সাত মাসের সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়িতে এসে লকডাউনে আটকে পড়েছিলেন বছর কুড়ির নাফিসা লস্কর। ওদিকে না ফিরলে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন স্বামী সাদ্দাম হোসেন। এই সমস্যার কথা জানতে পেরে পাশে দাঁড়ালেন সমর দলুই নামে ক্যানিংয়ের এক যুবক। ক্যানিং থানার পুলিশের সহযোগিতায় নিজের দায়িত্বে রবিবার ভোরে ওই গৃহবধূকে সন্তান-সহ তাঁর স্বামীর কাছে পৌঁছে দিলেন সমর।
বছর দু’য়েক আগে ক্যানিংয়ের হাটপুকুরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ডেভিসাবাদের বাসিন্দা নাফিসার সাথে কলকাতার ইকবালপুরের বাসিন্দা সাদ্দামের বিয়ে হয়। তাঁদের একটি সাত মাসের পুত্রসন্তান রয়েছে। সাদ্দাম পেশায় স্থানীয় একটি মাংসের দোকানের কর্মচারী। মার্চের ২০ তারিখ স্ত্রী ও সন্তানকে হাটপুকুরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন সাদ্দাম। কয়েকদিনের মধ্যেই দেশ জুড়ে শুরু হয় লকডাউন। সাদ্দামের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ঘরবন্দি হয়ে দিন কাটাতে শুরু করেন। এরমধ্যে ঘরের কাজ করতে গিয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে চোটও পান। এলাকার হোটেল, দোকানপাট বন্ধ থাকায় দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করতে তাঁকে যথেষ্ট হিমশিম খেতে হয়। নিজের সেই দুর্দশার কথা স্ত্রীকে জানিয়ে বারে বারে ফোন করেন সাদ্দাম। ভিডিও কলে নিজের পরিস্থিতিও স্ত্রীকে দেখান তিনি। স্বামীর অবস্থা বুঝলেও লকডাউনের কারণে স্বামীর কাছে ফিরতে পারেননি নাফিসা। নাফিসাকে বাড়িতে ফেরার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন সাদ্দাম। স্ত্রী বাড়িতে না ফেরায় শেষপর্যন্ত মেজাজ হারান সাদ্দাম। শুরু হয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি। দ্রুত বাড়িতে না ফিরলে নাফিসাকে তালাক দেওয়ার হুমকি দেন সাদ্দাম। এতে আরও সঙ্কটে পড়েন নাফিসা ও তাঁর পরিবার।
এর মধ্যে শনিবার থেকেই শুরু হয়েছে রমজান মাস। ফলে মেয়েকে স্বামীর কাছে দ্রুত পাঠানো উচিত বলেই মনে করেন নাফিসার বাবা আবুল হাসান। মেয়েকে স্বামীর কাছে পাঠানোর জন্য এলাকার বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ করেন। যে কোনও উপায়ে মেয়েকে স্বামীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয়ও করেন অনেককেই। কিন্তু এই লকডাউনে কেউই তাঁর কথায় রাজি হননি। তবে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে সমর দলুই নামে এক যুবকের ফোন নম্বর পান আবুল। লকডাউনে আটকে পড়া মানুষজনের ওষুধের সমস্যা হলে সাহায্যের জন্য তাঁকে ফোন করার কথা জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন সমর। সমরকে ফোন করে এই সমস্যার কথা জানাতেই তাঁদের সাহায্য করতে রাজি হয়ে যান। কিন্তু কীভাবে হাটপুকুরিয়া থেকে কলকাতার ইকবালপুরে নাফিসা ও তাঁর সন্তানকে পৌঁছে দেবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না সমর। সমস্যার কথা ক্যানিং থানার পুলিশকর্মীদের জানান তিনি। অবশেষে পুলিশের সহযোগিতায় নিজের দায়িত্বে রবিবার ভোরে নাফিসা ও তাঁর সন্তানকে সাদ্দামের কাছে পৌঁছে দেন তিনি।
স্ত্রী ও সন্তানকে কাছে পেয়ে খুশি সাদ্দাম। নাফিসা বলেন, “সাদ্দামের অবস্থা দেখে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু বিভিন্ন ভাবে আসার চেষ্টা করলেও, আসতে পারছিলাম না। অবশেষে সমরদাদাই আমায় এখানে নিয়ে এলেন। উনি না থাকলে আমার সংসার হয়তো ভেঙে যেতো।” সাদ্দাম বলেন, “আমি নাফিসাকে খুবই ভালোবাসি। আমার সন্তান আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয়। কিন্তু অনেকদিন ওদের দেখতে পাচ্ছিলাম না। বাড়িতে একা একা ভাল লাগছিল না। পায়ে চোট লাগায় কোনওভাবে ওদের কাছে যেতেও পারছিলাম না। তাই রাগের বশে ওকে তালাক দেওয়ার কথা বলি।”
সমর বলেন, “নাসিফার সমস্যার কথা শুনে খারাপ লেগেছিল। ও আমার বোনের মতোই। এই লকডাউনের জন্য ওর সংসারটা ভেঙে যাবে তা মেনে নিতে পারিনি। তাই ক্যানিং থানার পুলিশের সাথে কথা বলে রবিবার ভোরে গাড়ি ভাড়া করে নাফিসা ও তার সন্তানকে সাদ্দামের কাছে পৌঁছে দিই।” নাফিসার বাবা আবুল হোসেন বলেন, “রমজানের শুরুতেই সমর যেন আল্লার দূত হয়ে দেখা দিল। কত মানুষকে বলেছি মেয়েটাকে একটু স্বামীর কাছে দিয়ে আসতে, কেউ রাজি হয়নি। সমর একবার সমস্যার কথা শুনেই রাজি হয়ে যায়। উপরওয়ালা ওঁর মঙ্গল করুন।”