নতুন দেশ, নতুন গন্তব্য সাজিয়ে রেখেছেন? সেই ইচ্ছার ঝুলি থেকে যখন একটা একটা করে স্বপ্ন পূরণ হয়, সাজিয়ে রাখা তালিকায় প্রাপ্তির ঘরে ‘টিক’ পড়ে, সে এক অপরিসীম আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের ভাগীদার কি সকলেই হন বা হতে চান?
বিশ্ব জুড়ে বদলে যাওয়া জীবনযাপনের ধরন বলছে অন্য কথা। গত কয়েক বছরে পেশাগত ক্ষেত্রে কর্মসংস্কৃতিতে বদল এসেছে। তার প্রভাব পড়ছে জীবন এবং মননে। পরিসংখ্যান বলছে, তারই ফল হিসেবে তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে সফর নিয়ে চিন্তাভাবনায় কিছু বদল আসছে। না ভেবে সফর তারই উপজাত।
বিষয়টিকে একেবারে নতুন বলা চলে না। বাংলায় একটি প্রবাদবাক্যই আছে, ‘উঠল বাই তো কটক যাই’ অর্থাৎ কোনও কিছু না ভেবে আচমকা বেরিয়ে পড়া। তবে 'না ভেবে ভ্রমণ'কে একেবারে সেই তালিকায় ফেলা চলে না। বরং সফরের পিছনে বাড়তি ভাবনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নারাজ জীবনে ‘ক্লান্ত পথের’ পথযাত্রীরা। ছুটি মানে ছুটি, বেরিয়ে পড়াতেই আনন্দ। তবে নতুন জায়গা আবিষ্কারের উত্তেজনা নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে বহু মানুষ বেছে নিতে চাইছেন আগে যাওয়া চেনা গন্তব্য। এমন অনেক জায়গা থাকে, যেখানে এক বার গেলে ভাল লেগে যায়। সেই জায়গা, পরিপার্শ্ব মনে দাগ কেটে যায়। এমনকি বিশেষ কোনও হোটেল বা হোম-স্টের মানুষগুলির সঙ্গেও কখনও কখনও ভাললাগার পরিসর তৈরি হয়। সেই চেনা এবং আরামদায়ক পরিবেশে ফেরারই তাগিদ তৈরি হয়েছে সম্প্রতি। নতুন জায়গা মানেই, সেখানে যাওয়া, থাকা নিয়ে ভাবনা। কোন উড়ান ধরতে হবে, কী ভাবে যেতে হবে, কোথায় থাকতে হবে— সেই সব নিয়ে মাথা ঘামানোর বদলে পরিচিত জায়গায় যাওয়ার একটি অন্য রকম স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে। এক সময় বাঙালির ভ্রমণের জায়গা ছিল সীমিত। পুরী, কাশী বা দেওঘরের মতো জায়গাতেই বার বার যেতেন বাঙালি মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত। সেই সব জায়গায় অনেকে বাড়িও কিনে রাখতেন। সেই সব ভ্রমণও ছিল নিরুদ্বিগ্ন বা প্রায় পরিকল্পনাহীন। সেই আবেশটুকুই কি উপভোগ করতে চাইছে তরুণ প্রজন্ম? কিন্তু কেন?
আরও পড়ুন:
ক্লান্তি এবং উৎসাহের অভাব
নতুন কোনও জায়গা বাছলে যেমন নতুন কিছু প্রাপ্তির, নতুন অভিজ্ঞতার উত্তেজনা থাকে, তেমনই থাকে খাটনিও। বিশেষত কেউ যদি চেনা ছকের বাইরে সফরসূচি সাজাতে চান এবং কোনও ভ্রমণ সংস্থার সাহায্য ছাড়া নিজেরাই যেতে চান, তার জন্য পড়াশোনা করতে হয়। সেই জায়গার কোথায়, কেমন ঘোরার পরিসর রয়েছে, হোটেল, গাড়ি ভাড়া, কী ভাবে সফর সাজানো হবে— সে এক বড় পরিকল্পনা। তার জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা, খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন। বর্তমানে পেশাগত কাজের ধরন বদলাতে থাকায় অনেকেই ভীষণ ব্যস্ত। দিনের শেষে ক্লান্তও। বেড়ানোর জন্য এই খাটনি সকলে তাই পছন্দও করছেন না অনেকেই।
আতিথেয়তার সমীকরণ বদল
কোনও ভাল রিসর্ট বা পাহাড়ি হোম স্টের পরিবেশ যেমন মন জয় করে নেয়, তেমনই উষ্ণ আতিথ্যও মন ছুঁয়ে যায়। আন্তরিক ভাবে অতিথির দেখভাল, তাঁর খেয়াল রাখাও মানসিক সংযোগ তৈরি করে। ফিরে আসার পরেও কিছু মানুষের মুখ, ব্যবহার মনে রয়ে যায়। কোনও একটি নির্দিষ্ট হোটেল বা রিসর্টের বিশেষ একটি ঘর, আশপাশে ঘুরে বেড়ানোর সুখস্মৃতি, নির্দিষ্ট খাবারের স্বাদ— তার টানও অনেক সময় একই জায়গায় বার বার যেতে উদ্বুদ্ধ করে বলছে সমীক্ষা।
খরচও জানা
কোনও নতুন জায়গায় ঘোরাঘুরির জন্য বাজেট তৈরি করতে হয়। গাড়ি, থাকার খরচ সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া গেলেও নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিন্তু চেনা জায়গায় ঘোরার মতো সেই ঝক্কি থাকে না। কোথায় গেলে কী খরচ হতে পারে, গাড়ি ভাড়া কত, সবটাই নখদর্পণে থাকে। ফলে, খরচ-খরচার হিসাব নিয়েও বাড়তি ভাবনার দরকার হয় না।
স্মৃতিচারণা
সন্তানকে নিয়ে ছোটবেলায় বিশেষ কোনও সৈকত শহরে বা পাহাড়ে যাওয়ার স্মৃতি ঝালিয়ে নিতেও এমনটা করতে চাইছেন অনেকে। ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে সন্তানেরা কখন বড় হয়ে যায়, বাবা-মায়ের টের পান না। কোনও একটি নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়ার মধ্যে স্মৃতিচারণাও থাকে। হতে পারে সেই জায়গায় সন্তান যখন ছোট ছিল তখন যাওয়া হয়েছিল। এখন সে বড়। তবু সেই স্মৃতি, ভোগৌলিক অবস্থান আবেগকে ছুঁয়ে যেতে পারে।
চেনা জায়গার নিরাপত্তা
শুধু তরুণ প্রজন্ম নয়, অনেক বয়স্ক মানুষও পুরনো জায়গায় যেতে চান। কারণ, চেনা পরিবেশে তাঁরা নিরাপদ বোধ করেন। বিশেষত বয়স বাড়লে আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়। একাধিক বার যাওয়া জায়গায় আবার গেলে, সেই ভয়টা থাকে না।