিছিলে যোগ দেন চিকিৎসক তথা মানবাধিকার কর্মী বিনায়ক সেন। ‘ন্যায্য বিচার চাই’ প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিলে দেখা মেলে অপর্ণা সেনের। এ ছাড়াও মিছিলে পা মেলান জয়া মিত্র, সুজাত ভদ্র, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, বিভাস চক্রবর্তী, দেবজ্যোতি মিশ্র, সমীর আইচ, বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, অনুপম রায় প্রমুখ।

আরও পড়ুন: আন্দোলনে আরও গতি, ১৭ জুন দেশ জুড়ে হাসপাতাল ধর্মঘটের ডাক দিল আইএমএ​

বিনায়ক সেন বলেন, ‘‘মূল বিষয়টা হল স্বাস্থ্য এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকার। সেটা এই ধরনের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির জন্য বারে বারে ঘা খাচ্ছে। চিকিৎসক নিগ্রহ বন্ধ হোক। আমরা সকলে চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। ন্যায় বিচার আমাদের প্রাপ্য।’’

মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের কথায়: ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য পরিস্থিতি আরও ঘোরালো করে দিল। এনআরএস-এ না গিয়ে এসএসকেএম-এ গিয়ে তিনি হুমকি দেওয়ায় পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। যে মুমূর্ষু রোগীরা সরকারি হাসপাতালে ঢুকতে পারছেন না, সরকারের উচিত, দাঁড়িয়ে থেকে ওই রোগীদের বেসরকারি জায়গায় নিয়ে গিয়ে সরকারি খরচে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া। শুধু নেতারাই বেসরকারি হাসপাতালের পরিষেবা পাবেন, আর গরিব মানুষ পাবেন না, তা তো হয় না।’’

চলচ্চিত্র পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ও অভিযোগের আঙুল তোলেন প্রশাসনের দিকে। তাঁর বক্তব্য: ‘‘এ রকম ন্যাক্কারজনক ঘটনা কলকাতা দেখেনি, যেখানে প্রশাসনের কোনও ভূমিকা নেই। একেবারে নিস্পৃহ, নির্বিকার তারা। তাই রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।’’ সম্প্রতি রাজ্য জুড়ে আইনজীবীদের ধর্মঘটের প্রসঙ্গ টেনে সরব নাট্য ব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তীও: ‘‘কিছু দিন আগে আইনজীবীরাও তো কর্মবিরতির ডাক দিয়েছিলেন। তখনও সাধারণ মানুষের অসুবিধা হচ্ছিল। কই, তখন তো নিন্দা শুনিনি!ডাক্তারদের নিরাপত্তা দিতে এত বিব্রত কেন?’’

মিছিলে শামিল হন বিদ্বজনেরাও। —নিজস্ব চিত্র।

সঙ্গীতজ্ঞ দেবজ্যোতি মিশ্র এ দিন শামিল হয়েছিলেন মিছিলে। তাঁর কথায়, “মানুষের জন্য মানুষের মিছিলে পা মিলিয়েছি। এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হোক এটা কখনওই কাম্য নয়। যে ডাক্তাররা মানুষের সেবা করেন তাঁদের বিপদের সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোটা আমার নৈতিক ও সামাজিক কর্তব্য বলে মনে করি। এই ব্যাপারে সরকারকেও অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।”

এ দিন মিছিলে পা মেলান সিপিএম নেতা ও কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যও। তিনি বলেন, ‘‘চিকিৎসাকেন্দ্রে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য সরকার। তাই এখন কুমিরের কান্না কাঁদছে। আন্দোলনটাকে লঘু করে দেখাতে খামোখা রোগী বনাম চিকিৎসক পরিস্থিতি খাড়া করার চেষ্টা চলছে।’’

আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াতে এ দিন সকালেই এনআরএস-এ পৌঁছে যান অপর্ণা সেন। সেখান থেকে মিছিলে যোগ দিয়ে বলেন, ‘‘ডাক্তারদের সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়া দরকার।চিকিৎসা পরিকাঠামোয় পরিবর্তন প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এসে ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলুন। এই মুহূর্তে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। এঁরা আপনার ছেলের মতো, একটু ভাল করে কথা বলুন, সমব্যথী হোন, সমস্যাটা মন দিয়ে শুনুন।’’

ডাক্তারদের আন্দোলনে গত তিন দিনে রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবা শিকেয় উঠেছে। তবে শুধুমাত্র চিকিৎসকদের ঘাডে় এই বিপর্যয়ের দায় চাপানো উচিত নয় বলে দাবি অপর্ণা সেনের। তাঁর কথায়, ‘‘পরিষেবা বন্ধ হওয়ার দায় শুধু ডাক্তারদের নয়। এর দায় মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রশাসনেরও। নিরাপত্তা না দিলে কী ভাবে কাজ করবেন চিকিৎসকেরা?’’বৃহস্পতিবার এসএসকেএমে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ‘বহিরাগত’ বলে উল্লেখ করেছিলেন মমতাবন্দ্যোপাধ্যায়। তবে অভিমান করে মুখ্যমন্ত্রী এমন কথা বলেছেন বলে দাবি করেন অপর্ণা।

আরও পড়ুন: সরকারি ডাক্তারদের গণইস্তফার ঢেউ, ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা​

তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গায়ক অনুপম রায়ও।দেওয়ালে কতটা পিঠ ঠেকে গেলে কাজ ফেলে মানুষ মিছিলে বেরোন, এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত উদাহরণ বলে মন্তব্য করেন অনুপম।তিনি বলেন, ‘‘খুব দুঃখের জায়গা থেকে এই মিছিল। বেশ কিছু ন্যায়সঙ্গত দাবি উঠেছে। প্রশাসনকে তা নিয়ে আশ্বাস দিতে হবে। কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা যায়, তার সমাধান খুঁজে বার করতে হবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে।’’

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।