E-Paper

ভাতা বন্ধ, ধান কুড়িয়ে পেট ভরাচ্ছেন পস্তুবালারা

বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই শিল্পীদের এখন আর কাজ করার ক্ষমতা নেই। ফলে শিল্পী ভাতাই তাঁদের সংসার চালানোর প্রধান ভরসা।

নিশীথভূষণ মাহাতো

শেষ আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ ০১:৩২
চালকলের ফেলে দেওয়া ধান সংগ্রহ করে পরিষ্কার করছেন পস্তুবালা দেবী।

চালকলের ফেলে দেওয়া ধান সংগ্রহ করে পরিষ্কার করছেন পস্তুবালা দেবী। ছবি: সুজিত মাহাতো।

এক সময়ে কারও ঝুমুরের সুর ঝড় তুলত আসরে। কারও বা নাচের শৈলিতে মুগ্ধ হতেন হাজার হাজার দর্শক। পুরুলিয়ার লোক-সংস্কৃতির গর্ব তেমনই তিন শিল্পী এখন পেট ভরাচ্ছেন চালকলের ফেলে দেওয়া পোড়া তুষের গাদা থেকে কুড়িয়ে আনা ধান খুঁটে খেয়ে।

তাঁরা জানাচ্ছেন, রাজ্য সরকারের লোকপ্রসার প্রকল্পের শিল্পী ভাতা গত তিন মাস ধরে বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন লালন পুরস্কারপ্রাপ্ত নাচনি শিল্পী পস্তুবালা দেবী, প্রবীণ ঝুমুর শিল্পী যশোদা মাহাতো এবং লক্ষ্মণ মাহাতো। পুরুলিয়া শহর লাগোয়া সুরুলিয়া মিনি চিড়িয়াখানার পাশে নাচনি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চরম দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটছে তিন জনের।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই শিল্পীদের এখন আর কাজ করার ক্ষমতা নেই। ফলে শিল্পী ভাতাই তাঁদের সংসার চালানোর প্রধান ভরসা। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকে তাঁরা শিল্পী ভাতা না পাওয়ায় জীবনযুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, পুনর্বাসন কেন্দ্রের পাশের একটি ধানকল থেকে ফেলে দেওয়া পোড়া তুষের স্তূপে পড়ে থাকা কিছু ধান কুড়িয়ে এনে পলাশ গাছের নীচে বসে সেগুলো বাছাই করছিলেন ৭১ বছরের যশোদা মাহাতো। পাশে বসেছিলেন ৮৬ বছরের ঝুমুর শিল্পী লক্ষ্মণ মাহাতো। আর দরজার সামনে একই কাজ করছিলেন পস্তুবালা দেবী। ব্যাঙ্কে শিল্পী ভাতার টাকা জমা পড়েছে কি না, মাঝে মধ্যেই খোঁজ নিতে যাচ্ছেন। আর হতাশ হয়ে ফিরছেন।

আক্ষেপের সুরে লক্ষ্মণ মাহাতো বলেন, ‘‘খুব কষ্টে আছি। তিন মাস ধরে ভাতা পাইনি। জানি না, আর পাব কি না।’’ যশোদা মাহাতো জানান, ধানকল থেকে ফেলে দেওয়া তুষের মধ্যে পড়ে থাকা ধান কুড়িয়ে এনে চাল বের করে ভাত ফুটিয়ে খাচ্ছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের বয়স ৭০ বছরের বেশি। এখন আর খাটতে পারি না। সরকারি ভাতা আমাদের কাছে খুব প্রয়োজন। তা কি আর পাব না?’’

নাচনি শিল্পী পস্তুবালা দেবীর অভিযোগ, ‘‘তিন মাসের ভাতা পাইনি। সরকারি অনুষ্ঠানে নেচেছি, সেই পারিশ্রমিকও হাতে আসেনি। তাই চালকলের ফেলে দেওয়া ভাঙা ধানই আমাদের ভবিতব্য।’’ তিনি জানান, রক্তে শর্করা থাকায় ভাতের বদলে রুটি খেতেন। কিন্তু আটা কেনার টাকাও হাতে নেই। তাই বার বার ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা জমা পড়েছে কি না খোঁজ নিচ্ছেন আর হতাশ হয়ে ফিরছেন। তাঁর আক্ষেপ, তাঁদের এই দুর্দশার খবর কেউ রাখেন না। তিন শিল্পীই জানান, তাঁদের রেশনকার্ড বাড়িতে রয়েছে। বাড়ি দূরে থাকায় সেখান থেকেও রেশনের সামগ্রী নিয়মিত আনা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, কোনও প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়নি। বিলম্ব হলেও শিল্পী ভাতার টাকা উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে। যাঁরা সরকারি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের পারিশ্রমিকও শীঘ্রই পাওয়া যাবে।

পুরুলিয়ার আর এক লালন পুরস্কারপ্রাপ্ত ঝুমুর শিল্পী প্রয়াত শলাবত মাহাতোরও এক সময়ে করুণ অবস্থা হয়েছিল। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বিশেষ ভাতা পেতেন। জীবনের শেষ দিকে কোনও অজ্ঞাত কারণে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। তিনিও সমস্যায় পড়েন। পরে অবশ্য সেই ভাতা চালু হয়।

সারাজীবন নিজেদের শিল্পের মাধ্যমে বাংলার লোক সংস্কৃতিকে যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা কেন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে— প্রশ্ন সংস্কৃতিপ্রেমীদের।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

purulia

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy