Advertisement
E-Paper

আরামবোল-ভাগাতোর-আঞ্জুনা-বাগা-কালাঙ্গুট

গোয়া বললেই ভেসে ওঠে সফেন সমুদ্র-দুষ্টুমিষ্টি সৈকত আর ক্যানভাস ছাওয়া নীল আকাশ। বেড়ানো শুরু করুন উত্তর গোয়া থেকে।১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে গোয়া ‘অপারেশন বিজয়’-এর ভেতর দিয়ে পর্তুগিজ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতভুক্ত হলে কী হবে, অতি অল্প সময়ের ভেতরে দেশের সর্বাধিক ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি স্টেট হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে।

অরুণাভ দাস

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০১৭ ১৮:৩৩
দূর থেকে আগুয়াদা ফোর্ট।

দূর থেকে আগুয়াদা ফোর্ট।

আরবসাগর ধোয়া গোয়ার তটরেখা ১৩১ কিমি দীর্ঘ। সৈকতের সমান্তরালে পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ও তার অসংখ্য শিরা-উপশিরা গোয়ার প্রকৃতিকে অকৃপণ ভাবে সাজিয়েছে। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে গোয়া ‘অপারেশন বিজয়’-এর ভেতর দিয়ে পর্তুগিজ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতভুক্ত হলে কী হবে, অতি অল্প সময়ের ভেতরে দেশের সর্বাধিক ট্যুরিস্ট ফ্রেন্ডলি স্টেট হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে। উত্তরে মহারাষ্ট্রের দিকে গোয়ার প্রথম জনপ্রিয় বিচ আরামবোল ও দক্ষিণে কর্নাটকের দিকে শেষ সুপরিচিত সৈকত পালোলেম। মাঝখানে অগণিত ছোট-বড় সৈকত আলাদা আলাদা রূপে নজর কাড়ে। শহরে যেমন থাকার ব্যবস্থা আছে, তেমনই বিচে রাত কাটানোর ঢালাও আয়োজন। তবে, শুধু বিচগুলি গোয়ার আকর্ষণ নয়, পুরনো দিনের মন্দির, পর্তুগিজ শাসনকালের সৌধমালা ও পাহাড়, অরণ্য, জলপ্রপাত— সবই রয়েছে ছোট্ট রাজ্য গোয়ার ঝুলিতে। পুজোর সময়ে সদ্য বর্ষা কাটিয়ে ওঠা গোয়ার প্রকৃতি অনেক বেশি সবুজ ও সতেজ।

যেখানে পাহাড়ের শেষ, সেখান থেকেই শুরু বাগা বিচ

বেড়ানোর সুবিধার জন্য উত্তর ও দক্ষিণ গোয়া, এই দু’ভাগে ভাগ করে ঘোরা যেতে পারে। গোয়া ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন ও বিভিন্ন হোটেল রিসর্ট যেমন মাইক্রো বাসে বা ছোট গাড়িতে প্রতি দিন আলাদা নর্থ গোয়া ও সাউথ গোয়া ট্যুর চালায় ৮ ঘণ্টার জন্য, তেমনই টু হুইলার বা ফোর হুইলার ভাড়া নিয়ে জমে যায় বিচ হপিং। ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলে তো কথাই নেই, ড্রাই গাড়ি ভাড়া নিয়ে তেল ভরে যে দিকে দু’চোখ যায় বলে টোটো কোম্পানি।

গোয়া মিউজিয়মের প্রবেশপথ

আজ চলুন উত্তর গোয়া ঘুরে নেওয়া যাক। উত্তর গোয়ায় অসংখ্য বিচের মধ্যে যেগুলি দেখবেনই— আরামবোল, ভাগাতোর, আঞ্জুনা, বাগা ও কালাঙ্গুট। দূরবর্তী বলে আরামবোল সবচেয়ে নিরালা। লাল পাহাড়, নীল আরবসাগর আর আপনারা ক’জন। কাছেই টিরাকোল দুর্গ, ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতি। বর্তমানে হেরিটেজ হোটেল। সাগরের ঢেউ অনবরত টিরাকোলের পাঁচিলে ধাক্কা মেরে যাচ্ছে।

আঞ্জুনা বিচে পসরা

লাল পাথরের ডোবা পাহাড়ের ধারে নারকেল বাগানের পাড় বসানো ভাগাতোর সৈকতের আকর্ষণ চিরকালীন। গোয়ার কোনও বিজ্ঞাপন এই বিচের ছবি ছাড়া হবে না। মানুষের মেলা যার সামান্যতম সৌন্দর্যহানি ঘটায় না। একটু দূরে আঞ্জুনা বিচ তুলনায় ছোট হলেও পরিবেশের গুণে অসাধারণ। পাহাড়ের গায়ে বেশ কিছু সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলে সোনাহলুদ বালিয়াড়ি। হাতির পিঠের মতো নানা আকারের ডোবা পাথর ছড়িয়ে রয়েছে সাগরের তীর বরাবর। প্রচুর পরিমাণে লৌহ আকরিক থাকায় পাথর ও পাহাড়ের রং লাল। আঞ্জুনা বিচে স্নান করা একেবারে নিরাপদ নয়। এখানে প্যারা গ্লাইডিংয়ের সুযোগ পাবেন। আকাশ থেকে আরবসাগর ও সহ্যাদ্রি পর্বতের গলাগলি দেখা অসাধারণ অভিজ্ঞতা।

আরও পড়ুন: হাতে সময় নিয়ে দেখুন, মুগ্ধ করবে খাজুরাহো

তুলনায় বাগা বিচ সবুজ পাহাড়ের ছায়ায় অনেক প্রশস্ত ও জনবহুল। বিনোদনের হাজার উপাদান বালিয়াড়ির ধারে। অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস-এর বহুবিধ আয়োজন, সূর্যস্নানের ঢালাও ব্যবস্থা, সারি সারি বিচ স্যাগে মুখরোচক দেশ বিদেশের খাবার চাখার সুযোগ— সব মিলিয়ে বাগা বিচ তুলনাহীন। ২ কিমি দূরে কালাঙ্গুটেকে বাগা-র এক্সটেন্ডেড পার্ট বলা যেতে পারে। দীর্ঘ সৈকতরেখা স্নানের জন্য আদর্শ। তাই হাজার হাজার স্নানার্থীর ভিড় লেগেই আছে সকাল থেকে সন্ধে। সঙ্গে যথারীতি নানাবিধ অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস। বাঙালি পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কালাঙ্গুট-এ। বিচে নামার রাস্তার দু’ধারে মেলার মতো অগণিত দোকান, স্মারক কেনাকাটার ও সামুদ্রিক খাবারের।

কালাঙ্গুট সমুদ্র সৈকতে পর্যটকের ভিড়

ভাস্কো শহর তথা ডাবোলিম এয়ারপোর্টের কাছে বোগমালো বিচ বেশ আধুনিক আর ঝাঁ চকচকে। আমরা প্রত্যেক বার বিমান ধরার আগে একচক্কর বোগমালো ঘুরে নিই। এর কাছেই হোল্যান্ট বিচের খবর বাইরের দুনিয়ায় সে ভাবে পৌঁছয়নি বলে আজও অকৃত্রিম। উত্তর ও দক্ষিণ গোয়ার প্রায় সব বিচে নিরাপদে সমুদ্রস্নানের জন্য সর্বাধুনিক নজরদারির ব্যবস্থা আছে। এমনিতে আরবসাগর খুব একটা উত্তাল নয়। ছোট-বড় জনবহুল ও জনবিরল প্রায় প্রতিটি সৈকতে রয়েছে টাওয়ারে বসা বে ওয়াচারদের সতর্ক নজরদারি। রেসকিউ পার্টির মোবাইল ভ্যান ঘুরতেই থাকে বালিয়াড়ির এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। আবার স্নানের জন্য নিরাপদ ও বিপদসঙ্কুল এলাকাগুলি আলাদা রঙের পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা থাকে। লাল পতাকা মানে বিপজ্জনক, আধাআধি লাল ও হলুদ পতাকা মানে সাবধানে জলে নামা যেতে পারে এবং হলুদ পতাকা মানে স্নানের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ।

আরও পড়ুন: দার্জিলিং-কালিম্পং-লাভা-রিশপ-লোলেগাঁও

মিস করবেন না বাগা বিচ

সন্ধের পরেও ঘোরার জন্য গোয়ার বিচগুলি নিরাপদ। হ্যাপেনিং নাইট লাইফ গোয়া ছাড়া ভারতের খুব কম জায়গাতেই পাওয়া যাবে। নাচ, গান উৎসব লেগেই আছে। গোয়া কার্নিভ্যালের তো বিশ্বজোড়া খ্যাতি। খাদ্য রসিকদেরও স্বর্গ গোয়া। বলা হয়, এখানকার তিন বিখ্যাত খাদ্যবস্তু হল ফিশ, ফেনি ও ব্যাবিংকা। গোয়ার নিজস্ব সুরা ফেনি দু’রকম হয়, কাজু ফেনি ও কোকোনাট ফেনি। ব্যাবিংকা এক ধরনের মিঠাই। মাছ, চিংড়ি ও কাঁকড়ার তো অতুল প্রাচুর্য। গোয়ার নিজস্ব পদ চিকেন ভিন্দালু পরখ করতে ভুল হয় না যেন। মনে রাখবেন, আর্দ্রতার জন্য দিনেরবেলায় প্রচুর ঘাম হয় গোয়ায়। তাই জল ও অন্যান্য পানীয় সবসময় সঙ্গে থাকা চাই।

গোয়ার বিচে উপকূল সুরক্ষা বাহিনী

একটা পুরো দিন রাখা যায় গোয়ার রাজধানী পানজিম বা পানাজির জন্য। মান্ডভি নদীর ধারে ছবির মতো শহর। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার অপূর্ব সমন্বয়। কয়েকটি চার্চ ও ঐতিহাসিক সৌধমালা দর্শনীয়। আসিসি চার্চ দেখলে পুকার সিনেমার কথা মনে পড়ে যাবে। বিকেলের দিকে মান্ডভি নদীতে সানডাউন ও সানসেট ক্রুজের ব্যবস্থা আছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে। বড় সাজানো জলযানে জলবিহার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা। সঙ্গে মুখরোচক ফাস্ট ফুড। প্রতিটি এক ঘণ্টার ক্রুজ। জলের বুক থেকে মান্ডভির মোহনায় সূর্যাস্তের দৃশ্য ভারি সুন্দর। দিনেরবেলায় অন্য ক্রুজের আয়োজন করে গোয়া ট্যুরিজম। জলে ভেসে গোয়ার গ্রামাঞ্চল বেড়াতে খুব ভাল লাগে। পানাজিতে নদীর ওপারে অন্য ঘাট থেকে সকালে ডলফিন ক্রুজের ব্যবস্থা আছে ছোট মোটরবোটে।

মান্ডভি নদী থেকে গোয়ার রাজধানী পানজিম

মান্ডভি নদীর মোহনায় ডলফিন যেমন দেখা যায়, তেমন পাড়ের পাহাড়ে অতীতসাক্ষী আগুয়াদা ফোর্ট ও তার নীচে অপরূপ কোকো বিচ দেখে নেওয়া যায়। আলাদা করে ফোর্ট ঘুরে নেবেন গাড়িতে। এটাই ছিল পর্তুগিজদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। এর বিপরীত দিকে পানাজির শহরতলিতে মিরামার বিচ। দীর্ঘ বালিয়াড়ির বুকে মানুষের মেলা বসে বিকেলবেলায়। আরও ৫-৬ কিমি গেলে কিংবদন্তি মাখা দোনাপাওলা হারবার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। জই-স্কুটারে চড়ে ঘোরার মজাই আলাদা। দোনাপাওলার মূর্তির পাশে টাওয়ারে উঠে সূর্যাস্ত দেখে তবেই ফিরবেন। যাঁরা চেনা পথে ঘোরার ফাঁকে অজানা কোথাও নিরালায় একবেলা কাটাতে চান তাঁদের জন্য ফোর্ট আগুয়াদার কাছেই আছে সিনকুইরিম বিচ।

সময় পেলে টুক করে দেখে নেওয়া যায় আগুয়াদা ফোর্ট

পানাজির উল্টো দিকে সবুজ গ্রাম ও ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে রাস্তা গিয়েছে ওল্ড গোয়ায়। পর্তুগিজরা বর্তমান রাজধানীর ১০ কিমি দূরে এখানেই তাদের রাজধানী বানিয়েছিল। অতীতের স্মৃতি বহন করছে নানা সৌধ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সেন্ট ক্যাথিড্রাল, সেন্ট ক্যাজিটান চার্চ, সান্তামোনিকার কনভেন্ট ইত্যাদি। সবচেয়ে আকর্ষক ব্যাসিলিকা অব বম জেসাস। ভেতরের অংশ বিশাল ও দর্শনীয় শিল্পের আধার। এখানেই সেন্ট পিটারের দেহাবশেষ কাচের আধারে রক্ষিত আছে। গোয়ার অতীত ঐতিহ্য বুঝে নেওয়ার জন্য এক বার যেতেই হবে অ্যানসেস্ট্রাল গোয়া মিউজিয়মে। মডেল দিয়ে ইতিহাস বোঝানো হয়েছে।

কালাঙ্গুট বিচে প্যারাগ্লাইডিং

ওল্ড গোয়ার ঘাট থেকে লঞ্চে মান্ডভি নদী অতিক্রম করলে চেরাও দ্বীপ। সেখানেই সালিম আলি বার্ড স্যাংচুয়ারি। তার ভেতর দিয়ে আলো-ছায়ার আলপনা আঁকা রাস্তা গিয়েছে মায়েম লেকে। পাহাড়ঘেরা এক অল্পচেনা নীল নির্জন অন্য গোয়া। মায়েম লেকের বিকল্প পথ গিয়েছে পানাজি থেকে মাপুসা হয়ে লাল পাহাড়ের দেশ অতিক্রম করে। সেখানেই আকবরি মসজিদ দর্শনীয়। আবার মায়েম লেক থেকে সামান্য দূরে সপ্তকোটেশ্বর শিবমন্দির। নিরালায় শখের অজ্ঞাতবাসের ঠিকানা গোয়া ট্যুরিজমের মায়েম লেক রিসর্ট। নর্থ গোয়া খুঁটিয়ে দেখার জন্য পুরো দু’টি দিন তো লাগবেই।

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে সকালের দিকে প্রতি দিন একাধিক সংস্থার উড়ান আছে গোয়ার ডাবোলিম বিমানবন্দর পর্যন্ত। ভায়া মুম্বই কম-বেশি ৪ ঘণ্টার উড়ান। হাওড়া থেকে সোম, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিবার রাত ১১টা ৩০-এ ছাড়ে অমরাবতী এক্সপ্রেস। দু’রাত পার করে সকালে পৌঁছয় ভাস্কোডাগামা। দক্ষিণ গোয়ায় থাকার পরিকল্পনা হলে মারগাঁওতেও নেমে যেতে পারেন। রেলযাত্রার বিশেষ আকর্ষণ হল দ্বিতীয় সকালে জানলা দিয়ে পশ্চিমঘাট পর্বতে বিখ্যাত দুধসাগর জলপ্রপাত দেখা। যাঁরা ট্রেনে যাবেন না তাঁদের জন্য কোলেম থেকে গাড়িতে ভগবান মহাবীর ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারির ভেতর দিয়ে দূর থেকে দুধসাগর দেখে আসার ব্যবস্থা আছে।

কোথায় থাকবেন: ভ্রমণকারীদের স্বর্গ গোয়াতে প্রতিটি শহর ও সমুদ্র সৈকতে সব রকম বাজেটের অসংখ্য হোটেল, রিসর্ট ও হোম স্টে আছে। গোয়া ট্যুরিজমের অতিথিনিবাস নর্থ গোয়াতে পাবেন কালাঙ্গুট, পানাজি, পাট্টো, মিরামার বিচ, ওল্ড গোয়া ও মায়েম লেকে। বছরের নানা সময়ে নানা রকম ভাড়া। পুজোর মরসুম মিড সিজন বলে ধরা হয়। ২০০০-৪০০০ টাকায় মাঝারি মানের ঘর পাওয়া যায়। এদের নানা রকম স্টে প্যাকেজ আছে। বিশদ তথ্য ও অনলাইন বুকিং: www.goa-tourism.com

জি টি ডি সি-র এই ওয়েবসাইট থেকে ট্যুর প্যাকেজ ও ক্রুজ বুকিং করা যায়। প্রয়োজনে কথা বলেও নিতে পারেন। যোগাযোগের ফোন: ৮৩২২৪৩৭১৩২

ছবি: লেখক

Goa North Goa Travel Attractions Tourists Spots Beach Holidays Adventure Sport Tourist Places Arambol Vagator Anjuna Baga Calangute গোয়া
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy