Advertisement
E-Paper

দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির দেশে চলুন

রিমঝিম শ্রাবণে পাহাড় ধুয়ে আরও সবুজ। বৃষ্টিভেজা পাহাড়ে সবুজের ঘনত্ব বাড়তে থাকে। দু’হাত বাড়িয়ে দু’টি পাতা, একটি কুঁড়ির অবিরাম আলিঙ্গনকে সঙ্গী করে উত্তরবঙ্গের মুগ্ধতায় শান্তনু চক্রবর্তী।প্রাকৃতিক রূপশোভার কোলাজে শুধুই বুঁদ হয়ে থাকতে চাইলে ব্যাগ গোছান আজই।

শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০১৮ ১০:৩৬
সুন্দরী পাহাড়ের তুমুল হাতছানি। ছবি: লেখক।

সুন্দরী পাহাড়ের তুমুল হাতছানি। ছবি: লেখক।

চার্মিং চামং

এনজেপি থেকে আকাশ মেঘলা। মাঝে মাঝে রোদের ঝলক চলকে পড়ছে। হিমেল হাওয়াকে সঙ্গী করে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মিরিক ঢুকে পড়লাম। নামজাদা সব চা-বাগানের ঢেউ। দেশ-বিদেশের বাজারে এই সব বাগানের চা যাকে বলে, তুফান তোলে। মেঘ-কুয়াশা-রোদ্দুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পৌঁছে গেলাম। লেপচাজগৎ-পোখরিয়াবং-এর রাস্তায় প্রায় ৮ কিমি গিয়ে চামং মোড় চলে এল। এখান থেকে ৩ কিমি আসতেই ধরা দিল পাহাড়ের কোলে বসানো মস্ত এক হেরিটেজ বাংলো। মোড়। প্রিয় শৈলশহর দার্জিলিং থেকে মেরেকেটে ২৩ কিমি। পোখরিয়াবং থেকে বাঁয়ে মোড়। আঁকাবাঁকা আসবুজ পথ। মাঝে মাঝে বাক্সবাড়ি সেঁটে আছে পাহাড়ের গায়ে। উঁচু পাহাড়ের ঢালে চা-বাগানেই ঢেউ। মাত্র ৩ কিমি যেতেই ধেয়ে আসা সবুজের মাঝে চামং টি এস্টেট। আর তার আশেপাশে আরও বেশ কিছু কটেজ। চামং চিয়া বাড়ি।

সামনের উন্মুক্ত আকাশ জুড়ে শুধুই সবুজের ঢেউ খেলানো চা-বাগান। সাজানো গোছানো ১১০ বছরের হেরিটেজ বাংলো। ম্যানেজার সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। বাংলোর কোল ঘেঁষা সুন্দর নবনির্মিত রেস্তরাঁ। নীচের চা-বাগানের ঢাল বরারর সুন্দর কটেজে গিয়ে উঠলাম। খাদের ধারে ধুপি গাছের সারি। সামনে সবুজমেশা লন। লনের শেষে নেমে গিয়েছে খাদ। খাদের গায়ে হেলান দেওয়া সুন্দর নজরমিনার। মাথার উপর ছাউনি দিয়ে সুন্দর বসার জায়গা করা। পাঁচটি নজরমিনার। সামনে অতলান্ত পাহাড়ের ঢাল। ধাপে ধাপে নেমে গিয়েছে চামং চা-বাগান। দূরে দার্জিলিং পাহাড়ের হাতছানি। মেঘ, কুয়াশা, রোদ্দুরের উচ্ছ্বাস চলকে পড়ছে।

প্রায় ৫০০ একর এলাকা জুড়ে এই চামং চা-বাগানের ব্যাপ্তি। মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মখমলি চা-বাগানের কোলে যেন খেলে বেড়াচ্ছে। আবার মাঝে মাঝে মেঘ পাহাড়ের কোলে ঢলে পড়ছে। আবার মেঘ ছুঁয়ে যাচ্ছে শরীর। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আপনমনে টিপাই সারছেন একদল মহিলা। এই চা-বাগান তাঁদের প্রাণ। এমন প্রাকৃতিক রূপশোভার কোলাজে শুধুই বুঁদ হয়ে থাকলাম।

আরও পড়ুন: ভরা বর্ষায় কম খরচে শিলং-গুয়াহাটি বেড়ানোর হাতছানি ভারতীয় রেলের​

এখান থেকে চোখে বাইনোকুলার লাগালেই গাছে গাছে পাখিদের দেখা মেলে। প্রায় ১৫০ প্রজাতির পাখির দেখা মেলে সারা বছর। বার্ডওয়াচারদের স্বর্গরাজ্য। দূরে এক বিদেশি চিত্রগ্রাহককে দেখলাম, লেন্স তাক করে বসে আছেন।

লাঞ্চ সেরে নিলাম। দূরে পাহাড়ের মাথায় এক শিবের মন্দির রয়েছে। হাল্কা ট্রেকে এক লহমায় মন্দিরে। এখান থেকে চামংকে অসাধারণ লাগে। আশপাশের গ্রাম ঘুরে নিলাম। সহজ, সরল এক সুন্দর গ্রামজীবন মন ছুঁয়ে গেল। ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্য। হাল্কা কুয়াশার কালচে–নীলে মিশেছে হলদেটে মায়াবি আলোয় মাখামাখি রোম্যান্টিক, চামং চিয়া বাড়ি। চা সংক্রান্ত অনেক তথ্য দিলেন এখানকার ম্যানেজার সাহেব।

পর দিন চা-বাগান ও ফ্যাক্টরি পরিদর্শনে নিয়ে গেলেন ম্যানেজার সাহেব। ৩-৪ রকমের চা-ও টেস্ট করালেন। ব্রেকফাস্ট সেরে বিদায় জানালাম চামং-কে। চামং হেরিটেজ চা বাগান এক কথায় অপূর্ব।

কোথায় থাকবেন

চামং মাউন্টেন রিট্রিট অ্যান্ড স্পা। ৯টি থাকার জায়গা। দু’জনের ভাড়া ১০ হাজার টাকা। লাঞ্চ, ব্রেকফাস্ট, ডিনার-সহ। ট্যাক্স আলাদা। যোগাযোগ: 09674488751

রঙ্গারুন যেন মায়াবী স্বপ্নপুরী। ছবি: লেখক।

রঙিন রঙ্গারুন

দার্জিলিং যাঁরা বেড়াতে যান তাঁরা জোড়বাংলো মোড় চেনেন। এরই কাছে ৩ মাইল মোড়। ডান দিকে ঢুকে কিছুটা গেলেই ঘন জনবসতি। এর পর হাল্কা হয়ে আসে জনবসতি। শুরু হয় গহন অরণ্যের পথ। জনহীন, নির্জন, পাকদণ্ডী চলে গিয়েছে সিঞ্চল স্যাংচুয়ারির অন্দরমহলে। ঢুকতেই একরাশ কুয়াশা স্বাগত জানাল। বাঁক নিয়ে ব্রেক কষলেন চালক। একদল চিতল হরিণ খেলতে খেলতে পথের মাঝে চলে এসেছে। তাদের চেনা পথে অচেনা আগন্তুকদের দেখে আবার বনের ভেতরে চলে গেল। জঙ্গল শেষ হতেই, পাহাড়ের গায়ে বাক্স বাড়ি দিয়ে সাজানো রঙিন ফুলের বর্ণময় পাহাড়ি গ্রাম। আর ঠিক তার নীচেই, বিস্তীর্ণ ঢালে সবুজ নকশা আঁকা চা-বাগান।

এখানে বেশ কিছু বাড়িতে গড়ে উঠেছে হোমস্টে। গাড়ি থেকে নামতেই খাদা (সিল্কের উত্তরীয়) পরিয়ে স্বাগত জানালেন কিশমত রাই। বাড়ির অন্দরমহলটা পরিপাটি করে সাজানো। এদের আন্তরিকতা, অতিথি আপ্যায়ন মুগ্ধ করল। এখন বৃষ্টি উধাও হয়ে ক্ষণিকের স্বস্তি ফিরেছে। হঠাৎ উল্টো দিকের নীলচে পাহাড়ের দিকে চোখ যেতেই পাহাড়ের কোলে কাঞ্চনজঙ্গা আর দার্জিলিংয়ের ম্যাল দেখে নিলাম। শুধু কি তাই? জলাপাহাড়, অবজারভেটারি, টাইগার হিল সমেত গোটা দার্জিলিংকে এখান থেকে অসাধারণ লাগছে। দার্জিলিং থেকে মাত্র ১৬ কিমি দূরের অনাঘ্রাত সৌন্দর্যের নাম ‘রঙ্গারুন চা বাগান’। এক সময় প্রায় ১৫০ বছরের এই বাগানের চা ঠাঁই পেত বাকিংহাম প্যালেসে। এ বাড়ির উঠোন, ও বাড়ির বারান্দাকে ছুঁয়ে পৌঁছে গেলাম চা-বাগানের অন্দরমহলে। সূর্যের আবছায়া উধাও, নীল আকাশের বুকে চাঁদের আভাস। রাতে ডিনারে নেপালি কালা ডাল, রাইস, আলু-স্কোয়াশ কারি, দেশি মুরগির মাংস। স্বাদে অনবদ্য।

পর দিন ভোরে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে চেনা-অচেনা ফুলের বিছানা আর রাসায়ানিক সারমুক্ত ফসলের বাহার দেখতে দেখতে ঢুকে পড়লাম চা-বাগানের অলিগলিতে। হালকা কুয়াশাকে সঙ্গী করে চলে এলাম রুংদুং খোলার ধারে। হাড়গিলে খোলা সামান্য বৃষ্টিতে নাচতে নাচতে নেমে আসছে পাহাড়ের গা বেয়ে। শীতে হিমালয়ের পরিযায়ীদের দেখা মিলবে। জ্যোৎস্নামাখা রাতের রঙ্গারুন যেন, মায়াবী স্বপ্নপুরী। হিরের হার জড়ানো গোটা দার্জিলিংকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করলাম।

কী ভাবে যাবেন নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে ৩ মাইল মোড় থেকে ডান দিকে ৪ কিমি গেলেই রঙ্গারুন চা বাগান। মোট দূরত্ব ৭৫ কিমি।

কোথায় থাকবেন এখানে থাকার সেরা ঠিকানা ‘খালিং কটেজ’ (০৯৪৩৪০৭২৫৫২)। থাকা খাওয়া সমেত জনপ্রতি ১৫৫০টাকা।

অনন্য ডুয়ার্সের আরও এক রূপনগর। ছবি: লেখক।

কেয়াবাত কুমাই

পাহাড় ছেড়ে এ বার তরাইয়ের ডুয়ার্সের এক অসাধারণ ঠিকানায়। অনন্য ডুয়ার্সের আরও এক রূপনগর। মেটেলি হয়ে কুমানি মোড় থেকে গ্রাম পেরিয়ে এসে দেখা মিলবে চঞ্চলা কুমাই নদীর। দূরের পাহাড়, তার নীচে ছবি আঁকা গ্রাম, সবুজ ভ্যালি আর কুমাই নদীর পাগলপারা মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতাকে সঙ্গী করে একটা চড়াই পেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়ালাম দিগন্ত বিস্তৃত দু’টি পাতা আর একটি কুঁড়ির দেশে। উফ্, কী অসহ্য সবুজ! আদিগন্ত আকাশের সীমানা জুড়ে হিমেল হিমালয়ের বিস্তার। তবে এই সময় হিমালয়ের মুখভার। তার অভিমানী বাদলা দিনই ভরসা। তারই পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে নিস্বর্গের এক অনবদ্য রূপশোভা। বুকের মাঝে মখমলি সবুজ কার্পেট বিছানো চা বাগান। তামাম চা-প্রেমীর কাছে এই অল্পচেনা নিস্বর্গের নাম কুমাই।

যে দিকে চোখ যায় সে দিকেই মনমাতানো সবুজের গালিচা বিছানো। সেই ঢেউ খেলানো চা-বাগানের মাঝে খানিক তফাতে ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষরাজদের বিস্তার। দূরে পাহাড়ের সীমারেখা জুড়ে হিমালয়ের আভাস। হিমেল হাওয়ার স্পর্শ, গাঢ় সবুজের মলাটমোড়া কুমাই চা বাগান থেকে চলে এলাম আপার কুমাইতে। এখানে প্রকৃতি আরও সুন্দর, আরও ছবি আঁকা। সহজসরল গ্রামের মাঝে নানা আদিবাসীর বসবাস। তারই মাঝে সুন্দর এক হোমস্টে। খাদা পরিয়ে স্বাগত জানালেন বিজয় দাজু। তারপর, অসাধারণ আতিথেয়তার বহর। বারান্দা থেকে একসঙ্গে, একফ্রেমে পাখির চোখে আরণ্যক, আসবুজ ডুয়ার্সের অনবদ্য রূপ। দূরে, রূপোলী রেখার মতো মূর্তি নদী। অসাধারণ! পর দিন ভোরে কুমানি থেকে হেলি ভিউ পয়েন্ট, কুমাই পার্ক, লালি গুড়াস পয়েন্ট, গ্রিন ভ্যালি, ২০০ বছরের প্রাচীন গুম্ফা এবং দূরে নীলচে ভুটানের নানা ভ্যালি ভিউ দেখে আবিষ্কার করুন এক অনন্য ডুয়ার্সকে।

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে নিউ মাল জংশন থেকে গাড়িতে চালসা থেকে কুমানি মোড় হয়ে মাত্র ২৫ কিমি দূরত্বে কুমাইয়ের চা বাগান।

কোথায় থাকবেন এখানে থাকার জন্য আপার কুমাইতে রয়েছে, কুমাই গোর্খা হোমস্টে (০৯৪৭৫৯১১১২৫) থাকা-খাওয়া নিয়ে জনপ্রতি ১২০০ টাকা। রয়েছে সাহিল হোমস্টে (৮৩৭২৯৫৪৪০৪/৮১৪৫৮৫০৯৭৯) থাকা-খাওয়া নিয়ে মাথাপিছু ১২০০ টাকা। গাইড নিয়ে নানা স্পটে ঘোরার চার্জ আলাদা।

আরও পড়ুন: ছোট্ট ছুটির আশনাই, সিকিমের আরিতার

উত্তরবঙ্গের অল্পচেনা ডেস্টিনেশনে যাওয়া চাই। কুয়াশামাখা খরস্রোতা নদী কিংবা চলমান জীবনছবিতে ক্লিক, ক্লিক। চলতি পথে মেঠো গানের সুর শুনলেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়া। লাদাখে গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া মারমটের ছবি তুলতে ভিজে মাটিতে সটান শুয়ে অপেক্ষায় থাকা— এই নিয়েই ক্যামেরা আর কলম সঙ্গী করে ২২টা বছর। প্রকৃতির টানে ছুটে বেড়ানোটা থামেনি।

travel darjeeling chamong rangaroon kumai
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy