ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজ নিয়ে সোমবার রাজ্য এবং নির্বাচন কমিশন— দু’পক্ষকেই স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রাখল সুপ্রিম কোর্ট। কমিশন যে ভাবে এসআইআর-এর নোটিস পাঠাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলল আদালত। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলল রাজ্য সরকার এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, এসআইআর-এর কাজে কোনও ভাবেই বাধা দেওয়া চলবে না। কোনও ক্ষেত্রে নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন হলে, আদালতই সেই নির্দেশ দেবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “যে কোনও নির্দেশের প্রয়োজন হলে আমরা দেব। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় কোনও বাধা আমরা বরদাস্ত করব না। এই বিষয়টি সব রাজ্যকে স্পষ্ট ভাবে বুঝে নিতে হবে।” আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি।
গত বুধবারের পর সোমবার ফের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে মামলাটি ওঠে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের করা মামলারও শুনানি হয়। তিন বিচারপতির বেঞ্চে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে শুনানি। গত শুনানিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উপস্থিত ছিলেন এজলাসে। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী নিজে না থাকলেও, তাঁর আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান উপস্থিত ছিলেন আদালতে। তিনি আদালতে বলেন, “আমাদের একটাই উদ্বেগ— গণহারে যেন ভোটারদের বাদ না দেওয়া হয়।”
আরও পড়ুন:
নামের বানানে গরমিল থাকলে কোন ক্ষেত্রে ভোটারের নাম বাদ দেওয়া যাবে, কোন ক্ষেত্রে দেওয়া যাবে না— এ বিষয়ে কমিশনকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানান মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী। কমিশনের কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই মুহূর্তে আদালত এমন কোনও নির্দেশ দেবে না।
রাজ্যের কাজে প্রশ্ন
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে কমিশনকে ৮,৫০৫ জন কর্মী দিয়েছে এসআইআর-এর কাজের জন্য। কিন্তু, কোন আধিকারিকদের দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও জট তৈরি হয় আদালতে। সুপ্রিম কোর্ট জানতে চায় ওই আধিকারিকদের নামের তালিকা রয়েছে রয়েছে কি না। তখন মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী জানান, জেলাভিত্তিক বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। যে কর্মীদের দেওয়া হয়েছে, তাঁরা সকলেই গ্রুপ বি শ্রেণির আধিকারিক। তবে কমিশনের বক্তব্য, তারা সেই তথ্য হাতে পায়নি। মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী জানান, প্রত্যেকের নাম-সহ জানাতে সময় লাগবে। শেষে রাজ্যের উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য, “তার মানে নামের তালিকা এখনও সম্পূর্ণ ভাবে প্রস্তুত নেই।”
তা ছাড়া নতুন করে যে কর্মীদের দেওয়া হয়েছে এসআইআর-এর কাজের জন্য, তাঁদের প্রশিক্ষণ ছাড়াই কী ভাবে ব্যবহার করা যাবে— তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে কমিশনও। প্রধান বিচারপতির এজলাসে কমিশন আরও জানায়, তারা রাজ্যকে পাঁচ বার চিঠি দিয়েছিল আধিকারিক চেয়ে। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, কোন ধরনের অফিসার প্রয়োজন। কিন্তু সেই অনুযায়ী কর্মী তাদের দেওয়া হয়নি বলে আদালতে দাবি করেন কমিশনের আইনজীবী। যদিও রাজ্য সরকারের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির দাবি, কমিশন কখনোই রাজ্যের কাছে গ্রুপ-বি আধিকারিক চায়নি। তবে কমিশনের আইনজীবীর বক্তব্য, তাদের ৩০০ জন গ্রুপ-বি আধিকারিক দরকার ছিল। কিন্তু পেয়েছে মাত্র ৮০ জনকে। বাকিরা সকলেই গ্রুপ-সি এবং বিভিন্ন শ্রেণির।
রাজ্য সরকার কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা করছে না বলেও অভিযোগ ওঠে আদালতে। কমিশনের আইনজীবীও আদালতকে জানান, “রাজ্য আমাদের নির্দেশ পালন করছে না। সাসপেন্ড করছে না। এফআইআর করছে না। রাজ্য বলছে আমাদের কিছু করার নেই। প্রতিটি পদক্ষেপে রাজ্য অসহযোগিতা করছে।”
প্রশ্ন কমিশনের কাজেও
সোমবার রাজ্যের ভূমিকা নিয়ে যেমন সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্ন ওঠে, তেমনই প্রশ্ন ওঠে কমিশনের ভূমিকা নিয়েও। আদালত বুঝিয়ে দেয়, কমিশন যে ভাবে ভোটারদের শুনানির জন্য ডাকছে, তা-ও খুব একটা সন্তোষজনক নয়। যে ভোটারদের ফর্মে ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’ ধরা প়ড়েছে, তাদের কমিশন ডেকে পাঠাচ্ছে নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য। এ ক্ষেত্রে কমিশন যে প্রযুক্তির ব্যবহার করছে, তা কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে আদালত।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী কমিশনের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা যে সফটঅয়্যার টুল ব্যবহার করছেন, তাতে নামের সামান্য পার্থক্যের জন্য ডেকে পাঠানো হচ্ছে। বাংলা পরিবারে ‘কুমার’ প্রায়ই মধ্যনাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যদি ‘কুমার’ বাদ পড়ে, নোটিস পাঠাচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, “বাস্তবে সফটঅয়্যার ব্যবহার করে আপনারা ব্যাপক ভাবে নোটিস পাঠিয়েছেন। আপনারা বলছেন, ৫০ বছরের ব্যবধান মানে দাদু-নাতির সম্পর্ক। কিন্তু বাস্তবে তো বিয়ে হয় প্রায় ২০ বছর বয়সেও। এই সব বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে আপনাদের কাজ মিলছে না। কারণ, এই ভাবেই সফটঅয়্যার কাজ করেছে।”
বিচারপতি বাগচীর কথায়, কমিশন যে সফ্টঅয়্যার টুল ব্যবহার করছে, তা অত্যন্ত ‘কঠোর’। কারও ৫-৬ জন সন্তান থাকলে, তাঁকেও নোটিস পাঠানো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে আদালতের। বিচারপতি বাগচীর কথায়, “৫০ সন্তান হলে ঠিক আছে। তখন নোটিস পাঠানো যেতেই পারে।”
কী কী নির্দেশ
সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, নবান্নের দেওয়া ৮,৫০৫ জন কর্মীর সকলেই যে ‘গ্রুপ বি’ শ্রেণির আধিকারিক, তা নিশ্চিত করতে হবে রাজ্যকে। একই সঙ্গে এ-ও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে ওই আধিকারিকেরা সংশ্লিষ্ট ডিইও বা ইআরও-র কাছে রিপোর্ট করে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। রাজ্যের দেওয়া আধিকারিকদের দু’দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে বলেও জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
একই সঙ্গে দেশের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ এ-ও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ভোটারদের নথিপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ইআরও-রাই। মাইক্রো অবজ়ার্ভার এবং রাজ্যের দেওয়া আধিকারিকেরা শুধু সাহায্য করবেন। তবে আদালত এ-ও জানিয়েছে, কমিশন প্রয়োজনে ইআরও এবং এইআরও-দের বদলাতে পারবে। বস্তুত, গত বুধবারের শুনানি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতার মন্তব্যেও উঠে এসেছিল ইআরও-দের কাজের প্রসঙ্গ। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, “ইআরও-দের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।”
সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছে, আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারির পরে আরও এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে ইআরও-দের। নথিপত্র যাচাইয়ের করে যাতে তাঁরা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন, সেই কারণেই এই সময় দেওয়ার কথা বলেছে আদালত। ঘটনাচক্রে, সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ প্রকাশ্যে আসার পরেই রাজ্যে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)-এর দফতর জানায়, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন ২১ জানুয়ারি থেকে আরও পিছিয়ে যেতে পারে। বস্তুত, কমিশনের ভোটার-শুনানি প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। এজলাসে কমিশনের আইনজীবী জানিয়েছেন, এখনও ১৪ লক্ষের শুনানি বাকি। পরে সিইও দফতর জানায়, প্রায় ১০-১২ লক্ষ ভোটারের শুনানি বাকি রয়েছে।
সম্প্রতি রাজ্যে এসআইআর সংক্রান্ত ফর্ম পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনায় কোনও এফআইআর দায়ের হচ্ছে না বলে অভিযোগ। সোমবার ওই ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। এর জন্য রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে শোকজ় করেছে সুপ্রিম কোর্ট। হলফনামা দিয়ে তাঁকে এর কারণ জানাতে বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এর আগে রাজ্যকে যে কর্মীদের সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়েছিল, সে প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, “অনুগ্রহ করে এই বিষয়টি দেখুন। যখন সাসপেনশনের পরামর্শ দেওয়া হয়, তখন আইন অনুযায়ী রাজ্য নিশ্চয়ই জানে কী করা উচিত।”