Advertisement
E-Paper

টুসুর টানে পুরুলিয়া

গ্রামের ভিতর থেকে একঘেঁয়ে বিষন্ন সুর ভেসে আসে পৌষের বাতাসে। গ্রাম ছাড়িয়ে পাথুরে আল পথ ধরে সেই দিকেই গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যায় শরবেড়িয়া গ্রামের মহিলারা। কোমড় দুলিয়ে টুসুগীত গায় কিশোরী। মাথায় রংবেরঙের কাগজ দিয়ে তৈরি ‘চৌডল’। ভাসিয়ে দেওয়া হবে হাড়াই নদীর বুকে।

সঞ্চিতা হালদার

শেষ আপডেট: ০৪ মার্চ ২০১৭ ০১:০৩

তিরিশ দিন রাখলি টুসু
তিরিশটি ফুল দিঁয়ে গ
আর রাখতে লারব টুসু
মকর হইল বাদি গ।

গ্রামের ভিতর থেকে একঘেঁয়ে বিষন্ন সুর ভেসে আসে পৌষের বাতাসে। গ্রাম ছাড়িয়ে পাথুরে আল পথ ধরে সেই দিকেই গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যায় শরবেড়িয়া গ্রামের মহিলারা। কোমড় দুলিয়ে টুসুগীত গায় কিশোরী। মাথায় রংবেরঙের কাগজ দিয়ে তৈরি ‘চৌডল’। ভাসিয়ে দেওয়া হবে হাড়াই নদীর বুকে।

রুক্ষ পাথুরে জমি কেটে গ্রামের বুক চিড়ে তিরতির করে বয়ে চলেছে হাড়াই। মাথার উপরে তাপ নেই। বরং মধ্যাহ্নেও শীতল হাওয়ায় কাঁপছে তাল গাছের পাতাও। জানুয়ারির শুষ্ক খটখটে প্রকৃতির মাঝেও কোনও রকমে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে হাড়াই। গ্রামের উঠোনে, ঘরের দেওয়ালে আঁকা হয় আদিবাসীদের নিজস্ব আঙ্গিকে আলপনা। মাটির উনানে তৈরি হয় পিঠে। টুসু পরবকে ঘিরে শুধু শরবেড়িয়া নয় উৎসবে মেতে ওঠে গোটা পুরুলিয়া।

ঘরে ঘরে নতুন ধান। মানুষের শরীরে নতুন পোশাক। আর মহুয়ার নেশায় ঢুলুঢুলু চোখে মাদলের শব্দে যেন নেচে ওঠে রুক্ষ-সুন্দরী। সারা বছরের অভাব, অনাহার ভুলে উৎসবে মেতে ওঠেন নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ। তাই সেই উৎসবের টানে টুসু পরবের দিনে পাড়ি দেওয়া পুরুলিয়ার গ্রামে। বুক ভরে সুবাস নিই আমন ধানের মোটা চালের ভাতের গন্ধ।

সূর্য মাঝ আকাশে ওঠার আগেই দূর থেকে ভেসে আসে মাদলের দ্রিমি দ্রিমি শব্দ। সেই শব্দে কেঁপে ওঠে পা। দুলে ওঠে কোমড়। আবারও গান ধরে গ্রামের মহিলারা-“টুসু ঘনকে জল দিও না/ আমার মনে বড় বেদনা।” মাথায় রংবেরংয়ের ‘চৌডল’। সারা গায়ে সূর্যের আদলে গোলগোল কাগজের ফুল। সূর্যের প্রতীক। উচুঁ নিচু পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নতুন শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে মহিলারা চলেন দেউলঘাটার কংসাবতী নদীর তীরে। পিছন পিছন চলি আমরাও।

মোবাইল ক্যামেরায় বন্দী হয় মুহুর্তরা। মাদলের শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হয়। দেউলঘাটার মেলায় তখন অজস্র মানুষের ভিড়। মনে হয় যেন রুক্ষ পাথরের গায়ে ফুটে আছে ভাবরি-বুয়ানি। তারই মাঝখান দিয়ে বয়ে চলে কংসাবতী। কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমড় জল। সেই জল ভেঙে ‘চৌডল’ মাথায় এগিয়ে যায় মেয়েরা। পিছনে কিশোরীদের ভিড়। সরু জলস্রোতের দুই তীরে জড়ো হয় জোয়ান মরদরা। তারা কিশোরীদের দিকে ‘কুলকুলি’ দেয়। আঁজলা করে জল তুলে তাদের দিকে ছুড়ে দেয় কিশোরীরাও। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে একে অন্যের গায়ে।

সূর্যের আলো ক্রমশ ম্লান হয়। পড়ন্ত সূর্যের আলোকে পিছনে ফেলে সকলে কংসাবতীকে ছেড়ে ভিড় করে মেলায়। মেয়ে-মরদেরা হাত ধরাধরি করে থেমে যায় জুয়ার ঠেকে। প্রেয়সীর মুখের দিকে তাকিয়ে মোটা টাকা বাজি ধরে সুঠাম যুবক। জিতে গেলে আবার। হেরে গেলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে দু’জনে। ঘুগনি, শুয়োরের মাংস, মহুয়া, চটপটি, জিলাপির গন্ধ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

অন্ধকার নামে। মেলার দোকানে কেরোসিনের লম্ফের আলোয় বিক্রি হয় রঙিন চুরি। নানা ভাবে পরীক্ষা করে মরদ কিনে নেয় তীর ধনুক। পরের দিনেই বাউড়ি যে। শিকারে বের হতে হবে যে। এরই মাঝে মাদলের বোল তুলে পাহাড়ি রাস্তায় নাচতে নাচতে এগিয়ে যায় গাঁয়ের পুরুষ। মহুয়ার নেশায় টলে যায় পা। চোখ লাল হয় জবা ফুলের মতো। তবুও সেই চেনা সুরে তারা গান ধরে-“লে লে মালা বদল কর/ হামরা আসিছি ছোরার দল।” তাঁদের পিছনে আমরাও হাঁটতে থাকি। শাল-পিয়ালের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে রাস্তা চলে যায় শিরকাবাদ গ্রামে। পাহাড়ের ও-পারে। পাহাড়ি জঙ্গলে ঝুপ করে নামে অন্ধকার। সেই সঙ্গে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা। এ বার ফিরতে হয় গাড়িতে। অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায় রাত্রিবাস। পাহাড় থেকে ভেসে আসা টুসু আর মাদলের শব্দে চোখ জুড়ে নেমে এল ক্লান্তির ঘুম।

Holiday Purulia Tusu Festival
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy