হিঙ্গলগঞ্জের রায়মঙ্গল নদী থেকে নার্স শুভ্রা সাহা ও তাঁর তিন বছরের কন্যা প্রিয়স্মিতার দেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে রবিবার বনগাঁ শহরে রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার সঙ্গে দেখা করলেন মৃত শুভ্রার বাবা-মা। সঙ্গে ছিলেন বনগাঁ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের একাধিক নার্স, যাঁরা শুভ্রার সহকর্মী ছিলেন।
২৩ জুন উদ্ধার হয় শুভ্রা সাহা (৩০) এবং তাঁর কন্যার দেহ। এই মৃত্যুকে ঘিরে প্রথম থেকেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার সম্ভাবনার কথা উঠে এলেও, পরিবারের দাবি, এটি আত্মহত্যা নয়। পরিকল্পিত ভাবে খুন করা হয়েছে দু’জনকে।
মৃতের বাবা ভবতোষ সাহা নদিয়ার হরিণঘাটার বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মী। তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘আমার মেয়ে কোনও ভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না। ওকে এবং আমার নাতনিকে পরিকল্পিত ভাবে খুন করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর পিছনে রয়েছে আমার মেয়ের স্বামী, শ্বশুরবাড়ির লোকজন এবং তাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দুষ্কৃতী। আমরা চাই, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দেওয়া হোক।’’ মন্ত্রীর কাছে তিনি আরও অভিযোগ করেন, মেয়ের মৃত্যুর পরে হিঙ্গলগঞ্জ থানার পুলিশ তাঁদের দিয়ে জোর করে একটি বয়ান লিখিয়ে নেয়। সেই বয়ানে উল্লেখ করা হয়, শুভ্রা মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন এবং আত্মহত্যা করেছেন। ভবতোষের দাবি, ‘‘ওই বয়ান সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন কথা লিখিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা সত্যি নয়। আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।’’ শুভ্রার মা শুক্লা সাহা বলেন, ‘‘আমরা মেয়ে, নাতনিকে হারিয়েছি। এখন শুধু চাই, সত্যিটা সামনে আসুক। যারা এই অপরাধ করেছে, তাদের যেন কোনও ভাবেই রেহাই না দেওয়া হয়।’’
শুভ্রা দীর্ঘদিন বনগাঁ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি দায়িত্বশীল, প্রাণবন্ত এবং কর্মনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। চলতি মাসের ১ জুন তাঁর বদলি হয়ে যায় নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে।বনগাঁ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের নার্স পল্লবী সাহা বলেন, ‘‘আমরা দীর্ঘদিন এক সঙ্গে কাজ করেছি। শুভ্রা কখনও মানসিক অবসাদে ভুগছিল বলে মনে হয়নি। বরং সব সময়ে দায়িত্বশীল ভাবে কাজ করত। আমরা জানতাম, শ্বশুরবাড়িতে বিশেষ করে ননদদের কাছ থেকে ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হত। আমাদের দৃঢ় ধারণা, শুভ্রা ও তার মেয়েকে খুন করা হয়েছে।’’
পরিবারের অভিযোগ, শুভ্রার স্বামী সপ্তর্ষি গায়েনের এক আত্মীয় এলাকার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা হওয়ায় তদন্তে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই তাঁরা সরাসরি খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার দ্বারস্থ হয়েছেন। খাদ্যমন্ত্রী বসিরহাট জেলা পুলিশ সুপার অলকনন্দা ভাওয়ালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পরে বলেন, ‘‘ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। পরিবারের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমি পুলিশ সুপারকে বলেছি, কোনও রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’’
বসিরহাট জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। শুভ্রার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)