লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমের হ্যাম্পস্টেড এলাকায় চনমনে রোদ্দুর আর মেঘ-ভাসা নীল আকাশের গ্রীষ্মের দুপুর। খানিক আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। মনোরম আবহাওয়ায় হ্যাম্পস্টেড মেট্রো স্টেশনকে নীচে রেখে ঈষৎ চড়াই হেঁটে আসতে কষ্ট হয় না। তার পর ডানে মোড় নিলেই ছায়াময় ফিট্‌সজন্স অ্যাভিনিউয়ের গড়ানে রাস্তা। গুগল ম্যাপ দেখে পথ হাঁটে যারা, সেই সঙ্গীরা বলেছে, খানিক এগোলেই ম্যারস্ফিল্ড গার্ডেন্স রাস্তার দেখা মিলবে। সেই রাস্তার ২০ নম্বর বাড়ি আমাদের গন্তব্য। সেখানেই জীবনের শেষ এক বছরের একটু বেশি সময় কাটিয়েছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েড, তাঁর কর্মস্থল ও প্রিয় শহর ভিয়েনা থেকে অনেক দূরে। ইংল্যান্ড চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন আধুনিক সময়ের সবচেয়ে দাপুটে মনস্তত্ত্ববিদ। কারণ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কাছে তাঁর একমাত্র পরিচয় তিনি ইহুদি, অতএব হননের যোগ্য। অথচ তখন তাঁর খ্যাতি বিশ্ব জুড়ে।

১৯০০ থেকে ১৯৩০-এর দশক অর্থাৎ তাঁর চুয়াল্লিশ বছর বয়েস থেকে আশি, এই সময়টায় ফ্রয়েড পরিণত হয়েছিলেন কিংবদন্তিতে। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর এমন সব তত্ত্বের কেতাব, যা পড়ে চমৎকৃত হয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা, তাক লেগে গেছে মধ্যবিত্ত সমাজের। বলে কী, মানুষের মনের মধ্যে আছে অজানা অচেনা এক অবচেতন, যার সিংহভাগ জুড়ে নানান গোলমেলে যৌন ইচ্ছে, ভীতি আর হিংসার প্রবণতা! শিউরে উঠতে হয় সে সব শুনে। তবু কী অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ ফ্রয়েডীয় থিয়োরির, আর এই দাড়িওয়ালা সুপুরুষ মনস্তত্ত্বের ডাক্তারবাবুর, যিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর রোগীদের সঙ্গে কাটান। পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে ভিয়েনার ১৯ নম্বর বের্গেসি— যা কিনা ফ্রয়েডের বসতবাটি এবং ক্লিনিক— ঠিকানায় আসে রোগীরা। মুগ্ধ হয় তাঁর ক্যারিশমায়। ফ্রয়েড নিজেকে বিজ্ঞানীর চেয়ে বেশি এক জন ‘কন্‌কুইস্তাদর’ বলে ভাবেন— অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এক মানুষ, যে অতিক্রম করতে চায় একের পর এক বাধা। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে  ভিয়েনাবাসী তাঁকে জেনেছেন এক জন সহানুভূতিশীল, সংস্কৃতিমনস্ক, বিত্তবান, তীক্ষ্ণ মেধার মানুষ বলে, নিজের সামাজিক প্রতিপত্তি বিষয়ে যিনি সজাগ।

অবস্থা বদলাতে শুরু করল ১৯৩৩-এ জার্মান রাইখের অপ্রতিরোধ্য নেতা ও নায়ক অ্যাডল্ফ হিটলারের উত্থানের সঙ্গে। দুঃসময় যে আসছে তার অশনি সঙ্কেত ছিল হিটলার-সমর্থক নাৎসিদের বামপন্থা, গণতন্ত্র বা মানুষের অধিকার সংক্রান্ত বইয়ের প্রতি আক্রোশ। কার্ল মার্ক্স, টমাস মান, কাফকা, আইনস্টাইনের বইয়ের সঙ্গে তাঁর বইও স্তূপাকার করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনে ফ্রয়েড নাকি একটু শ্লেষের হাসি হেসে বলেছিলেন, ‘‘মধ্যযুগ হলে আমাকেও পুড়িয়ে মারত, এখন তো শুধু আমার লেখা কেতাব জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এরা কতটা অগ্রসর হয়েছে ভাবো।’’ ফ্রয়েড কি ভাবতে পেরেছিলেন, এর কয়েক বছরের মধ্যেই নাৎসিরা হাজার হাজার ইহুদি ও অন্যান্য ‘খুঁতো’দের গ্যাস চেম্বারে চালান করবে?

টেবিলের উল্টো দিকে সেই বিখ্যাত ‘কাউচ’, যা দেখতে ভিড় করেন বহু পর্যটক। মহার্ঘ কার্পেটে ঢাকা কাউচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মখমলের নরম কুশন।

ভিয়েনা ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শে কান দেননি ফ্রয়েড। বলেছিলেন, এ শহর ছেড়ে যাওয়া তাঁর পক্ষে অসম্ভব। একে তিনি বৃদ্ধ, তায় চোয়ালের ক্যানসারে ভুগছেন এক দশক ধরে। বার বার যন্ত্রণাদায়ক অস্ত্রোপচারের পর কাবু, তবু সিগার ছাড়তে নারাজ জেদি মানুষটি বলেছিলেন, এই অবস্থায় অন্য দেশে ‘রিফিউজি’ হয়ে থাকার কোনও বাসনা তাঁর নেই। তা ছাড়া জার্মানিতে যা হয়েছে, সত্যি কি তা অস্ট্রিয়ায় হবে? কিন্তু সেই দুঃস্বপ্ন সত্যি হল, পাঁচ বছরের মধ্যে। ১৯৩৮ সালের ১৪ মার্চ হুডখোলা মার্সিডিজ়ে চেপে হিটলারের ভিয়েনা প্রবেশের দৃশ্যে আহ্লাদে ফেটে পড়েছিল রাস্তার দু’ধারে কাতারে কাতারে জড়ো হওয়া মানুষ। তাদের হাতে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা পতাকা, মুখে একটাই বুলি, ‘হাইল হিটলার’। অস্ট্রীয় নাৎসিরা, যারা এত দিন ঘাপটি মেরে দিন গুনছিল তাদের প্রিয় ফ্যুয়েরারের, তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল নারকীয় উল্লাস। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছিল ইহুদিদের দোকান লুঠপাট, ভাঙচুর, রাস্তায় টেনে নামিয়ে অপমান, মারধর। এতেও ভীত, সন্ত্রস্ত হননি ফ্রয়েড। এমনকি যে দিন বাড়িতে হাজির হল নাৎসি বাহিনী, শোনা যায়, নিজের স্টাডিতে পড়াশোনায় মগ্ন অশীতিপর মনস্তত্ত্ববিদ প্রথমে টেরই পাননি তাদের  উপস্থিতি। বুঝতে পেরে ধীর পায়ে হেঁটে এসে, স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলেন লুঠতরাজ করা নাৎসিদের  দিকে। ফ্রয়েডের সেই বিখ্যাত চাউনিতে নাকি চুপসে গেছিল মস্তানরা।

কিন্তু তাঁরও বিশ্বাসের ভিত নড়ে গেল ২২ মার্চ, যে দিন বাড়িতে গেস্টাপো এসে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে নিয়ে গেল তাঁর কনিষ্ঠ সন্তান অ্যানা ফ্রয়েডকে। যদিও অ্যানা এক বারের জন্যও বিচলিত হননি নিষ্ঠুর জার্মান পুলিশকে দেখে। শান্ত ভাবে হুডখোলা গাড়িতে চেপে চলে গিয়েছিলেন সিগমুন্ড-কন্যা, যিনি শুধু পিতার ভালবাসার পাত্রীই নন, ছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্যা ও সচিব, তাঁর নিশ্চিন্ত নির্ভরতার মানুষও। ব্যক্তিগত ব্যাপারে তো বটেই, নিজের সমস্ত চিন্তাভাবনা অ্যানার সঙ্গে ভাগ করে নিতেন ফ্রয়েড। সেই অ্যানাকে গেস্টাপো তুলে নিয়ে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। অনেক রাতে অ্যানা ফিরে আসার পর স্বস্তির গভীর নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন বৃদ্ধ পিতা। সেই রাতের পর থেকেই ফ্রয়েড বুঝতে পারেন, ভিয়েনা আর নিরাপদ নয়। অন্য কোনওখানে ডেরা খুঁজতে হবে।

কিন্তু যাবেন কোথায়? আমেরিকায় তার বহু ভক্ত। অথচ ফ্রয়েডের সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে ঘোর অনীহা। কাছেপিঠের মধ্যে ইংল্যান্ড, সেখানেও তাঁর গুণগ্রাহীর অভাব নেই। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রধান আর্নেস্ট জোন্স ঠিক করলেন, হাল ধরতে হবে তাঁকেই। প্রচুর ব্রিটিশ হোমরাচোমরাদের সঙ্গে ওঠাবসার সূত্রে সরকারকে রাজি করিয়ে ফেললেন জোন্স। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মিলল ছাড়পত্র। ১৯৩৮ সালের ৪ জুন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে উঠল ফ্রয়েড পরিবার। ট্রেন যখন ধীর গতিতে জার্মানির সীমানা পেরিয়ে ফ্রান্সে প্রবেশ করল, তখন নাকি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন ফ্রয়েড। রাইন নদীর ওপর দিয়ে ঝুকঝুক করে চলেছে ট্রেন। জল যেখানে ছুঁয়েছে আকাশের বিস্তার, সেই সীমারেখার দিকে তাকিয়ে মাতৃভাষা জার্মানে ফ্রয়েড উচ্চারণ করেছিলেন তিনটি শব্দ, ‘‘এখন আমরা স্বাধীন।’’

৬ জুন লন্ডনের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে ভিড় জমিয়েছিল লন্ডনবাসী, প্রিয় সিগমুন্ড ফ্রয়েডকে দেখার জন্য। বস্তুত জীবনের শেষ একটি বছর লন্ডনে স্বস্তিতে আর আরামেই কেটেছিল ফ্রয়েডের। আর্নেস্ট জোন্স ফ্রয়েড ও তাঁর পরিবারের জন্য খুঁজে বার করেছিলেন ১৯২০ সালে তৈরি পুরনো দিনের স্থাপত্যরীতিতে গড়া বিশাল এক ম্যানসন। সেই বাড়ি কিনে অনেক অদলবদল করেছিলেন পেশায় স্থাপত্যবিদ আর্নেস্ট, বাবার প্রয়োজনকে মাথায় রেখে। এমনকি সিঁড়ি ভাঙতে ফ্রয়েডের কষ্ট হয় বলে বাড়িতে বসেছিল সুন্দর ছোট্ট লিফ্‌টও। ২০ নম্বর ম্যারস্ফিল্ড গার্ডেনস-এর আলো-হাওয়া মাখা সেই বিশাল বাড়িকে বড় সুন্দর মনে হয়েছিল ফ্রয়েডের। মনে হয়েছিল, এ তাঁদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত। লন্ডনের সাধারণ মানুষদের থেকে অকুণ্ঠ ভালবাসা পেয়ে তৃপ্ত বোধ করেছিলেন তিনি। ‘এই ব্রহ্মাণ্ডে আমার শেষ ঠিকানা’ বলে অভিহিত করেছিলেন বাড়িটিকে।

কোনও তিরচিহ্ন আঁকা পথনির্দেশ ছাড়াই, বড় বড় কাচের জানলাবিশিষ্ট সেই দোতলা বাড়িকে খুঁজে পাওয়া গেল। সদর দরজার পাশের দেওয়াল জুড়ে উঠে যাওয়া গোলাপি আর সাদা লতানে গোলাপের নিশানায় নির্ভুল পৌঁছে গেলাম আমরা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের লন্ডনের বাড়িতে। অ্যানা ফ্রয়েডের ইচ্ছা অনুসারে তা এখন সংগ্রহশালা। আমেরিকার নিউল্যান্ড ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় এবং ট্রাস্টের সদস্যদের যত্ন ভালবাসা আর সেবায় চলছে এই সুন্দর মিউজিয়ম, যা এখন হ্যাম্পস্টেডের অন্যতম টুরিস্ট আকর্ষণ।

সদর দরজা পেরোলেই ফয়্যার। সেখানে টেবিলের ওপর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা আছে মিউজিয়মে সারা বছর ধরে চলা অনুষ্ঠানের আকর্ষণীয় সব ব্রোশিয়োর আর পোস্টার। পিছনের লম্বা বারান্দায় মিউজিয়মের শপ। ফ্রয়েডপ্রেমীদের মাথা ঘুরে যেতে পারে তার সম্ভার দেখে। কী নেই সেখানে? ফ্রয়েডের ছবিওয়ালা ফ্রিজ ম্যাগনেট, টি-শার্ট, কফি মগ, মিউজিয়মের ছবির ফোলিয়ো থেকে ফ্রয়েডের নিজের সমস্ত লেখার ইংরেজি অনুবাদ এবং তাঁকে নিয়ে লেখা একেবারে নতুন গবেষণার বই। সেখানেই টিকিট কাটার টেবিলও, হাসিখুশি এক মধ্যবয়সি মহিলা সামলাচ্ছেন সেটি।

জানা গেল, একটু পরেই শুরু হবে স্বপ্ন বিষয়ে ফ্রয়েডের তত্ত্বের আলোচনা। বারান্দা সংলগ্ন ডাইনিং রুমে আগ্রহী পর্যটকদের সঙ্গে জড়ো হলাম আমরাও। সেখানে দেওয়াল জুড়ে ফ্রয়েডের ভিয়েনার বাড়ির প্রমাণ সাইজের ফটোগ্রাফ। এডমন্ড এঙ্গেলমানের ক্যামেরায় তোলা এ এক ঐতিহাসিক দলিল, কারণ অব্যবহিত পরেই নাৎসিরা নাজেহাল করে ছেড়েছিল ওই বাড়িতে থাকা ফ্রয়েড পরিবারকে। নজর কাড়ে রঙিন ছবি-আঁকা সুন্দর কাঠের ক্যাবিনেট। পারস্য গালিচার কথা মনে পড়ায় তার উজ্জ্বল নীল, গোলাপি-কমলা রঙ আর মোটিফ। অস্ট্রীয় ফোক আর্টের এই অপূর্ব নিদর্শনের সংগ্রহ অ্যানা ফ্রয়েড ও তাঁর প্রিয় বান্ধবী ডরোথি বার্লিংহ্যামের।

মনস্তত্ত্ববিদ মহিলার স্বপ্নতত্ত্বের আলোচনার সূত্র ধরে এসে পড়ল ‘উলফ্‌ ম্যান’-এর প্রসঙ্গ। এই নামেই খ্যাতি লাভ করেছিলেন ফ্রয়েডের পেশেন্ট, রাশিয়ার সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য সের্গেই প্যাঙ্কেজেফ। ১৯১০ সালে, মানসিক ভাবে তুমুল বিপর্যস্ত অবস্থায় ফ্রয়েডের কাছে আসেন সের্গেই। বিপর্যয়ের কারণ শৈশবের এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। হঠাৎ গভীর রাতে দড়াম করে জানলা খুলে যায়, বালক সের্গেই দেখে— একটা গাছের নানান ডালে বসে আছে ছ’টি সাদা নেকড়ে, নিষ্পলক দেখছে তাকে। ফ্রয়েড যৌনতা বিষয়ে তাঁর থিয়োরির সূত্র ধরে সের্গেইকে বলেন, নিজের বাবা ও মাকে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখে ফেলার অভিজ্ঞতা তাঁর অবচেতনের গভীরে বাসা বেঁধেছে, আর এই ভয়াল নেকড়ের চেহারায় হানা দিচ্ছে তাঁর স্বপ্নে। এই স্বপ্নকে ভিত্তি করে সের্গেই বেশ কিছু ছবি এঁকেছিলেন।

তারই সন্ধানে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা। দেওয়াল-জোড়া বিশাল তিনটে জানলা দিয়ে আসা সূর্যের আলোয় ভেসে যাচ্ছে ল্যান্ডিং। সেখানে দুটি চেয়ার, টেবিল আর নিচু বইয়ের আলমারিতে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ফ্রয়েডের লেখা। মনে হয় যেন অনুচ্চারিত এক আহ্বান— এস, দু’দণ্ড বসে জিরিয়ে নাও। মানুষের অবচেতনের গভীরে ডুব দেওয়া এক অনুসন্ধিৎসু মনের মানুষের বাড়ি তো এমনই হওয়ার কথা। দোতলায় উঠে ডান দিকের কোণের ঘরটি অ্যানা ফ্রয়েডের স্টাডি। বইয়ের আলমারির তাকে চোখ টানে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি প্রবন্ধের সংকলন ‘সাধনা’; দিব্যি জায়গা করে নিয়েছে শেলির ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’-এর পাশে। তার পাশের ঘরটি এখন ভিডিয়ো রুম। সেখানে চলছে একটি ফিল্ম, যা থেকে দর্শক জানতে পারবেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত, ইতিহাসের সেই পর্ব যার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল মানবসভ্যতার সঙ্কটকাল, যার কেন্দ্রে ছিল ইহুদি-নিধন যজ্ঞ। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, হলোকস্ট-এর স্রষ্টা অ্যাডল্ফ হিটলারকে শ্রদ্ধাভক্তির চোখে দেখেছে বহু মানুষ। অথচ এই মানসিকতার আন্দাজ দিয়েছিলেন ফ্রয়েড— ১৯২১ সালে অর্থাৎ হিটলারের উত্থানের সময়, তাঁর ‘গ্রুপ সাইকোলজি অ্যান্ড দি অ্যানালিসিস অব দ্য ইগো’ গ্রন্থে। বুঝেছিলেন, বহু মানুষের মনস্তত্ত্বে এই রকম এক জন ‘দৃঢ়চেতা’ নেতা অপরিহার্য। সে ক্রূর, নৃশংস যাই হোক না কেন, তাকে চূড়ান্ত ক্ষমতাবান মনে করে একমাত্র তার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য ও প্রেমের মধ্যেই তৃপ্ত হয় তাদের ইগো।

এই ধরনের মনস্তত্ত্বের বিশ্লেষণ করতে পারে যে মানুষ, তার মনের ডেরাটা কী রকম ছিল? একতলায় অর্থাৎ বাড়িতে ঢুকেই ফয়্যারের ডান দিকের পুরোটা জুড়ে এই মিউজিয়মের প্রধান আকর্ষণ— সিগমুন্ড ফ্রয়েডের স্টাডি, তাঁর লাইব্রেরি এবং সংগ্রহশালা। দুটি পাশাপাশি ঘরের মধ্যেকার দেওয়াল ভেঙে ফেলে আর্নেস্ট ফ্রয়েড তৈরি করেছিলেন এই বিশাল স্পেস, যা তাঁর ভিয়েনার বাড়িতেও ছিল না। পর্দা-টানা আধো অন্ধকার সেই ঘরের মধ্যে ফ্রয়েডের আবক্ষ মূর্তি। ডান দিকের অনেকটা জুড়েই, বইয়ের আলমারির আশেপাশে রয়েছে মিশরীয় সভ্যতার দুর্মূল্য সংগ্রহ। এ ছাড়াও গ্রিক ও রোমান শিল্পবস্তু, প্রধানত মূর্তি। দেখে মনে হয় এই বিজ্ঞানীর আসল আগ্রহের জায়গা ছিল পুরাতত্ত্ব। বাঁ দিকের দেওয়াল জুড়েও বইয়ের তাক, সামনে ফ্রয়েডের পড়ার টেবিল এবং আশ্চর্যদর্শন একটি চেয়ার যা হেনরি মুরের তৈরি মানুষের চেহারার ভাস্কর্যের কথা মনে পড়ায়। মাথা, পিঠ এবং গোল করে রাখা হাতের মতো হাতল। আদতে এই চেয়ারটি ১৯৩০ সালে বানিয়েছিলেন ফিলিক্স অগেনফেল্ড, ফ্রয়েড-কন্যা মাটিল্ডার অনুরোধে। বাবার অষ্টাবক্র হয়ে পড়াশোনার অভ্যেস দেখে তাঁকে চেয়ার উপহার দিয়েছিলেন মাটিল্ডা। সামনের টেবিলে অনেক মূর্তির সঙ্গে স্থান পেয়েছে সাদা মার্বেলের বিষ্ণু, ভারতীয় সাইকোঅ্যানালিটিক সোসাইটির সশ্রদ্ধ উপহার। টেবিলের এক ধারে ব্রোঞ্জের এক শজারু। আমেরিকার নিউরোলজিস্ট জেমস পুটন্যাম-এর এই উপহার সযত্নে সাজিয়ে রেখেছিলেন ফ্রয়েড—সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাছাকাছি এলে কেমন শলাকা ফুটে যেতে পারে মনে, তারই প্রতীক বলে। টেবিলে কাগজপত্রের ওপর রাখা গোল ফ্রেমের চশমা, যেন এইমাত্র কোথাও উঠে গেছেন ফ্রয়েড।

টেবিলের উল্টো দিকে একটু তেরছা করে রাখা সেই বিখ্যাত ‘কাউচ’, যা দেখতে ভিড় করেন বহু পর্যটক। বস্তুত এই কাউচই আদতে হয়ে উঠেছে মনস্তত্ত্ববিদ এবং মনোরোগীর সম্পর্কের প্রতীক।  মহার্ঘ কার্পেটে ঢাকা কাউচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মখমলের নরম কুশন, যেখানে আধশোয়া হয়ে ফ্রয়েডকে নিজেদের মানসিক সমস্যার কথা জানাতেন তাঁর বহু স্বনামধন্য পেশেন্ট। কাউচের ডান দিকে অর্থাৎ রুগিদের মাথার দিকে চেয়ারে, তাদের দৃষ্টির বাইরে বসে থাকতেন ফ্রয়েড, পাইপ টানতে টানতে শুনতেন তাদের কথা। ১৮৯০ থেকে ১৯৩৯ অন্তত ৫০০ জনকে অ্যানালাইজ় করেছিলেন ফ্রয়েড, যাদের মধ্যে ছিলেন তাঁর কন্যা অ্যানাও। ইতিহাসে এমন মনোযোগী শ্রোতার নিদর্শন পাওয়া মুশকিল।

এই থেরাপির ভিত্তিতেই সৃষ্টি হয়েছিল ফ্রয়েডীয় সাইকোঅ্যানালিসিস, যাকে ঘিরে সেই সময় তো বটেই, পরেও রয়ে গেছে বহু বিতর্ক। হয়তো বা এর মধ্যে ‘সত্যি’র সন্ধান করাটা মূর্খামি; ধরে নেওয়া যাক ফ্রয়েডের তত্ত্বের সবটুকু মনগড়া— হয়তো আদতে স্বপ্নের কোনই গূঢ় মানে নেই। কিন্তু তা হলেও এই কাউচ এবং ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের  গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ তা মানুষের অসীম সাহসের পরিচায়ক— নিজেকে জানার এবং সেই জানার মধ্যে দিয়ে গ্রহণ করার প্রচেষ্টা। এই সব চিন্তা করতে করতে আলো-আঁধারি থেকে বাইরে বাগানে পা রাখা। খুব কেয়ারি না থাকলেও রঙিন ফুলের ঝাড় লনের মাঝখানে। চেয়ার পেতে বসলে তেরছা দেখা যায় একতলার ঘরের পর্দা-ঢাকা লম্বা ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। নিজের চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে দিলেই জানলা দিয়ে ফুলের সমারোহ দেখতে পেতেন ফ্রয়েড। হয়তো বাগানের বেড়া ও গাছপালা পেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন তিনি। দেখতে পেতেন মানুষের সমাজের ভয়ঙ্কর ভবিতব্য, যার শিকড় প্রোথিত তার অতীতে, তার নিজের মনের গহনে।