যতটা আগ্রাসী হবে ভাবা গিয়েছিল, ততটা না হলেও, বুলবুলের তাণ্ডবের জেরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব কম নয় বলেই রাজ্য প্রশাসন সূত্রে খবর। রবিবার দুপুরেই নবান্নে এসেছে দক্ষিণবঙ্গের ন’টি জেলার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক রিপোর্ট।

বুলবুলের তাণ্ডবে এখনও পর্যন্ত গোটা রাজ্যে ১০ জনের মৃত্যুর খবর প্রাথমিক ভাবে এসেছে। তবে সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে সত্যিই সবক’টি মৃত্যু বুলবুলের কারণে কি না। রাজ্যের বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের মন্ত্রী জাভেদ খান রবিবার বিকেলে জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত ঝড়ের তাণ্ডবে ৬ জনের মৃত্যুর নিশ্চিত খবর পাওয়া গিয়েছে।

ন’টি জেলার জেলাশাসকদের পাঠানো প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত সাড়ে ২৯ হাজারের মতো বাড়়ির পুরোপুরি বা আংশিক ক্ষতি হয়েছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসলের।

বুলবুলের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত ধান। নিজস্ব চিত্র

আরও পড়ুন: বুলবুলের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উপড়ে গেল প্রচুর গাছ, নামখানায় ভাঙল জেটি

ক্ষয়ক্ষতি এবং ঝঞ্ঝা পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সোমবার আকাশপথে নামখানা এবং বকখালি এলাকা ঘুরে দেখবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি একটি টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার পর প্রশাসনের কর্তাদের নিয়ে কাকদ্বীপে বৈঠকও করবেন।  বুলবুলের জেরে ক্ষয়ক্ষতির মোকাবিলা করার জন্য তিনি রাস উৎসব উপলক্ষ্যে পূর্ব নির্ধারিত উত্তরবঙ্গ সফর আপাতত পিছিয়ে দিয়েছেন। ১৩ নভেম্বর তিনি উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটে যাবেন ক্ষয়ক্ষতি দেখতে।

দক্ষিণবঙ্গের ন’টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে রাজ্যের উপকূলবর্তী তিন জেলা — পূর্ব মেদিনীপুর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমা এলাকা থেকে। নবান্ন সূত্রে খবর, উত্তর ২৪ পরগনা থেকেই পাঁচজনের প্রাণহানির খবর এসেছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ঝড়ের দাপটে মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে মৃত্যু হয়েছে এক মহিলার।

মৃত্যু, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও, ঝড়ের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৯৫০ টি মোবাইল টাওয়ার। যার ফলে ঝঞ্ঝা বিধ্বস্ত এলাকায় ব্যপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থা। একই রকম ভাবে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর এবং উত্তর ২৪ পরগনার সুন্দরবনের অন্তর্গত এলাকায় ঝড়ের দাপটে অনেক জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে এবং তার ছিঁড়ে গিয়ে বিদ্যুৎ পরিষেবাও বিঘ্নিত হয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর।

আরও পড়ুন: নেই দাবিদার, সুইস ব্যাঙ্কের লেনদেনহীন অ্যাকাউন্টে ৩০০ কোটি, তালিকায় বহু ভারতীয়েরও নাম

জাভেদ খান জানিয়েছেন, যে ৬ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে তার মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনায়, ১ জন করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে। তাঁর দফতর সূত্রে খবর, গোটা রাজ্যে এক লাখ ৭৮ হাজার মানুষকে বিভিন্ন ত্রাণ শিবিরে রাখা হয়েছে। ৯টি জায়গায় ৪৭১ টি ত্রাণ শিবির খোলা হয়েছে। তৈরি হয়েছে ৩৭৩ টি কমিউনিটি রান্নাঘর।  ওই দফতরের হিসাব অনুযায়ী, ২৬ হাজার বাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় তিন হাজার বাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। মন্ত্রী বলেন,‘‘ছ’টি এনডিআরএফ এবং চারটি রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর দল উদ্ধার কাজে মোতায়েন করা হয়েছে।” কাজ করছেন ১৫ হাজার সিভিক ভলান্টিয়ার।

সর্বত্রই জেলা প্রশাসন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া রিপোর্ট অনু‌যায়ী শনিবার রাতে ঝড়ের সময় নন্দীগ্রামের খোদামবাড়ি পঞ্চায়েত এলাকার ভেকুটিয়া গ্রামে ঘরের উপর গাছ ভেঙে মৃ্ত্যু হয়েছে সুজাতা দাস নামে এক মহিলার। তাঁর পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গতকাল রাতে তিনি স্বামী রঞ্জন দাস এবং দুই সন্তানকে নিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। সেই সময় আচমকাই বাড়ির পিছনের দিকে থাকা একটি বড় গাছ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে ঘরের উপর। স্বামী সন্তানরাও প্রাণে বাঁচলেও গাছ চাপা পড়ে মৃত্যু হয় সুজাতা দাসের। একই রকম ভাবে বসিরহাটের মধ্যপাড়ায় ঝড়ের সময় বাড়ির বাইরে একটি বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে প্রাণ হারিয়েছেন মহিদুল গাজি নামে এক ব্যক্তি। বসিরহাটেই গাছ চাপা প়ড়়ে রেবা কুণ্ডু নামে এক মহিলার মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে।

গাছ ভেঙে মৃ্ত্যু। নিজস্ব চিত্র

আরও পড়ুন: খালি হচ্ছে ভাঁড়ার! ঘূর্ণিঝড়ের নতুন নামের তালিকা তৈরিতে কোমর বেঁধেছে আট দেশ

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, শনিবার ফ্রেজারগঞ্জে চারটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। নিঁখোজ ১০ মৎস্যজীবী। তাঁদের খোঁজে যৌথভাবে তল্লাশি চালাচ্ছে উপকূল রক্ষী বাহিনী এবং রাজ্যের কোস্টাল পুলিশ।  সেচ দফতর সূত্রে খবর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কয়েকটি জায়গায় নদী বাঁধে ফাটলের খবর পাওয়া গিয়েছে। দ্রুত গতিতে সেই বাঁধ মেরামতির কাজ চলছে।