Advertisement
E-Paper

সব্জি-ফলের বিনিময়ে আজও খেয়া পারাপার

যাঁরা কৃষিজ পণ্য নিয়ে নদী পার হচ্ছেন, তাঁরা মাঝির হাতে দিচ্ছেন কয়েকটা করে সব্জি আর ফল। বাকি সাধারণ নিত্য যাত্রীরা কিছুই না দিয়ে দিব্যি গটগট করে নেমে চলে যাচ্ছেন নৌকো থেকে। জানা গেল, তাঁদেরও পারানি বাবদ নগদে কিছুই দিতে হয় না। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা মাঝির হাতে তুলে দেন খানিকটা চাল।

অমিত করমহাপাত্র

শেষ আপডেট: ১১ মে ২০১৫ ০১:০৪
দানের খেয়া। নলগোড়া খেয়াঘাটে তোলা নিজস্ব চিত্র।

দানের খেয়া। নলগোড়া খেয়াঘাটে তোলা নিজস্ব চিত্র।

যাঁরা কৃষিজ পণ্য নিয়ে নদী পার হচ্ছেন, তাঁরা মাঝির হাতে দিচ্ছেন কয়েকটা করে সব্জি আর ফল। বাকি সাধারণ নিত্য যাত্রীরা কিছুই না দিয়ে দিব্যি গটগট করে নেমে চলে যাচ্ছেন নৌকো থেকে। জানা গেল, তাঁদেরও পারানি বাবদ নগদে কিছুই দিতে হয় না। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা মাঝির হাতে তুলে দেন খানিকটা চাল। বহু বছর ধরে এটাই দস্তুর জয়নগর ২ ব্লকে নলগোড়া খেয়াঘাটের। মণি নদীর উপরে এই খেয়াঘাটে পারাপার চলে টাকা নয়, দ্রব্যের বিনিময়ে। পরিষেবার পোশাকি নাম, ‘দানের খেয়া’।

আদতে মথুরাপুরের বাপুলিবাজার এলাকার বাসিন্দা গায়েন পরিবার গত শতকের প্রথমভাগে নলগোড়ার চাপালিয়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য সনৎ গায়েন জানান, সে সময় কঠোর পরিশ্রম করে আশেপাশের কয়েকটি মৌজায় কয়েকশো বিঘা জমি কিনে নিয়ে জঙ্গল সাফ করে তা চাষাবাদের উপযুক্ত করে তোলেন গায়েনরা। এলাকায় ধীরে ধীরে বসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনযাপন, চাষবাস, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ নানা জরুরি প্রয়োজনে দিনে বারবার নদী পারাপার হতে হত। কিন্তু পারাপারের কোনও সুষ্ঠু ব্যবস্থা ছিল না। এখানকার মানুষ মাছ, মিন, কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গরিব পরিবারের সেই সব মানুষের নগদ টাকা খরচ করার মতো অবস্থা ছিল না। মানুষের সেই দুর্দশার কথা অনুভব করেছিলেন সম্ভ্রান্ত গায়েন পরিবারের বিধবা চারুলতাদেবী।

সনৎবাবু বলেন, “আজ থেকে ৬০ বছর আগে কথা। তখনও বাঘ-কুমিরের দাপট কমেনি। এলাকা যথেষ্ট অনুন্নত ছিল। সাধারণ মানুষের স্বার্থে ঠাকুমা (চারুলতা) খেয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন। কাউকে টাকা দিতে হত না, যার যেমন সামর্থ্য, তেমনই কিছু কিছু জিনিস দিয়ে যেতেন মাঝিকে।’’ চারুলতাদেবী প্রাথমিক স্কুলের জন্য ৫ বিঘা জমি দান করেন বলে জানান সনৎবাবু। খেয়া পারাপারে মাঝির সাহায্যের জন্য আর ৫ বিঘা জমি দেন। খেয়া পরিচালনা করেন নলগোড়া বাজার কমিটি ও স্থানীয় মানুষজন। রাজনৈতিক দলগুলিরও সদস্য আছে ওই কমিটিতে। কিন্তু তাতে গায়েন পরিবারের কোনও হস্তক্ষেপ থাকে না। পরিচালকেরা জানালেন, সোনাটিকরি মৌজায় দান করা পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে তিন বিঘা জমির ফসল নেন মাঝি। বাকি দু’বিঘা জমির ফসল বিক্রির টাকা মেরামত করা হয় দানের দু’টি নৌকা। যাত্রীদের জন্য এই ঘাটে পারানি লাগে না। তবে কেউ বিক্রির জন্য কৃষিজ পণ্য নিয়ে গেলে মাঝিকে তার যৎসামান্য দিতে হয়। সাইকেল পারাপারের ভাড়া এক পয়সা থেকে বেড়ে বর্তমানে ১ টাকা। মাঝিদের সংসার চালানোর উপায় হিসাবে যাত্রীরা আমন চাষের ফসল থেকে চাল বছরে একবার দেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেল, মাঝি নির্ধারণ হয় প্রতি বছর। টানা ন’বছর মাঝি থাকার পরে এখন নদীর ঘাটে ছোটো দোকান করেছেন বৃদ্ধ অমরচাঁদ বায়েন। তিনি বললেন, “নলগোড়া, সোনাটিকরি, চুপড়িঝাড়া, ২৩ নম্বর লাট গ্রামগুলি থেকেই চাল সংগ্রহ করা হয়। আসলে তখন তো মানুষের হাতে এখনকার মতো কাঁচা টাকা ছিল না। তাই এই বিনিময় প্রথা। তা-ও আগে টাকা-পয়সা নেওয়া হত না। কিন্তু সংসার চালানোর দায়ে দাতাপক্ষের সায় নিয়ে এখন সাইকেল, মোটর বাইকের জন্য টাকা নেওয়া হয়।” তাঁর অভিজ্ঞতা, আগে নদী তিনশো মিটার চওড়া ছিল। ছিল প্রবল স্রোত। বাঘ-কুমিরের উপদ্রব ছিল। জীবনের ঝুঁকি ছিল অনেক বেশি। এখন সে সব নেই। বর্তমান মাঝি বিমল নস্করও এই কথা জানালেন। তাঁর কথায়, “এখন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ পারাপার করেন। একার পক্ষে সম্ভব হয় না বলে ভোর রাত, দুপুর ও রাতে কিছু সময়ের পৃথক নৌকা নিয়ে এক টাকা নিয়ে পারাপার করান অন্য মাঝি।’’ নলগোড়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কালাচাঁদ মণ্ডল বলেন, ‘‘মুদ্রা ব্যবস্থার আগে বিনিময় প্রথা সমাজ স্বীকৃত ছিল। সেই প্রথার প্রতি আবেগ সম্মান দেখিয়ে তা চালু রাখা রয়েছে। বিষয়টি আমাদের কাছে গর্বের।”

mani river sundarban mani river mani river ferry service fruits and vegetables amit kar mahapatra mathurapur bapuli bazar daner kheya
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy