নার্সিংহোমে গুরুতর আহত ৩৪ বছরের এক যুবক। চিকিৎসক জানাচ্ছেন, যে কোনও সময়ে ‘ব্রেন ডেথ’ হতে পারে। আর নার্সিংহোমের বাইরে তখন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তরজা— ‘ব্রেন ডেথ’ হলে তাঁর দেহের অধিকার কে পাবেন? কোথায় করা হবে তাঁর অঙ্গদান?

এক দিকে, এসএসকেএম হাসপাতাল। অন্য দিকে, একটি বেসরকারি হাসপাতাল, কিছুদিন আগেই যেখানে এক যুবকের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগ, মুমূর্ষু যুবকের ভাইকে এক সময়ে হাত জোড় করে বলতে হয়, ‘‘আমাদের একটু একা থাকতে দিন। যদি আমার দাদার কিছু হয়ে যায়, সরকারি হাসপাতালেই দেহদান করব। টাকার বিনিময়ে অন্য কোথাও দেব না।’’

শেষ পর্যন্ত এ সবের আর দরকার পড়েনি। রবিবার সকালে ডানকুনি রঘুনাথপুরের বাসিন্দা ওই যুবক— আনন্দ মণ্ডল হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন, এসএসকেএম-এর আইটিইউ-এ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার কিছু আগেই জানা গিয়েছিল, একাধিক অঙ্গ বিকল, ফলে তাঁর অঙ্গ নেওয়া সম্ভব নয়।

কিন্তু প্রশ্ন, ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষণার আগেই ওই যুবককে নিতে অ্যাম্বুল্যান্স নার্সিংহোমে পৌঁছে যায় কী ভাবে? এমনকি, এ-ও অভিযোগ, ওই বেসরকারি হাসপাতালের তরফে যুবকের বাড়ির লোককে বলা হয়, তাদের হাসপাতালে দেহদান করলে তারা নার্সিংহোমের বিল তো মেটাবেই, এককালীন কিছু টাকাও ওই পরিবারকে দেবে। প্রশ্ন উঠেছে, এ-ও তো এক অর্থে টাকার বিনিময়ে অঙ্গদান, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘পুরোটাই অনৈতিক। ওই রোগী তখনও বেঁচে। আমরা তখন ওই নার্সিংহোম থেকে তাঁকে এসএসকেএমে এনে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। সেটাই প্রাথমিক কর্তব্য মনে হয়েছিল।’’

ওই বেসরকারি হাসপাতালের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন বিভাগের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর তাপস রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘টাকা দিতে চাওয়ার অভিযোগ মিথ্যা। এখানে আগে হৃৎপিণ্ডের সফল প্রতিস্থাপন হয়েছে এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট সেট আপ খুব ভাল, তাই স্বাস্থ্য ভবন থেকে এক কর্তা আমাদের ওখানে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমরা গিয়ে দেখি, রোগীর যা অবস্থা, তাতে অঙ্গ নেওয়া সম্ভব নয়। আমরা কেন জোর করতে যাব?
আমাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে অঙ্গদানের প্রক্রিয়াই ধাক্কা খাবে।’’ আর স্বাস্থ্য দফতরের ওই কর্তার জবাব, ‘‘অভিযোগ একেবারেই ঠিক নয়। ব্রেন ডেথ হওয়ার আগে এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবই বা কেন? আর দেহ পেলে অগ্রাধিকার তো সরকারি হাসপাতালের। সেটা আমার না জানার কথা নয়। অহেতুক বিতর্ক হচ্ছে।’’ অন্য সরকারি কর্তাদের মতেও, এসএসকেএমে অঙ্গ প্রতিস্থাপন হলে কোনও দরিদ্র পরিবার তার সুযোগ পেতে পারে। বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিস্থাপনের বিপুল খরচ তো সবার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

গত বৃহস্পতিবার চুঁচুড়ায় পথ দুর্ঘটনায় আহত হন আনন্দবাবু। তাঁকে প্রথমে চন্দননগর হাসপাতাল, পরে উত্তরপাড়ার এক নার্সিংহোমে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, যে কোনও সময়ে ‘ব্রেন ডেথ’ হতে পারে। সেই খবর পৌঁছয় স্বাস্থ্য ভবন, এসএসকেএম এবং বেসরকারি হাসপাতালে। ওই নার্সিংহোমের চিকিৎসক কৌশিক দত্তই বলেন, ‘‘রোগী ভেন্টিলেটরে ছিলেন। তার মধ্যেই এই সব চলছিল।
রোগীর পরিবার অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছিল, যদি বাঁচানো না যায়, তাহলে তারা সরকারি হাসপাতালে দেহদান করবে।’’

 আনন্দবাবু গাড়ি সারানোর দোকানে কাজ করতেন। তাঁর মৃত্যুতে চার বছরের ছেলে নিয়ে অথৈ জলে স্ত্রী। আনন্দবাবুর ভাই নিতাই মণ্ডল বলেন, ‘‘আমরা তো টাকা চাইনি। অভাবের সংসার হলেও চেয়েছিলাম, মানুষের উপকার হোক। টাকা নিলে তো মনে হত, দাদাকে বিক্রি করছি।’’