এক দিকে প্রাক্তন অধস্তন কর্মী, অন্য দিকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ—এই দুই ঢালকে সামনে রেখে নিজের অস্বস্তি আড়াল করার চেষ্টা করছেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার। পর পর পাঁচ দিনে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সিবিআই-রাজীবের ‘কথোপকথন’ শেষে এমনটাই ইঙ্গিত সিবিআই কর্তাদের।

বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের প্রাক্তন গোয়েন্দাপ্রধান এবং সারদা-কাণ্ডে রাজ্য সরকার গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য অর্ণব ঘোষ সাময়িক স্বস্তি পেলেও, সিবিআই কর্তাদের ইঙ্গিত, তাঁর জন্য বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন নিয়ে অপেক্ষা করছেন গোয়েন্দারা।

সিবিআই সূত্রে খবর, শিলংয়ে শুরুটা যদিও ভালই করেছিলেন দুঁদে আইপিএস রাজীব কুমার। প্রথম দিন কিছু ক্ষেত্রে রাজীবের ‘হোম ওয়ার্ক’-এর সামনে পিছু হটতে হয় সিবিআই গোয়েন্দাদেরও। শুরু থেকেই চি়টফান্ড তদন্তের জন্য রাজ্য সরকারের তৈরি করা বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট)-ই ছিল প্রশ্নোত্তর পর্বের ভরকেন্দ্র। সিবিআই সূত্রের খবর, প্রথম থেকেই নিজেকে ওই সিটের প্রধান হিসাবে মানতে চাননি তিনি। বরং নিজেকে সিটের একজন সদস্য হিসাবেই পরিচয় দেন রাজীব। তিনি বোঝাতে চান, সিটের তদন্তের অভিমুখ এবং পদ্ধতি পরিচালনার পিছনে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না।

আরও পড়ুন: পুলওয়ামায় সিআরপিএফ কনভয়ে হামলা, মৃত্যু ৮ জওয়ানের, দায় নিল জৈশ-ই-মহম্মদ​

সিবিআই সূত্রের খবর, সেই প্রসঙ্গেই উঠে আসে ২০১৩ সালে সিবিআই তদন্ত ঠেকাতে সেই সময়ে রাজ্যের পক্ষ থেকে পেশ করা হলফনামার প্রসঙ্গ। সেই হলফনামায় রাজ্য দাবি করেছিল, সিট গোটা তদন্ত খুব পারদর্শিতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবং সেই কারণেই সিবিআই তদন্তের প্রয়োজন নেই। সেই হলফনামা ধরেই সিটের সঙ্গে সিবিআই তদন্তের বিভিন্ন ধাপে ফারাকগুলো তুলে ধরতে থাকেন তদন্তকারীরা। সিবিআই সূত্রের খবর, ওই হলফনামাতেই রাজ্য উল্লেখ করেছিল যে, গোটা কোলোঙ্কারিতে জড়িয়ে আছে অনেক রাঘববোয়ালের নাম। আর সেখানেই তদন্তকারীদের প্রশ্ন, তা হলে সেই সময় সিট কেন ওই সব রাঘববোয়ালদের জেরা করেনি?

সূত্রের খবর, তখনই প্রশ্ন ওঠে, তবে কি সিটের তদন্তে গাফিলতি ছিল? তদন্তকারীদের ইঙ্গিত, প্রথমে আদৌ সেই অভিযোগ মানতে চাননি রাজীব কুমার। বরং তিনি নিজের অফিসারদের প্রশংসা করেন। তিনি দাবি করেন, সিবিআই যে দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত করছে, সিটও সেই ভাবে তদন্ত করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে সিট সবাইকে জেরা করতে পারেনি। তার মধ্যেই তদন্তের ভার চলে যায় সিবিআইয়ের হাতে।

সবটাই ঠিক ছিল, যতক্ষণ না মাঝপথে মুখোমুখি হন প্রাক্তন সাংসদ কুণাল ঘোষ। সূত্রের খবর, প্রথম থেকেই ওই প্রাক্তন সাংসদ দাবি করেন, সিট গঠনই করা হয়েছিল তদন্ত বিপথে চালিত করতে এবং প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করতে। এক তদন্তকারী আধিকারিকের ইঙ্গিত, ওই প্রসঙ্গেই উঠে আসে বিধাননগর কমিশনারেটের দুই আধিকারিক শঙ্কর ভট্টাচার্য এবং দিলীপ হাজরার নাম। এই দু’জনেরই বয়ান রেকর্ড করেছে সিবিআই। তাঁদের বয়ান উদ্ধৃত করে কয়েকটি প্রশ্ন উঠে আসে পুলিশ কমিশনারের জন্য। সূত্রের ইঙ্গিত, আর সেই প্রসঙ্গেই মেজাজ হারান নগরপাল। বুধবার বারাসত আদালতে সারদা মামলার শুনানিতে হাজিরা দিতে গিয়ে কুণাল ঘোষ স্বীকার করেন যে, নগরপালের সঙ্গে মুখোমুখি প্রশ্নোত্তর পর্বে উঠে এসেছে একাধিক পুলিশকর্মীর নাম।

আরও পড়ুন: কংগ্রেস-বিজেপি কেউ কারও চেয়ে কম যায় না, বললেন মায়াবতী​

সিবিআই সূত্রে খবর, ওই দুই পুলিশ আধিকারিককেও আগে সিটের তদন্ত এবং কে বা কারা সেই তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ করতেন তা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন তদন্তকারীরা। তাঁদের বয়ানে বার বার উঠে এসেছে বিধাননগরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার এবং গোয়েন্দা প্রধান অর্ণব ঘোষের নাম। সূত্রের খবর, সিটের তদন্তে ‘গাফিলতি’-র অভিযোগের তির ক্রমশ তাঁর দিকে ঘুরছে দেখে সতর্ক হয়ে যান পুলিশ কমিশনার। তিনি দাবি করেন, সিট যখন গঠিত হয়, তখন তিনি একজন আইজি পদমর্যাদার আধিকারিক। প্রতিদিনকার তদন্তের খুঁটিনাটি তাঁর পক্ষে দেখা সম্ভবও ছিল না, তিনি দেখতেনও না। তদন্তকারী আধিকারিকদের সঙ্গে নিত্যদিনের তদন্ত নিয়ে যোগাযোগ রাখতেন তাঁর অধস্তন গোয়েন্দা প্রধান অর্ণব ঘোষ। তাই তাঁর পক্ষে এত খুঁটিনাটি বিষয়ের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

সূত্রের খবর, সেই অস্বস্তির মাঝেই ফের ওই ২০১৩-র হলফনামা প্রসঙ্গ উঠে আসে। কারণ ওই হলফনামায় রাজ্য সরকার আদালতকে জানিয়েছিল, ২০১১ সালে রাজ্যের অর্থসচিব বেআইনি অর্থ লগ্নি সংস্থার বাড়বাড়ন্ত বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে চিঠি দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতেও চিঠি দেওয়া হয়। সেখান থেকে স্পষ্ট যে, রাজ্য চিটফান্ডের বিষয়টি জানত। আর সেখানেই প্রশ্ন ওঠে, তিনি কমিশনার থাকা অবস্থায় তাঁর এলাকাতেই সারদার মিডল্যান্ড পার্কের এত বড় অফিসে কী কারবার চলত তার কোনও হদিশ কেন পেল না পুলিশ?

সিবিআই কর্তাদের ইঙ্গিত, ওই অস্বস্তি ঢাকতে এবার তিনি ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’র আশ্রয় নেন। সিবিআই সূত্রে কেবল এটুকুই জানা যাচ্ছে যে,রাজীব কুমার বেশ কিছু ক্ষেত্রে দাবি করেছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনেই যা করার করেছেন।

সিবিআই তদন্তকারীদের দাবি,টানা পাঁচ দিন এভাবেই রাজ্য পুলিশ মহলে ‘সুপার কপ’ হিসাবে পরিচিত রাজীব কুমারকে প্রশ্নের জালে জড়িয়ে, আদালতে ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁদের করা অভিযোদের সপক্ষে অনেক উল্লেখযোগ্য তথ্যই হাতে পেয়েছেন তাঁরা।

(বাংলার রাজনীতি, বাংলার শিক্ষা, বাংলার অর্থনীতি, বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার স্বাস্থ্য, বাংলার আবহাওয়া -পশ্চিমবঙ্গের সব টাটকা খবর আমাদের রাজ্য বিভাগে।)