সাপের কামড় নিয়ে কুসংস্কারের জেরে গত কয়েক মাসে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে উত্তর ২৪ পরগনার নানা প্রান্তে। কিছু মানুষ এখনও চিকিৎসকের পরিবর্তে ওঝা-গুনিনের উপরে ভরসা রাখেন। যতক্ষণে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় রোগীকে, ততক্ষণে চিকিৎসকদের বিশেষ কিছু আর করার থাকে না। প্রাণ বাঁচানো যায় না রোগীর। বৃহস্পতিবারই দেগঙ্গার এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে সাপের কামড়ে। তাঁকেও হাসপাতালের বদলে ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দেগঙ্গায় পর পর এ রকম কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
শুক্রবার সকালে আর এক ওঝার কীর্তি দেখে তাজ্জব বাগদার সাগরপুর গ্রামের মানুষ। দোয়ালদহ গ্রামের এক ওঝা হাজির হন নিমাই দাসের বাড়িতে। নিমাইয়ের স্ত্রী আয়না (৪০) বৃহস্পতিবার সকালে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিলেন। সে সময়ে সাপে কামড়ায়। পরিবারের লোকজন তাঁকে বাগদা ব্লক গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত বলে জানিয়ে দেন। দেহ ময়নাতদন্তের জন্য বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শুক্রবার সকালে নিমাইয়ের বাড়িতে হাজির হয়ে ওই ওঝা দাবি করে, ‘মা মনসার আশীর্বাদ’ পেয়েছে সে। মর্গ থেকে দেহ এনে হাজির করলে নিমাইয়ের স্ত্রীকে বাঁচিয়ে তুলবে সে। ওঝা দাবি করতে থাকে, সাপে কাটা রোগী মৃত্যুর পরে সাতদিন বেঁচে থাকে।
সবেমাত্র মারা গিয়েছেন গৃহকর্ত্রী। শোকের আবহে ওঝার কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন আত্মীয়-পড়শিদের কেউ কেউ। নিমাইয়েরও মনে হয়, একবার শেষ চেষ্টা করে দেখাই যাক না!
এ দিকে, ঘটনার কথা ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকায়। ভিড় জমতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। আসেন কিছু সচেতন মানুষজনও। তাঁদের দেখে ওঝা এক সময়ে সরে পড়ে। সকলে পরিবারের লোকজনকে বোঝান। পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। নিমাই পরে বলেন, ‘‘সকলে বোঝালেন, এ ভাবে মৃতের দেহে প্রাণ ফেরানো যায় না। আমিও সে কথা জানতাম না তা নয়। কিন্তু স্ত্রীকে হারিয়ে মাথার ঠিক ছিল না। ওঝার কথায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম।’’
বিষয়টি জেনেছেন যুক্তিবাদী মঞ্চে সদস্যেরা। মঞ্চের রাজ্য সম্পাদক প্রদীপ সরকার বলেন, ‘‘মৃতকে বাঁচানো যায় না। আজও অনেক মানুষ কুসংস্কারে বিশ্বাস করছেন, এটাই আশ্চর্যের। পুলিশের কাছে ওঝার গ্রেফতার দাবি করছি।’’
দেগঙ্গার তিনটি মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রদীপরা সেখানে মানুষকে সচেতন করার কাজ শুরু করেছেন। তাঁর মতে, ছোটবেলা থেকে শিশুদের মধ্যে কুসংস্কার-বিরোধী মনোভাব তৈরির চেষ্টা করতে হবে।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, সাপে কামড়ালে সময় নষ্ট না করে দ্রুত সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এভিএস ইঞ্জেকশন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করলে বাঁচার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বারাসত জেলা হাসপাতালের সুপার সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘‘সাপে কাটা রোগীর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণ রক্ষা হয়। গত বছর আমাদের হাসপাতালে ৪৩৯ জন সাপে কাটা রোগী এসেছিলেন। সকলকেই সুস্থ করা গিয়েছে।’’ এভিএস বাইরে কিনতে পাওয়া যায় না। হাসপাতালেই চিকিৎসা সম্ভব, এ কথা বার বার মানুষকে বোঝানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।