ভক্তদের মাথায় হাত। বিমর্ষ বহু ছোট ব্যবসায়ী। হতাশ উৎসবপ্রেমী আমজনতা। হাইকোর্টের নির্দেশে আপাতত স্থগিত মতুয়া মেলা।
গাইঘাটার ঠাকুরনগরে মতুয়া ঠাকুরবাড়ি সংলগ্ন মাঠে মহামেলা উপলক্ষে ইতিমধ্যেই অস্থায়ী দোকানপাট তৈরি কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেক দোকান ইতিমধ্যেই তৈরিও হয়ে গিয়েছে। কী ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে এ দিন থেকেই তৎপরতা শুরু হয়ে গিয়েছে জেলা পুলিশ-প্রশাসনিক মহলে। এ দিন দুপুরে গাইঘাটা থানার পুলিশ মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দিয়েছে, শুক্রবারের মধ্যে দোকানপাট গুটিয়ে ফেলতে হবে। বনগাঁর মহকুমাশাসক কাকলি মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হচ্ছে।’’
আদালতের এই নির্দেশকে অবশ্য স্বাগত জানিয়েছেন সারা ভারত মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি তথা বনগাঁর প্রাক্তন সাংসদ মমতা ঠাকুর। তিনি বলেন, ‘‘হাইকোর্টের নির্দেশকে আমরা সম্মান করি। এ বার আমরা মেলার আয়োজন করছি না। শুধু ঠাকুরের পুজোটাই হবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘করোনাভাইরাস যে ভাবে গোটা দেশে ছড়িয়েছে। এরপরেও মেলার আয়োজন করা আমরা উচিত বলে মনে করছি না। কারণ মানুষের জীবন বাঁচানোইটাই আমাদের কাছে বড় ধর্ম। এ দিন আদালতেও আমরা জানিয়ে দিয়েছি, এ বার আমরা মেলার আয়োজন করতে চাই না।’’
দিন কয়েক আগে মমতা সাংবাদিক সম্মেলন করেও সে কথা ঘোষণা করেছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটা অংশও স্বাস্থ্য-সুরক্ষার স্বার্থে এমনটাই চাইছিলেন। মমতা-সহ প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে তাঁরা স্মারকলিপিও দেন। তার জেরে আবার অভিযোগ ওঠে, কাউকে কাউকে মারধর করে গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ঠাকুরনগরের বাসিন্দা আইনজীবী লিটন মৈত্র বলেন, ‘‘এ দিন আমরা আদালতের কাছে করোনাভাইরাসের প্রসঙ্গ তুলে মেলা বন্ধের আবেদন করি। হাইকোর্টের নির্দেশে মানুষ বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেলেন। কারণ, মহামেলা উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঠাকুরবাড়ির কামনা সাগরে পুণ্যস্নান করতে আসেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ছিল।’’
প্রতি বছর মতুয়া ধর্মগুরু হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথি মধুকৃষ্ণ ত্রয়োদশীতে গাইঘাটার ঠাকুরনগরে মতুয়া মহামেলার আয়োজন হয়। এ রাজ্য বসবাসকারী মতুয়া ধর্মের মানুষেরা তো আসেনই, দেশ-বিদেশ থেকেও বহু ভক্ত আসেন। ঠাকুরবাড়ির কামনাসাগরে (বড় পুকুর) পুণ্যস্নান সারেন। হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পুজো দেন।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, এ বছর মেলা শুরুর কথা ছিল ২১ মার্চ। পুণ্যস্নান হওয়ার কথা, ২২ মার্চ।
হাইকোর্টের নির্দেশ প্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের মন্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সঙ্ঘাধিপতি তথা বনগাঁর বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর এ দিন বাড়িতে ছিলেন না। ফোনেও সাড়া মেলেনি। দিন কয়েক আগে তিনি বলেছিলেন, ‘‘মতুয়া ভক্তেরা রোগ মুক্তির জন্য পুণ্যস্নান করতে আসেন। মেলা বন্ধ করার আমরা কেউ নই।’’
এ দিন শান্তনুর দাদা তথা মহাসঙ্ঘের যুগ্ম সঙ্ঘাধিপতি সুব্রত ঠাকুর বলেন, ‘‘হাইকোর্টের নির্দেশের কপি এখনও আমরা হাতে পাইনি। জমায়েত নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারের সর্বশেষ নির্দেশ কী আছে, সেটা দেখে মহাসঙ্ঘের কমিটিতে আলোচনা করে মেলা নিয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানাতে পারব।’’
পরিস্থিতি যে দিকে গড়াল, তাতে দোকানিরা ভেঙে পড়েছেন। মাখন সাহা নামে একজনের কথায়, ‘‘মেলায় বিক্রির জন্য প্রায় দেড় লক্ষ টাকার বাতাসা, নকুলদানা, কদমা কিনেছি। মেলা না হলে প্রচুর টাকার ক্ষতি হবে।’’
মতুয়া ভক্তরা মেলার আয়োজন না করা নিয়ে আদালতের নির্দেশ শুনে দ্বিধাবিভক্ত। তাঁদের একাংশের কথায়, ‘‘ঠাকুরনগরে ১৯৪৮ সাল থেকে মেলা হচ্ছে। এই প্রথম মেলা হবে না শুনছি। খুবই খারাপ লাগছে। তবে করোনাভাইরাসের বিষয়টিও অস্বীকার করা যায় না। কী ভাবে ভক্তদের আসা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। মমতা ঠাকুর বলেন, ‘‘সোশ্যাল মিডিয়া এবং ফোনে ভক্তদের খবর দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা যেন বাড়িতেই এ বার ঠাকুরের পুজো করেন।’’
আপাতত এটুকুই সান্ত্বনা ভক্তদের। তবে উৎসবের আনন্দ হাতছাড়া তো হলই!