বছর দেড়েক পরে দেখা। মিনিট চল্লিশের বৈঠক। তুমুল জল্পনার আবহে হওয়া সেই বৈঠক সেরে বেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খুব ভাল আলোচনা হয়েছে।’’ কী নিয়ে হল কথা? সরকারের সঙ্গে সরকারের বৈঠক, তাই কোনও রাজনৈতিক কথা হয়নি, বললেন মমতা। আর জানালেন, বীরভূমের দেউচা-পাচামিতে কয়লা ব্লকের উদ্বোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। আরও জানালেন যে, আগামী কাল যদি অমিত শাহ সময় দেন, তা হলে বৈঠক করবেন তাঁর সঙ্গেও।

রাজ্যের কিছু আর্থিক দাবিদাওয়া, দেউচা-পাচামি কয়লা ব্লক, রাজ্যের নাম পরিবর্তন— মূলত এই সব বিষয় নিয়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন। নয়াদিল্লির লোককল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাসভবনেই বৈঠক শুরু হয় বুধবার বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ। বৈঠক সেরে বেরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, ‘‘নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয় বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে দিল্লিতে আসা হয়নি।’’ তাই এই বৈঠকে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেশ কিছু দাবি প্রধানমন্ত্রীর সামনে পেশ করেছেন।

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা পায় বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। সে বিষয়ে বৈঠকে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি। মমতা আরও বলেন যে, পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। রাজ্যের নাম বদলে ‘বাংলা’ করার সিদ্ধান্তে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা আগেই সিলমোহর দিয়েছে। কিন্তু কেন্দ্র তা নিয়ে এখনও কোনও হেলদোল দেখায়নি। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র কী ভাবছে, কেন্দ্রের কোনও প্রস্তাব রয়েছে কি না, তা রাজ্য সরকারকে জানানো হোক— প্রধানমন্ত্রীকে এই রকমই অনুরোধ তিনি করেছেন বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে ভারত সরকারের যদি কোনও পরামর্শ বা প্রস্তাব থাকে, তা মানতে রাজ্য সরকারের কোনও আপত্তি নেই— সংবাদমাধ্যমের সামনে এ দিন সে কথা স্পষ্ট করে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আরও পড়ুন:‘যাচ্ছি রাজ্যের পাওনার ব্যাপারে’, আজ দিল্লিতে মোদীর সঙ্গে বৈঠকের আগে বলে গেলেন মমতা

বীরভূমের দেউচা-পাচামিতে যে বিশাল কয়লা ব্লক পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে কয়লা খননের ভার রাজ্য সরকারকেই দিয়েছে কেন্দ্র। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন যে, ওই কয়লা ব্লকের উদ্বোধনে উপস্থিত থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদীকে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি জানান যে, পুজো, নবরাত্রি সব মিটে যাওয়ার পরে যদি তিনি সময় পান, তা হলে বাংলায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই দেউচা-পাচামি কয়লা ব্লকের উদ্বোধন করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা জানান।

প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমকে খুব বেশিক্ষণ সময় মমতা এ দিন দেননি। কিন্তু তার মধ্যেই মমতা বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, এই বৈঠকের কোনও রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই, পুরোটাই প্রশাসনিক। পশ্চিমবঙ্গের এডিজি-সিআইডি রাজীব কুমারকে সিবিআই গ্রেফতার করার চেষ্টা শুরু করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছুটেছেন নরেন্দ্র মোদীর দরবারে— কংগ্রেস, বাম তো বটেই বিজেপি-ও এই কথা বলতে শুরু করেছে গত কয়েক দিন ধরে। বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতার আঁচ কমিয়ে এনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই এই বৈঠকের লক্ষ্য— বলছে পশ্চিমবঙ্গের সবক’টি বিরোধী দল। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার দিল্লি পৌঁছে সে বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। এ দিনও ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন, ওই রকম কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সময় চাননি।

আরও পড়ুন:‘ম্যানেজ’ করার বৈঠক! প্রবল কটাক্ষের আবহেই মোদীর সঙ্গে বৈঠকে মমতা

তবে তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিন জানান যে, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও দেখা করতে চান। মমতা বলেন, ‘‘উনি (অমিত শাহ) দিল্লিতে নেই, ঝাড়খণ্ডে রয়েছেন শুনলাম। যদি কালকে (বৃহস্পতিবার) দিল্লিতে থাকেন, যদি সময় দেন তা হলে তাঁর সঙ্গেও দেখা করতে চাই।’’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করতে চাওয়াও প্রশাসনিক সৌজন্যের খাতিরেই এবং এর আগে তিনি যখনই দিল্লি সফর করেছেন, তখনই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে দেখা করেছেন— এমনও এ দিন বলেন মমতা। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করা রাজনৈতিক কারণেই বেশি জরুরি মমতার জন্য। কারণ অমিত শাহ শুধু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন, বিজেপি সভাপতিও। আর বর্তমানে অমিত শাহ বিজেপিতে মোদীর চেয়েও কট্টরবাদী মুখ হিসেবে পরিচিত। তাই কেন্দ্রীয় সরকারকে সন্তুষ্ট রাখার প্রয়োজনীয়তা যদি সত্যিই অনুভব করেন মমতা, তা হলে অমিত শাহের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটাও জরুরি। সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পরে শাহের সঙ্গেও মমতা দেখা করতে চেয়েছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ওই অংশ মনে করছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব এ দিন দিতে চাননি। যে এনআরসি নিয়ে তিনি কণ্ঠস্বর তুঙ্গে তুলেছেন বিজেপির বিরুদ্ধে, সেই এনআরসি নিয়ে এ দিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোনও কথা হয়নি বলে মমতা জানান। এক দিনে সব কথা হওয়া সম্ভব নয়— ব্যাখ্যা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর। অসমে এনআরসি হয়েছে অসম চুক্তি অনুযায়ীই— এই রকম মন্তব্যও মমতার মুখে এ দিন শোনা গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলি কী বলছে, সে প্রসঙ্গে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চান না বলে জানান তিনি। আর রাজীব কুমারের গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা তথা সারদা প্রসঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং জানিয়ে দেন, তাঁর আর কিছু বলার নেই।