পানীয় জলের সমস্যা উত্তর ২৪ পরগনা জেলা জুড়ে। আর এই পরিস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বেআইনি জলের কারখানা। যথেচ্ছ ভাবে তোলা হচ্ছে মাটির নীচের জল। সে সব কারখানায় তৈরি জল পরিস্রুত নয় বলে বার বার প্রমাণ মিলেছে। মাটি থেকে প্রচুর জল তুলে নেওয়ায়
বাড়ছে আর্সেনিক, ফ্লোরাইড দূষণ। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখল আনন্দবাজার
আর্সেনিক দূষণ উত্তর ২৪ পরগনার অন্যতম সমস্যা। এই পরিস্থিতিতে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে কেনা জলের উপরে নির্ভর করেন। সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জেলা জুড়ে ফুলেফেঁপে উঠছে পানীয় জলের কারবার। অভিযোগ, ওই কারখানাগুলির বেশিরভাগই বেআইনি। কারবার রুখতে মাঝে মধ্যে অভিযান চালায় পুলিশ। কারখানা সিল করে কারবারিকে গ্রেফতারও করা হয়। কিন্তু তারপরেও বন্ধ করা যাচ্ছে না বেআইনি এই কারবার। সম্প্রতি অশোকনগরে বারাসত জেলা পুলিশের এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের কর্তারা এমনই একটি বেআইনি জল কারখানার হদিস পেয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে দত্তপুকুর, আমডাঙা, হাবড়া, অশোকনগর, গাইঘাটা, গোপালনগর, বাগদা, বারাসত এলাকায় অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি বেআইনি পানীয় জল উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ওই কারবারে যুক্ত অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। মাঝে মধ্যেই এই ধরনের অভিযান চালানো হয়।
বেআইনি জলের কারবার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জল-আর্সেনিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা। তাঁদের মতে, জল কারখানায় মাটির গভীর থেকে থেকে পাইপ দিয়ে যথেচ্ছ পরিমাণে জল তোলা হয়। এর ফলে দ্রুত কমছে মাটির নীচের জলের ভান্ডার। মাটির নীচে থাকা জলস্তর বেশি নেমে গেলে শিলার মধ্যে থাকা আর্সেনিক, ফ্লোরাইডের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এর ফলে এগুলি জলে দ্রবণীয় হয়ে পড়ে। পরে জলস্তর বাড়লে জলে মেশে এই পদার্থ। দূষণ বাড়ায়।
আর্সেনিক মিশ্রিত পানীয় জল স্বাস্থ্যের পক্ষে খুবই ক্ষতিকর। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জল দিয়ে জলসেচের মাধ্যমে তা খাদ্যশৃঙ্খলের মধ্যেও ঢুকছে, যা শরীরে পৌঁছে বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ এনভায়র্মেন্টাল স্টাডিজের গবেষক, অধ্যাপক তড়িৎ রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘ভূগর্ভস্থ জল তোলার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভূগর্ভস্থ জলের তুলে ব্যবসা চলছে উত্তর ২৪ পরগনায়। এর ফল মারাত্মক হতে পারে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমাদের গবেষণাগারে অনেকেই জলের মান পরীক্ষা করাতে আসেন। ব্যবসার জন্য এলে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করি।’’
আর্সেনিক দূষণ প্রতিরোধ কমিটির রাজ্য সম্পাদক অশোক দাস জানান, আমাদের দেশে জল নিয়ে সামগ্রিক বিজ্ঞানভিত্তিক কোনও পরিকল্পনা নেই। ফলে যে কেউ ভূগর্ভস্থ জল তুলে নিজের ব্যবসার কাজে বা চাষের জন্য ব্যবহার করতে পারে। কেউ চাইলে অপ্রয়োজনে জল তুলে অপচয়ও করতে পারে। এর ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আর্সেনিক দূষণ-সহ বিভিন্ন সমস্যা বাড়ছে। আমাদের রাজ্যে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এই বিপুল পরিমাণ মিষ্টি জলকে ব্যবহার করার জন্য কোনও বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা না থাকায় তা অপচয় হয়। কখনও কখনও বন্যার সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, ‘‘ব্যক্তিগত লাভের জন্য ভূগর্ভস্থ জল তুলে বিক্রি বন্ধ করতে পদক্ষেপ জরুরি।”
কমিটি সূত্রে জানানো হয়েছে, ১৯৯১ সাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন ২২৪ জন। বর্তমানে ৫০ হাজার মানুষ আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হয়ে ভুগছেন। অশোক বলেন, ‘‘জেলায় এমনিতেই ভূগর্ভস্থ জলের অভাব রয়েছে। বেআইনি জল কারখানার ফলে সঙ্কট বেড়েছে।’’
কমিটি সূত্রে জানা গিয়েছে, গোটা জেলাই আর্সেনিক প্রভাবিত। জেলার ২২টি ব্লকেই পানীয় জলে উচ্চ মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। অভিযোগ, সরকারি পাইপ লাইনের জল বা গভীর নলকূপের জল নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় না। ফলে সেই জলে আর্সেনিকের মাত্রা কত, তা মানুষ জানতে পারেন না। তাই অনেকেই কেনা জলের উপরে নির্ভর করতে বাধ্য হন।
সূত্রের খবর, জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় আর্সেনিক মুক্ত পরিস্রুত পানীয় জলের সমস্যা মেটাতে প্রচুর গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। কিন্তু অনেকেই নলকূপ থেকে জল সংগ্রহ করেন না। তাঁরা নির্ভর করেন কেনা জলের উপরে। এই সুযোগে বাড়ছে বেআইনি জলের ব্যবসা।
এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের অফিসাররা জানান, পানীয় জল উৎপাদন করতে হলে কেন্দ্রের এসডব্লুআইডি ও বিআইএস দফতরের অনুমতি চাই। একজন কেমিস্ট ও একজন মাইক্রো বায়োলজিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক কারখানাগুলিতে। এ সব থাকে না। অশোক বলেন, “টাকা দিয়ে কেনা জলেও উচ্চমাত্রায় আর্সেনিক থাকে। এ সম্পর্কে মানুষকেও সচেতন হতে হবে।” (চলবে)