দলের নির্বাচনী তহবিলে যাঁরা অনুদান দিয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কে ‘খোঁজখবর’ নেওয়ার উদ্দেশ্যে কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রককে তথ্য পাঠাল নির্বাচন কমিশন। তবে সব দল নয়, শুধু তৃণমূল এবং কংগ্রেস সম্পর্কে এই ধরনের অনুসন্ধান হবে বলে নির্বাচন কমিশনের পাঠানো চিঠি থেকে অনুমান করা হচ্ছে। ওই চিঠিতে শুধু ওই দু’টি দলের অনুদান সম্পর্কেই তথ্য সংগ্রহ করার কথা বলার জন্যই এমন অনুমান দৃঢ় হচ্ছে। কংগ্রেস এবং তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব অবশ্য নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কিছু না বলে কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসকদলের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক অভিসন্ধি’র অভিযোগ তুলেছে। 

৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের পাঠানো চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার করে মন্ত্রক, ১৭ অক্টোবরে। কমিশন অবশ্য চিঠিতে জানিয়েছে, দু’টি দলই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২০১৭-’১৮ আর্থিক বছরের জন্য নির্বাচনী তহবিল সংক্রান্ত হিসেব পেশ করেছে। কিন্তু কংগ্রেস সকল অনুদানকারীর স্থায়ী অ্যাকাউন্ট নম্বর (প্যান) দেয়নি। তৃণমূল সবই দিয়েছে।

কেন এটা করা হল? নির্বাচন কমিশনের কাছে বারবার জানতে চেয়েও এখনও জবাব মেলেনি। তবে তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন, সব হিসেব দাখিলের পরেও লোকসভা ভোটের দোরগোড়ায় এই ধরনের পদক্ষেপের অর্থ কী? তাঁর বক্তব্য, ‘‘কোনও দিন এই ধরনের কোনও পদক্ষেপের কথা শুনিনি। আর্থিক সব তথ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জানানোর পরেও নতুন করে খোঁজখবর করার এই উদ্যোগ কি রাজনৈতিক? তবে যে উদ্দেশ্যই থাক, বিষয়টিকে সহজে ছাড়া হবে না। এ ভাবে আমাদের ভয় দেখানোও যাবে না।’’ 

আরও পড়ুন: শবরদের গ্রামে তিনশো বাড়ি, পানীয় জল

বিজেপির নাম না করেই মমতা বলেন, ‘‘যারা দেশের বাইরে থেকে পার্টি তহবিলে টাকা নেয়, যাদের প্রশ্রয়ে দেশের টাকা মেরে অনেকে বিদেশে পালিয়ে যায়, তাদের টাকার হিসেব কে নেবে?’’ মমতার দাবি, ‘‘নির্বাচনী তহবিলে স্বচ্ছতা রাখতেই ২০ বছর ধরে নির্বাচনী সংস্কারের কথা বলছি। আমি চাই, রাজনৈতিক দলগুলিকে সরকার নির্বাচনী খরচ জোগাবে। তাতে স্বচ্ছতা থাকবে। কেন তা হয় না, এর পিছনে কাদের স্বার্থ জড়িয়ে, আবার সেই সব কথা বলার সময় এসেছে।’’

কংগ্রেসের সর্বভারতীয় কোষাধ্যক্ষ আহমেদ পটেল বলেন, ‘‘লজ্জাজনক ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার তো বহুদিন ধরেই প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ করছে!’’ প্রবীণ কংগ্রেস নেতা তথা দলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ মোতিলাল ভোরার কথায়, ‘‘বেনজির ঘটনা।’’ চিঠি হাতে পাওয়ার পরে বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। কোথায় কোথায় প্যান অমিল, তা যাচাই করবেন তাঁরা। তবে প্যান-এর উল্লেখ না থাকা বড় কোনও সমস্যা নয় বলে দাবি কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরেই বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিরোধীদের নিশানা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। এ ক্ষেত্রে তেমনই কিছু ঘটে থাকতে পারে। 

আরও পড়ুন: পরীক্ষার্থী ৪০০, কলেজে প্রশ্নপত্র পৌঁছল ৯৫০টি!

তবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে না কংগ্রেস। সরাসরি এই ঘটনার প্রেক্ষিতে না হলেও কংগ্রেস নেতৃত্বের নিশানায় এসেছে মোদী সরকার। কংগ্রেস মহলের দাবি, বিজেপি যে অনুদান-তথ্য জমা দিয়েছে, তাতেও অনেক প্যানের উল্লেখ নেই। তাই যে যুক্তি দেখিয়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠছে, তা থেকে বিজেপি কেন মুক্ত থাকবে বলে প্রশ্ন করছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতারা।

কর্পোরেট বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, অনুদান-নথিতে উল্লিখিত প্যান ধরে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলির পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে পারে মন্ত্রক। নিয়ম মানলে রাজনৈতিক দলকে দেওয়া অনুদানের পরিমাণ নিজেদের ব্যালেন্সশিটে উল্লেখ করতে হয় কোম্পানিগুলিকে। অনুদান-নথিতে নাম থাকা কোম্পানিগুলি সেই পদ্ধতি মেনেছে কি না, তা যাচাই করে দেখতে পারে কর্পোরেট মন্ত্রক। গরমিল পাওয়া গেলে কোম্পানি আইনের একাধিক ধারায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে অভিযুক্ত করার উপায়ও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুধু কোম্পানিই নয়, প্রয়োজন হলে কোনও ব্যক্তির প্যান-এর মাধ্যমেও তথ্য যাচাই করতে পারে কর্পোরেট মন্ত্রক। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনও কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা রয়েছেন কি না, যুক্ত থাকলে সেই কোম্পানি কতটা আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে—তাও চাইলে জানতে পারে মন্ত্রক।
বিষয়টি জানতে চেয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আনন্দবাজার পত্রিকা। মন্ত্রককে চিঠি পাঠানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশন-আধিকারিককে ১৫ ডিসেম্বর, শনিবার রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে ই-মেল করা হয়। তাতে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ১) যে কোম্পানিগুলি অনুদান দিয়েছে, তাদের ব্যাপারে কোম্পানি আইন অনুযায়ী অনুসন্ধান করবে কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক (এমসিএ)? ২) সংশ্লিষ্ট তালিকায় শুধুমাত্র দু’টি রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্ত করার দরকার হল কেন? ৩) কেন অন্য জাতীয় বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলির উল্লেখ ওই তালিকায় নেই? এবং ৪) তৃণমূলের তহবিলে অনুদান দিয়েছিলেন কেবল ওই দলের নেতা-নেত্রীরাই। সে ক্ষেত্রে কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রক কোন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে? সেই ই-মেলের উত্তর মেলেনি।
১৭ ডিসেম্বর, সোমবার কমিশনের অন্যতম মুখপাত্র শেফালি শরনকে ফোন করে আনন্দবাজার পত্রিকা। বিষয়টি তাঁকে জানানো হলে তিনি ই-মেলের মাধ্যমে তা পাঠানোর কথা বলেন। সেই অনুযায়ী, ওই দিনই সন্ধ্যা ৭টা ১৮ মিনিটে তাঁকেও একই প্রশ্নমালা ই-মেলে পাঠানো হয়। সেই উত্তরও সোমবার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
নির্বাচন কমিশন যদি ভবিষ্যতে এর উত্তর দেয়, তখনও তাদের সেই বক্তব্য গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করবে আনন্দবাজার পত্রিকা।

তথ্য সহায়তা: দিগন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়