বনগাঁর স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁদের দু’জনের আড়াআড়ি সম্পর্কের কথা নেতা-কর্মীদের অজানা নয়। তৃণমূল ছেড়ে একজন গিয়েছিলেন বিজেপিতে। তিনি তৃণমূলে ফেরার পরে দু’জনের সমীকরণ কী হয়, তা নিয়ে জল্পনা ছিল স্থানীয় রাজনীতিতে। তবে প্রাথমিক ভাবে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে আসা বাগদার বিধায়ক বিশ্বজিৎ দাস এবং প্রাক্তন পুরপ্রধান শঙ্কর আঢ্য দু’জনের মধ্যে সুসম্পর্কেরই ইঙ্গিত মিলছে। একে অন্যের প্রশস্তিও শোনা যাচ্ছে দু’জনের মুখে।
শঙ্করের কথায়, ‘‘বিশ্বজিৎদা একজন দক্ষ সংগঠক। এক সঙ্গে সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। ওঁর সঙ্গে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক আগাগোড়াই ভাল। পিছন থেকে কেউ কেউ কলকাঠি নেড়েছিল বলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল ।’’ অন্য দিকে, বিশ্বজিৎ বলছেন, ‘‘শঙ্করের সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পর্ক। অতীতে কিছু ভুল বোঝাবুঝি থাকতে পারে। এখন নেই। আমরা কেউ দলের ঊর্ধ্বে নই। দলের স্বার্থে সকলে মিলে কাজ করব।’’
মঙ্গলবার তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরে বুধবার বিশ্বজিৎ ফেরেন বনগাঁয়। শহরের ১ নম্বর রেলগেট এলাকায় তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা তাঁকে ফুলের মালা পরিয়ে স্বাগত জানান। যশোর রোড ধরে মিছিল করে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বিশ্বজিৎ মতিগঞ্জ এলাকায় পৌঁছন। মাইকে প্রচার করা হতে থাকে, ‘‘ঘরের ছেলেকে অভিনন্দন জানান।’’ মতিগঞ্জ এলাকায় মঞ্চ বেঁধে বিশ্বজিৎকে সংবর্ধনা দেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা। অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন শঙ্কর।
এদিন বিশ্বজিৎ বলেন, ‘‘আমার এখন প্রধান কাজ পুরভোটে তৃণমূলকে জেতানো। ২২টি ওয়ার্ডেই আমরা জয়ী হব।’’ গত লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে বনগাঁ পুরসভা এলাকার বেশিরভাগ ওয়ার্ডে পিছিয়ে ছিলেন তৃণমূল প্রার্থীরা। তৃণমূল সূত্রের খবর, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিশ্বজিতের বনগাঁ পুরসভা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। পুর এলাকার সংগঠন শক্তিশালী করতে তাঁকে কাজ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিন বিশ্বজিৎও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বাগদা নয়, বনগাঁ শহরের সংগঠন শক্তিশালী করাই তাঁর লক্ষ্য।
বাগদায় তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল দীর্ঘদিন ধরেই নেতৃত্বের মাথাব্যথার কারণ। বিশ্বজিৎ তৃণমূলে ফিরে আসায় বাগদার স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক মহল মনে করছেন, নতুন করে এখানে দলীয় কোন্দল প্রকাশ পেতে পারে। যদিও বিশ্বজিৎ জানিয়েছেন, ‘‘আমি বাগদার বিধায়ক। জনপ্রতিনিধি হিসেবে বাগদার মানুষকে পরিষেবা দেওয়া আমার কাজ। আমি তা করব। পাশাপাশি বাগদার উন্নয়ন করব।’’
বিধানসভা ভোটে বাগদা কেন্দ্রে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৃণমূল প্রার্থী পরিতোষ সাহা। বিশ্বজিতের তৃণমূলে ফেরা নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমরা সবাই তৃণমূল করি। কেউ দলের বাইরে না। দলনেত্রী যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা সকলে তা মাথা পেতে নেব।’’
বিশ্বজিতের সঙ্গেই বনগাঁ পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর মনোতোষ নাথ এবং বিজেপি নেতা সুব্রত পাল বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগদান করেছেন। এমনিতেই বনগাঁয় বিজেপির গোষ্ঠীকোন্দল বার বার প্রকাশ্যে আসছে। দলের বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি মনস্পতি দেবকে ব্রাত্য রেখে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। দলের একাধিক সভা, কর্মসূচিতে নেতা-বিধায়কদের একাংশের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ দলের নেতা-কর্মীদের অনেকে। বিশ্বজিৎ তৃণমূলে যোগদানের পরে বিজেপি ছেড়ে আরও কেউ ঘাসফুল শিবিরের দিকে পা বাড়ান কি না, সে দিকে নজর আছে রাজনৈতিক মহলের। জেলা তৃণমূলের একটি সূত্রের দাবি, বনগাঁ বিজেপির অনেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন।
বিজেপি সূত্রের খবর, বুধবার রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ নিজের বাড়িতে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা কমিটির কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। এর সঙ্গে বিশ্বজিতের তৃণমূলে যোগদানের সম্পর্ক নেই বলে অবশ্য জানানো হয়েছে। দলের এক নেতার কথায়, ‘‘আগামী পুরভোট নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’’ বিশ্বজিতের তৃণমূলে যোগদানের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব। মনস্পতি বলেন, ‘‘সাগর থেকে এক বালতি জল কমে গেলে সাগরের কোনও ক্ষতি হয় না।’’