এসআইআর প্রক্রিয়ার আবহে বছরের শেষ দিনটা চিহ্নিত হয়ে রইল তৃণমূল প্রতিনিধিদল ও নির্বাচন কমিশনের আড়াই ঘণ্টার উত্তপ্ত বৈঠকে। তৃণমূলের দশ প্রতিনিধির দলটির নেতৃত্বে ছিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টো দিকে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন আরও দুই কমিশনার। সূত্রের খবর, বৈঠকে জ্ঞানেশ কুমারকে অভিষেক প্রশ্ন করেন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর খসড়া তালিকায় যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে, তাদের মধ্যে কত জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা, তা জানানো হচ্ছে না কেন?
দুপুরের এই বৈঠকের পরে নির্বাচন কমিশন একের পর এক বিবৃতি দিয়ে পাল্টা চাপ তৈরি করে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের উপর। কমিশনের বক্তব্য, তৃণমূলের কোনও নিচুতলার রাজনৈতিক প্রতিনিধি যেন নির্বাচনে কর্তব্যরত কর্মীকে হুমকি না দেন, তা দলীয় নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে। এ কথা তৃণমূলের নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বুধবার দিল্লির নির্বাচন সদনে বেলা সাড়ে ১২টা থেকে প্রায় ৩টে পর্যন্ত তৃণমূল ও কমিশনের এই বৈঠক শেষে বেরিয়ে অভিষেকের দাবি, বৈঠকের মধ্যে নাকি আঙুল উঁচিয়ে কথা বলেছেন জ্ঞানেশ কুমার। তাতে বাধা দিয়ে অভিষেকও বলেছেন, ‘আঙুল নামিয়ে কথা বলুন। মনে রাখুন, আপনি মনোনীত। আমি নির্বাচিত।’
বৈঠক শেষে আজ আরও এক বার বিজেপির সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের যোগসাজশের অভিযোগ করেন অভিষেক। তাঁর দাবি, “কেন্দ্রীয় সমবায়মন্ত্রী কে? অমিত শাহ। তাঁর সচিব কে ছিলেন? জ্ঞানেশ কুমার। আপনারা মনে করেন এটা কাকতালীয়? ওঁকে এই প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, দেশ ধ্বংস করার মিশনে এখানে পাঠানো হয়েছে। আমরা মানুষের ক্ষমতার সামনে মাথা নিচু করি। ক্ষমতাশীল মানুষের সামনে নয়।’’ অভিষেকের অভিযোগ, রাজ্যের ১ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষকে এসআইআর গণনাপত্রে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তথ্যের ধোঁয়াশার কারণ দেখিয়ে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। তাঁদের তালিকা কেন প্রকাশ করছে না কমিশন? নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও শুনানিতে ডেকে হয়রানি করা হচ্ছে। কমিশন কোনও স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কথা বলছে। অসুস্থ ও প্রবীণদের দুই থেকে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হচ্ছে। তাঁদের কেন অনলাইন শুনানি করা হচ্ছে না,এই অভিযোগও তোলা হয়। গত সোমবার এ ব্যাপারে কমিশননোটিস দিয়ে জানিয়েছে, যাঁরা ৮৫ বছর বা তার ঊর্ধ্বে, তাঁদের বাড়িগিয়ে শুনানি হবে। তৃণমূলের এ ক্ষেত্রে দাবি, ষাট বছরের বেশিবয়স্কদের ক্ষেত্রেই এই ব্যবস্থানেওয়া হোক।
অভিষেক বলেন, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি বার বার বলছে, পশ্চিমবঙ্গে নাকি এক কোটিরোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি রয়েছে। বাংলার নানা ভাবে বদনামওকরা হচ্ছে। অথচ খসড়া তালিকায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদপড়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চেয়েছি, তাদের মধ্যে কত জন রোহিঙ্গা ও কত জন বাংলাদেশি, কিন্তু কোনওস্পষ্ট উত্তর মেলেনি।” ভিন্ রাজ্যে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের শুনানিতে ডেকে হয়রানির অভিযোগও করেন অভিষেক। বলেন, “বিএলএ-২ কেন শুনানিতে থাকতে পারবে না, তা নিয়ে কমিশন কোনও সার্কুলার দিতে চায়নি। ওয়টস্যাপ নির্দেশিকায় কি নির্বাচন কমিশন চলছে? লিখিত নোটিস না থাকলে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানো হবে।”
তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে আজ নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তৃণমূলের কোনও নিচুতলারপ্রতিনিধি যেন নির্বাচনে কর্তব্যরত কর্মীকে হুমকি না দেয়, তা দলীয় নেতৃত্বকে নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনের নির্দেশ, এই ধরনের কোনও দুষ্কৃতী নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে, কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিএলও, ইআরও, এইআরও, পর্যবেক্ষকদের মতো কোনও নির্বাচনী আধিকারিককে রাজনৈতিক দলের নেতারা হুমকি দিলে বা ভয় দেখালে, তা বরদাস্ত করা হবে না। তৃণমূলের প্রতিনিধিদলকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বহুতল আবাসন, গেট দেওয়া আবাসিক এলাকা, বস্তিতে ভোটারদের সুবিধার্থে ভোটগ্রহণ কেন্দ্র হবে। এই নিয়েমমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের প্রবল আপত্তি রয়েছে।
এর আগে নভেম্বরের শেষে তৃণমূলের দশ জনের প্রতিনিধিদল দেখা করেছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে। সে দিন নির্বাচন কমিশনের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বেরদাবি ছিল, বিএলও-দেরমৃত্যুর পিছনে রয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর জন্যই ওই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে। পরে সন্ধ্যায় পাল্টা জবাবে কমিশন সূত্রে বলা হয়েছিল, তৃণমূল যেন বিএলও-দের মানসিক চাপ না দেয়। আজ কমিশন বলেছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে এখনই নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত বিএলও-দের বর্ধিত ভাতা মঞ্জুরকরতে হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)