সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মহামারি রুখতে আইন

অসুখটা প্রথম হয় চিনে। সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়ায় বোম্বাই বন্দর হয়ে পুণে ও কলকাতা শহরে। অবস্থা সামাল দিতে আনা হল সাধারণ মানুষকে কোয়রান্টিন করার আইন। আইন না মানলে পুলিশের মার। আজ থেকে ১২৩ বছর আগে। সায়ন্তনী সেনগুপ্ত

quarantine
চিকিৎসা: ১৮৯৭ সালে করাচির কোয়রান্টিন শিবির। (ছবি সৌজন্য: উইকিমিডিয়া কমন্‌স)

সে  বারও নাকি শুরুটা হয়েছিল চিন-এই। ইউনান প্রদেশে। তামা আর নানা রকম খনিজের টানে এই এলাকায় মানুষ আসতে লাগল, বাড়তে লাগল জনসংখ্যা। ১৮৫০ নাগাদ সেই প্রদেশে মানুষের সংখ্যা পৌঁছল ৭ কোটিতে। এল প্লেগও। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিই ঘটাল বড় বিপদ। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে প্লেগ-বাহক মাছি আর ইঁদুর ঢুকে পড়ল চিনের জনবহুল এলাকাগুলোয়। ঠিক সেই সময়ে চিনের পুরনো বাসিন্দাদের সঙ্গে খনিজ উত্তোলনের কাজে যুক্ত থাকা হুই মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী সংঘাত প্লেগ ছড়িয়ে দিল আরও। এর পর গুয়াংডং, গুয়াংসি থেকে ক্যান্টন, সেখান থেকে হংকং। হংকংয়ের চিনা কলোনি তাই পিং সান ভরে গেল রোগীতে। দু’মাসের মধ্যে মারা গেল প্রায় দেড় লক্ষ লোক। 

তখন ঔপনিবেশিক ভারতের সঙ্গে হংকংয়ের  বাণিজ্য তুঙ্গে। জলপথে হংকং থেকে প্লেগ ঢুকল ভারতে। তৎকালীন বোম্বাই ছিল জলপথে বিদেশের সঙ্গে ব্যবসার মূল বন্দর। ১৮৯৬ সালে প্লেগ প্রথম আঘাত হানল সেখানেই। এর পর ছড়াল পুণে, কলকাতা ও অবিভক্ত ভারতের করাচিতে। সে কালের বোম্বাই যেমন ঘনবসতিপূর্ণ, তেমনই অস্বাস্থ্যকর। শহরের বস্তিগুলোয় বাসিন্দা প্রায় ৮ লক্ষ ২০ হাজার। সেখানে মিল শ্রমিকদের গাদাগাদি। না আছে নিকাশি ব্যবস্থা, না আছে পানীয় জল, না আছে গা বাঁচিয়ে থাকার জায়গা। বেশির ভাগই পরিযায়ী শ্রমিক। দু’মুঠো ভাতের আশায় ভিন রাজ্য থেকে এসে জড়ো হয়েছেন এখানে। 

এই সময় নওরোজি হিল বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে কিছু রোগলক্ষণ দেখা গেল। এঁদের অনেকেই কাজ করতেন বন্দরে। যাতায়াত ছিল শহরের বাইরের যৌনকর্মীদের কাছেও। বিদেশি নাবিকরা শহরে এসে প্রথমে উঠত এঁদের কাছেই। প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা, বমি শুরু হল অনেকের। দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারে এ সব নিয়েই কে-ই বা মাথা ঘামায়। এক দিন কাজে না গেলেই মিল মালিকদের টাকা কাটার ভয়। অসুস্থতা নিয়েই শ্রমিকরা হাজিরা দিতে লাগলেন কারখানায়। 

আরও পড়ুন: গীতবিতান আর মনসার গানে মায়ানমারের বাঙালিয়ানা

কিছু দিনের মধ্যেই অবস্থা দাঁড়াল ভয়াবহ। চিকিৎসকরাও বিভ্রান্ত। আকাসিও গ্যাব্রিয়াল ভিয়েগাস নামে এক চিকিৎসকের প্রথম সন্দেহ হল, অসুখটা বিউবোনিক প্লেগ। হংকংয়ের অবস্থা  দীর্ঘ দিন পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তিনি। তাঁর সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হল। তত দিনে হু-হু করে ছড়িয়েছে রোগ। যাঁদের ক্ষমতা আছে, পাগলের মতো পালাতে লাগলেন শহর ছেড়ে। সংক্রমণ আটকাতে শুরু হল পুলিশি তৎপরতা। অসুস্থদের খোঁজে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করল পুলিশ। অসুস্থদের আলাদা করে তৈরি হল প্লেগ শিবির, সন্দেহভাজনদের পাঠানো হল কোয়রান্টিনে। শহরের বেশ কিছু এলাকা জোর করে ফাঁকা করে দেওয়া হল। কিছু অভিযোগ ছিল স্পর্শকাতর। বলা হল, মহামারিতে আক্রান্তদের পরীক্ষার অজুহাতে মেয়েদের সম্ভ্রম নষ্ট করা হচ্ছে। কোনও মহিলা চিকিৎসক বা সহযোগী ছাড়াই, পুরুষ চিকিৎসক বা চিকিৎসাকর্মীরা মেয়েদের শরীরে হাত দিয়ে রোগ পরীক্ষা করছেন। 

এর সঙ্গে শুরু হল ধর্ম আর জাতপাত নিয়ে অশান্তি। উচ্চ বর্ণের মানুষজন নিচু জাতের লোকের সঙ্গে কোয়রান্টিনে থাকবেন না। হিন্দু-মুসলিমও রাজি হল না এক সঙ্গে থাকতে। অবস্থা এমন দাঁড়াল, কোয়রান্টিন থেকে পালাতে শুরু করলেন মানুষ। বাড়ল সংক্রমণের আশঙ্কা। পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল পুলিশি হেনস্থা, লাঠিপেটা, মারধর। শুরু হল দাঙ্গা-হাঙ্গামা, প্রতিবাদ। 

১৮৯৬-এর শেষের দিকে প্লেগ গিয়ে পৌঁছল পুণেয়। সেখানেও সাধারণ মানুষ রাজি হলেন না সরকারি হাসপাতালে যেতে। মানুষ বিশ্বাস করতে লাগল, হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ‘নেটিভ’দের মাথা থেকে এক রকমের তেল বার করে নিচ্ছে ইংরেজ চিকিৎসকরা। তাতে প্লেগ না গেলেও মানুষ প্রাণে মারা যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ভাবতেন প্লেগের জীবাণু ছড়িয়েছে ইংরেজরাই। উদ্দেশ্য, এ দেশের অধিবাসীদের মেরে ইংরেজ বসতি গড়ে তোলা। ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পুণেয় মারা গেলেন ৬৫৮ জন। শহর থেকে পালালেন আরও বেশি সংখ্যক লোক।

আরও পড়ুন: প্রথম বিদ্রোহিণী

ম্যালেরিয়া, কলেরা বা বসন্তের মতো বহু রোগ এর আগে ধাক্কা দিয়েছে ঔপনিবেশিক ভারতকে, কিন্তু এ রকম শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ধুম পড়েনি কখনওই। প্লেগের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রবণতা। শহরের সব কারখানা বন্ধ, ব্রিটিশ অর্থনীতিও ধরাশায়ী। নিরুপায় হয়ে পাশ্চাত্যের ওষুধ এ দেশে চালু করার চেষ্টা শুরু করল ইংরেজ সরকার। কিন্তু এত দিন দেশীয় ওষুধে অভ্যস্ত দেশের মানুষ নতুন ওষুধ খেতে রাজি হলেন না।

বিরোধিতা এল অন্য দিক থেকেও। প্লেগের বাড়াবাড়ি দেখে ইংরেজ সরকার চিকিৎসক স্যর ওয়ালডেমার হাফকিন-এর কাছে এই রোগের প্রতিষেধক তৈরি করার আর্জি জানিয়েছিলেন। হাফকিন এর আগে কলেরার টিকা তৈরি করেছিলেন। এ বার সরকারের নির্দেশে বাইকুল্লার মেডিক্যাল কলেজে প্লেগের টিকা তৈরির কাজ শুরু করলেন। ১৮৯৭-এ তৈরি হল প্রতিষেধক। প্রথমে হাফকিন নিজের উপর প্রয়োগ করেন প্লেগের টিকা। এর পর টিকা দেওয়া হল বাইকুল্লার জেলের আসামিদের। কিছু লোক মারা গেলেও বেশ কিছু লোক বেঁচে গেলেন। সম্ভবত টিকার জোরেই। কিন্তু সেই প্রতিষেধক তাঁকে প্রয়োগ করতে দিলেন না কিছু ইংরেজ আধিকারিকই। ফলে ওষুধ তৈরি হলেও তা কাজে লাগানো গেল না। 

বোম্বাইয়ে প্লেগ মহামারির আকার ধারণ করার মাস চারেক পর সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া সরকারকে মহামারি রুখতে কঠোর বন্দোবস্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন। এর কিছু দিন পরে রানির নির্দেশের মূল বক্তব্যকেই পরিণত করা হয় আইনে। ১৮৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পাশ হয় ‘এপিডেমিক ডিজ়িজ়েস অ্যাক্ট’ বা মহামারি আইন। এই আইনে বলা হল, যখনই কোনও রাজ্যে বা রাজ্যের কোনও অংশে বিপজ্জনক মহামারির আশঙ্কা দেখা দেবে, তখনই এই আইন প্রয়োগ করা যেতে পারে। এর জন্য প্রয়োজনে কোনও সরকারি আধিকারিককে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারও দেওয়া হয়। এ ছাড়াও বলা হয়, যদি সরকার মনে করে যে দেশে মহামারিজনিত বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, তখন তারা কোনও জলযান বন্দরে ভিড়বার ব্যাপারে বিধিনিষেধ জারি করতে পারে। এই আইন অমান্যকারীদের ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৮৮ ধারা অনুসারে সাজা দেওয়া যেতে পারে। 

আইনের শুরুতেই বলা হয়েছিল, জনগণ যেন সরকারের এই বিশেষ ক্ষমতাকে মেনে চলে। বহু ইতিহাসবিদ মনে করেন, প্লেগ রোধে এই বিশেষ ব্যক্তি বা আধিকারিকদের হাতে অত্যধিক ক্ষমতা প্রদান আসলে ব্রিটিশ সরকারের নিপীড়নমূলক আইনেরই একটা দিক। এই আইন পাশ হওয়ার পর বালগঙ্গাধর তিলক তাঁর ‘কেশরী’ এবং ‘মরাঠা’ পত্রিকায় ইংরেজ সৈন্য দিয়ে প্লেগ নিয়ন্ত্রণ এবং জবরদস্তির বিরুদ্ধে বিস্তর লেখালিখি করেন। ফলে তাঁকে ১৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিলক অভিযোগ করেন, দমনে সিদ্ধহস্ত ইংরেজ সরকারকে এই আইন এতটাই বেপরোয়া করে তুলবে যে, দেশের অন্য জায়গাতেও অত্যাচার হবে মাত্রাছাড়া। বোম্বাই লাগোয়া পুণেয় ঘটেছিলও তাই। এখানে চিকিৎসকদের বদলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্লেগ আক্রান্তদের খুঁজে বার করার দায়িত্ব নিলেন ডারহাম লাইট ইনফ্যানট্রির মেজর প্যাগেট। তাঁর অধীনে ছিলেন ৮৯৩ জন আধিকারিক। এর আগেই মেয়েদের শারীরিক পরীক্ষা এবং বাড়ি তল্লাশির ব্যাপারে মহিলাদের সঙ্গে নেওয়া বাধ্যতামূলক করেছিল সরকার। সেই নির্দেশকে হেলায় উড়িয়ে চলল ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ। ইংল্যান্ডে গিয়ে গোখলে বললেন, সারা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ইংরেজ সৈন্যরা। তাঁরা না জানে দেশি ভাষা, না জানে দেশীয় সংস্কার।

১২৩ বছরের পুরনো সেই বিতর্কিত আইন এখন করোনা মোকাবিলায় সরকারের হাতিয়ার। এর আগেও কয়েক বার দেশে প্রয়োগ হয়েছে এই আইন। কখনও গুজরাতে কলেরা রোধে, কখনও চণ্ডীগড়ে ডেঙ্গি এবং ম্যালেরিয়া আটকাতে, কখনও আবার পুণেয় সোয়াইন ফ্লু থামাতে। কিন্তু এ বার এই আইনের প্রয়োগ আরও ব্যাপক। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও দিল্লি, কেরল, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র-সহ আরও কিছু রাজ্যে নতুন করে লাগু হয়েছে আইনটি। কিন্তু তার পরই দেখা গিয়েছে, আইনটির সীমাবদ্ধতা কম নয়। সেগুলো দূর করতে সম্প্রতি অর্ডিনান্স এনে আইন পরিমার্জন ও সংশোধন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। 

সারা দেশে ক্রমাগত স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসকদের উপর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই আইনে এ বার জোর দেওয়া হয়েছে এঁদের নিরাপত্তার দিকে। বলা হয়েছে, এঁদের কোনও রকম ক্ষতি বা আঘাত করার চেষ্টা করা হলে অথবা মহামারির সঙ্গে সম্পর্কিত মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট হাসপাতাল, সাধারণ হাসপাতাল, কোয়রান্টিন সেন্টার ভাঙচুর করা হলে বা এই ধরনের সেন্টার তৈরিতে বাধা দেওয়া হলে তিন মাস থেকে পাঁচ বছর অবধি জেল হতে পারে। সেই সঙ্গে হতে পারে পঞ্চাশ হাজার থেকে দু’লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। চিকিৎসাকর্মীদের আঘাত বা ক্ষতি গুরুতর হলে ছ’মাস থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড, এক থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। এর জন্য দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত এক মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। বিচারও শেষ করতে হবে এক বছরের মধ্যে। মামলা শেষ হতে দেরি হলে বিচারককে তার কারণ নথিভুক্ত করতে হবে। ব্রিটিশ আমলে রোগ সংক্রমণ আটকানোর জন্য বন্দরগুলোয় নজরদারির ব্যবস্থা ছিল। এ বার এর সঙ্গে যুক্ত হল বাস, ট্রেন, পণ্যবাহী যান এবং বিমানও। 

পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আইনের সংশোধন হলেও তাতে এখনও কিছু খামতি রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। ব্রিটিশ শাসনকালে এই আইন বলবৎ করা হত 

রোগ সংক্রমণ রোধের সঙ্গে সঙ্গে দমন পীড়নের জন্যও। কল্যাণকামী রাষ্ট্রে সেই আইন খানিকটা সংশোধিত হওয়া উচিত বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। আইনজীবী জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়-এর মতে, মহামারি আইনে বিশেষ পদাধিকারীকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলেই মানবাধিকারের দিকটিও এই আইনে যুক্ত হওয়া উচিত, যাতে কেউ অকারণে নির্যাতিত হলে আইনের সাহায্য নিতে পারেন। সেই অর্থে আইনটি খানিকটা একপেশে বলেই মত তাঁর। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে এখন বিপন্ন পুলিশও। সংশোধিত আইনে চিকিৎসকদের সঙ্গে পুলিশকর্মীদেরও নিরাপত্তার ব্যবস্থা সরকারের সুনিশ্চিত করা উচিত বলে মনে করছেন জয়ন্তবাবু। 

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণছবিভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকাকোন দিনকোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন