Advertisement
E-Paper

ঘরের কাছের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তালা, ছুটতে হল ২০ কিলোমিটার দূরে

মঙ্গলবার রাতে অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তনের মালসা ভোগ খেয়েছিলেন শাসনের মিতপুকুরিয়ার চিন্ময় ঘোষ। অসহ্য পেটের যন্ত্রণায় ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। নিজের কষ্টের কথা বলবেন কী, উঠে দেখেন, বউ, ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে দাদা-বৌদি সবাই কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। সঙ্গে বার বার বমি-পায়খানা।

অরুণাক্ষ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০১৬ ০২:০৫
বারাসত জেলা হাসপাতালে উপচে পড়ছে রোগীর ভিড়। মেঝেতেও ঠাঁই হয়েছে অনেকের।

বারাসত জেলা হাসপাতালে উপচে পড়ছে রোগীর ভিড়। মেঝেতেও ঠাঁই হয়েছে অনেকের।

মঙ্গলবার রাতে অষ্টপ্রহর হরিনাম সংকীর্তনের মালসা ভোগ খেয়েছিলেন শাসনের মিতপুকুরিয়ার চিন্ময় ঘোষ। অসহ্য পেটের যন্ত্রণায় ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। নিজের কষ্টের কথা বলবেন কী, উঠে দেখেন, বউ, ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে দাদা-বৌদি সবাই কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। সঙ্গে বার বার বমি-পায়খানা। বুধবার দুপুরে সে কথা যখন বলছেন চিন্ময়, তখন বাড়ির ৮ সদস্য ভর্তি বারাসত জেলা হাসপাতালে। সব মিলিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীনের সংখ্যাটা ততক্ষণে ২৭০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। চিন্ময়বাবুর মতো অপেক্ষাকৃত কম অসুস্থেরা ঠাঁই নিয়েছেন হাসপাতালের বাইরে, গাছের নীচে।

শাসন পঞ্চায়েতের শুধু মিতপুকুরিয়াই নয়, ‘হরির ভোগ’ খেয়ে এমন হাল পাশ্ববর্তী কালিকাপুর, সর্দারহাটি, মল্লিকপাড়ার মতো এলাকার হাজারখানেক মানুষের। বুধবার সকালে তাঁদের বারাসত ছাড়াও মধ্যমগ্রাম, রাজারহাট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার সকালেই স্বাস্থ্যশিবির খোলা হয় মিতপুকুরিয়ায়। জেলা স্বাস্থ্য দফতরের দল বাড়ি বাড়ি ঘুরে চিকিৎসা শুরু করেন।

জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রলয় আচার্য বলেন, ‘‘প্রায় ৭৫০ জন আক্রান্তের মধ্যে ৩০০ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আক্রান্ত এলাকাতেও চলছে চিকিৎসা। কী ভাবে ওই খাবার থেকে বিষক্রিয়া ছড়াল, তা জানতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।’’

Advertisement

তুলনায় ততটা শরীর খারাপ হয়নি যাঁদের, তাঁরা পড়ে রইলেন ওয়ার্ডের বাইরে, গাছতলায়।ছবি: সজলকুমার চট্টোপাধ্যায়।

১৩ বছর ধরে হরিনাম সংকীর্তন চলছে মিতপুকুরিয়ায় বারোয়ারি তলায়। আগে কখনও এমন কাণ্ড ঘটেছে বলে মনে করতে পারছেন না স্থানীয় মানুষ। এ দিন বারাসত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাধনা ঘোষ বলেন, ‘‘মঙ্গলবার রাতে নামগানের পর ভোগের মালসা কেউ নিয়ে যান বাড়িতে, কেউ বা সেখানেই বসে খান। যারাই খেয়েছে, সকলের এই অবস্থা।’’ চিকিৎসাধীন পায়েল ঘোষ বলেন, ‘‘প্রথমে পেট ব্যথা, তারপরে পায়খানা সঙ্গে বমি হতে থাকে। এখনও মাথা তোলা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে শরীরে কোনও বল নেই।’’

বারাসত হাসপাতালের সুপার সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘‘সকাল থেকে দলে দলে মানুষ হাসপাতালে আসতে থাকেন। হঠাৎ এত আক্রান্তদের সামলাতে আমরা সমস্ত কর্মীরা নেমে পড়ি। তবে কারও বড় কোনও ক্ষতি হয়নি, এটাই বাঁচোয়া।’’

কিন্তু কেন শাসনের মানুষকে ছুটে আসতে হল ২০ কিলোমিটার দূরের বারাসত জেলা হাসপাতালে?

এ দিন মিতপুকুরিয়ার গিয়ে দেখা গেল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তালা মারা। কেবল একজন কর্মী বসে রয়েছেন। সৌমেন ঘোষ, কাজল ঘোষের মতো এলাকার মানুষ জানালেন, এখানে ভর্তির ব্যবস্থা নেই। সপ্তাহে তিন দিন চিকিৎসক আসেন কিনা, তা-ও সন্দেহ। শাসন ছাড়িয়ে বারাসতের পথে রয়েছে কদম্বগাছি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখানেও একই অবস্থা। ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আড়াই বছর আগে উদ্বোধন করার পরেও তা তালা বন্ধ হয়েই পড়ে রয়েছে। এ দিন সেখানে গিয়ে দেখা গেল, তালাবন্ধ হাসপাতাল ঘরে মরচে পড়ে নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি।

‘‘ভোট আসছে, সব উদ্বোধন হবে। তারপরে যে কে সেই, আমাদের কথা কে ভাবে বলুন’’— বারাসত হাসপাতালে শুয়ে বলছিলেন ঝর্ণা ঘোষ। পরিবারের সকলকে নিয়ে রয়েছেন হাসপাতালে। এ দিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, উপরে নীচ মিলে গোটা ওয়ার্ডটাই ভরে গিয়েছে শাসনের অসুস্থ মানুষজনের ভিড়ে।

একেবারে উল্টো চিত্র মিতপুকুরিয়ায়। ইটের রাস্তা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল, গোটা এলাকা কার্যত সুনসান। বেশিরভাগ ঘরই তালাবন্ধ। ঘোষপাড়ায় ঢুকতেই শোনা গেল, সারাদিন খেতে না পেয়ে উচ্চস্বরে ডাকছে গোয়ালের গরুগুলি। দু’য়েকটি বাড়িতে কেউ-কেউ আছেন অবশ্য বাড়ি পাহারায়। শৈলেন ঘোষ নামে রাজ্য পুলিশের এএসআই ক্ষীণ গলায় বল্লেন, ‘‘সকলেই হাসপাতালে, আমি একা বাড়ি পাহারা দিচ্ছি। যখন শরীর খারাপ লাগছে, তখন স্বাস্থ্য শিবিরে যাচ্ছি।’’

মিতপুকুরিয়া বারোয়ারিতলায় এ দিন কথা ছিল বাউল গানের আসরের। শুভ দাস নামে এক যূবক উপরের সামিয়ানা দেখিয়ে বলে, ‘‘গত তিন দিন এখানে ছিল থিকথিকে ভিড়, আর আজ!’’

পাশের মন্দিরে তখন একাকী রাধামাধব বিগ্রহ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy