E-Paper

যুদ্ধের আঁচ সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের জীবনেও

কিন্তু বর্তমানে বাণিজ্যিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ট্রলার মালিকদের অনেকেই পর্যাপ্ত সিলিন্ডার জোগাড় করতে পারছেন না।

সমরেশ মণ্ডল , সৈকত ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:৪৫
বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে মাছ ধরার ট্রলার।

বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে মাছ ধরার ট্রলার। ফাইল চিত্র।

মধ্য এশিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এ বার এসে পড়েছে সুন্দরবন উপকূলের মৎস্যজীবীদের জীবিকায়। বাণিজ্যিক এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাকদ্বীপ, নামখানা, সাগর ও পাথরপ্রতিমা এলাকার বহু মাছ ধরার ট্রলার নির্ধারিত সময়ে গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। উদ্বেগে পড়েছেন মৎস্যজীবী থেকে ট্রলার মালিক।

মৎস্যজীবী সংগঠন সূত্রে জানা গিয়েছে, সুন্দরবন উপকূল থেকে প্রতিদিন কয়েকশো ট্রলার বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। কাকদ্বীপ, নামখানা, গোসাবা ও ফ্রেজারগঞ্জ-সহ অন্যান্য ঘাট মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি ট্রলার এই পেশায় যুক্ত। প্রতিটি ট্রলারে সাধারণত ১৫-১৮ জন করে মৎস্যজীবী কাজ করেন। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে একেকটি ট্রলারকে টানা ১০-১৫ দিন পর্যন্ত সমুদ্রে থাকতে হয়। সে সময়ে মৎস্যজীবীদের রান্নাবান্নার জন্য সঙ্গে নিতে হয় একাধিক বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার।

কিন্তু বর্তমানে বাণিজ্যিক গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ট্রলার মালিকদের অনেকেই পর্যাপ্ত সিলিন্ডার জোগাড় করতে পারছেন না। বেশি দাম দিয়েও তা মিলছে না। বহু ট্রলার ঘাটেই আটকে। নির্ধারিত সময়ে সমুদ্রে যেতে না পারায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্যজীবীরা।

মৎস্যজীবীদের দাবি, একটি ট্রলার সমুদ্রে গেলে শুধু মৎস্যজীবীই নন, বরফ কারখানা, মাছের আড়ত, পরিবহণ শ্রমিক, জাল প্রস্তুতকারক-সহ বহু মানুষের জীবিকা এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। ফলে ট্রলার সমুদ্রে না গেলে তার প্রভাব পড়বে গোটা উপকূলীয় অর্থনীতির উপরে। তাই দ্রুত বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি তুলেছেন ট্রলার মালিক ও মৎস্যজীবীরা।

তাঁদের আশঙ্কা, সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে এক দিকে যেমন মৎস্যজীবীদের জীবিকা সঙ্কটে পড়বে, তেমনই সুন্দরবনের সংবেদনশীল পরিবেশও নতুন করে বিপদের মুখে পড়তে পারে।

সাগর উপকূলের এক মৎস্যজীবী রতন দাস বলেন, ‘‘প্রায় চার দিন আগে সমুদ্র থেকে মাছ ধরে ফিরেছি। মঙ্গলবার আবার গভীর সমুদ্রে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাস সিলিন্ডার না থাকায় যেতে পারছি না। সমুদ্রে গেলে প্রায় ১৫ দিন থাকতে হয়। সেখানে প্রায় ১৭ জনের রান্না করতে হয়।’’

কাকদ্বীপ মৎস্যজীবী ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বিজন মাইতির কথায়, ‘‘এক সময়ে ট্রলারগুলিতে রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করা হত। তখন মৎস্যজীবীরা সুন্দরবনের জঙ্গলে গিয়ে কাঠ সংগ্রহ করতেন। এতে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ক্ষতি হত। পরে ট্রলারগুলিতে গ্যাস ব্যবহার শুরু হওয়ার পরে সেই প্রবণতা অনেকটাই বন্ধ হয়। কিন্তু আবার যদি গ্যাসের সঙ্কট বাড়ে, তা হলে অনেকে বাধ্য হয়ে জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করতে পারেন। এতে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উপরে নতুন করে চাপ পড়বে।’’

মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদার জানালেন, গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্কটের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই রাজ্যে মিডডে মিল, হাসপাতাল, গৃহস্থ-সহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রাখতে একটি এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) গঠন করেছেন। কোথাও গ্যাসের কালোবাজারি বা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হলে সরকার দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

মৎস্যজীবী ভোলানাথ হালদার বলেন, ‘‘গ্যাসের সিলিন্ডারের খোঁজ করেছি। পর্যাপ্ত না পাওয়া গেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। জরুরি ভিত্তিতে আমাদের জন্য সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করা হোক।" প্রশান্ত মণ্ডলের কথায়, ‘‘ট্রলারে গ্যাস ছাড়া রান্না সম্ভব নয়। গ্যাসের জোগান কম থাকায় আমরা বিপদে পড়তে চলেছি। অবিলম্বে সরকারকে হস্তক্ষেপের আবেদন জানাচ্ছি।’’

রায়দিঘি ফিশারম্যান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অলোক হালদার জানান, এ ভাবে চলতে থাকলে ট্রলার নিয়ে গভীর সমুদ্রে যাওয়া কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। মাছের জোগানেও ঘাটতি পড়বে। ডায়মন্ড হারবারের নগেন্দ্রবাজার মৎস্য আড়তদার সমিতির সম্পাদক জগন্নাথ সরকারের কথায়, ‘‘গ্যাসের অভাবে অনেক ট্রলারই আর সমুদ্রে যেতে পারছে না। ফলে সামুদ্রিক মাছের জোগানও কমে গিয়েছে। এত বড় আড়তেও মাছের আকাল দেখা দিয়েছে!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Diamond Harbour fishing trawler

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy