রতন চৌধুরী কে আছেন? বিচারকের প্রশ্ন শুনে এজলাসে এগিয়ে এলেন এক যুবক। বিচারক জানতে চাইলেন, আপনি রতন চৌধুরী? মাথা নিচু করে ওই যুবকের উত্তর, “না ধর্মাবতার, আমি অরূপ মণ্ডল।”
উত্তর শুনে সোমবার দুপুরে বনগাঁ এসিজেএম আদালতে শুরু হল তুমুল শোরগোল। ভেসে এল তৃণমূল নেতা-কর্মীদের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, “এত ক্ষণ ধরে তো আমরা এই কথাটাই বলছি।” জানা গেল, বনগাঁর ধর্মপুকুরিয়া পঞ্চায়েতের সিপিএম সদস্য রতন চৌধুরীর নাম করে অন্য এক যুবক আত্মসমর্পণ করে জেলে ছিলেন।
পুলিশ জানায়, ১৯৯৫ সালের ৭ এপ্রিল বনগাঁ থানায় রতনবাবু-সহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে হামলা, মারধর, লুঠপাটের ৭টি মামলা দায়ের হয়। রতনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন বিনয়কুমার সরকার নামে এক ব্যক্তি। রতনবাবু ও কয়েক জনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। পরে জামিন পান সকলে। কিন্তু তারপর আর আদালতে হাজিরা দেননি রতন। ইতিমধ্যে সিপিএমের টিকিটে ভোটে জিতে পঞ্চায়েতের সদস্য হন তিনি। কিছু দিন আগে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে বনগাঁ আদালত।
বৃহস্পতিবার রতন-সহ ৭ জন অভিযুক্ত বনগাঁ আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সইসাবুদও করেন রতন। ভারপ্রাপ্ত এসিজেএম গৌরব ঘোষ সকলকে ৩০ জুন পর্যন্ত জেল হাজতে পাঠান। তখনই রতনের ভেক ধরে হাজতে গিয়ে ঢোকেন অরূপ।
ইতিমধ্যে এলাকায় রটে যায়, জেলে গিয়েছে যে, সে আসল রতন নয়। রবিবার এই মর্মে ধর্মপুকুরিয়া অঞ্চল তৃণমূলের তরফে বনগাঁ থানায় স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এসিজেএম মুন চক্রবর্তীর কাছে আইনজীবীর মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফে পৃথক স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সোমবার সকালে আদালতের সামনে মিছিল করে তৃণমূল। ধর্মপুকুরিয়া পঞ্চায়েতটি বামেদের দখলে। বিরোধী দলনেতা তৃণমূলের আক্তার আলি মণ্ডল বলেন, “এক জনের হয়ে অন্য জন কী করে জেল খাটছে?”
বনগাঁ আদালতের মুখ্য সরকারি আইনজীবী সমীর দাস জানান, বিচারক অরূপকে জামিন দিয়েছেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ‘কোর্ট কমপ্লেন’ মামলা রুজু করেছেন তিনি নিজেই। সেই অভিযোগপত্রটি এসিজেএম পাঠিয়ে দিয়েছেন বারাসতের মুখ্য বিচার বিভাগীয় বিচারকের কাছে। রতন চৌধুরীকে গ্রেফতার করার জন্য নতুন করে নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
অরূপ বনগাঁ আদালতেই মুহুরির শিক্ষানবিশের কাজ করেন বলে স্থানীয় সূত্রের খবর। বছর পঁচিশের ওই যুবকের বাড়ি গাইঘাটার ঠাকুরনগর এলাকায়। কেন তিনি রতনবাবুর হয়ে জেল খাটছিলেন, তা এ দিন জানা যায়নি। তবে আইনজীবীদের একাংশের অনুমান, এর পিছনে আর্থিক লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। গোটা ঘটনায় তাঁরা বিস্মিতও নন। আইনজীবীদের একাংশের মতে, এমন ঘটনা আকছার ঘটে আদালতে। বিষয়টির সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হয়ে যাওয়ায় প্রকাশ্যে এল। আত্মসমর্পণের সময়ে কেন জানা গেল না অরূপের আসল পরিচয়? আইনজীবীদের বক্তব্য, এ কথা বোঝা সত্যিই সম্ভব নয় তাঁদের পক্ষে।
বছর বিয়াল্লিশের রতনবাবুর বাড়ি ধর্মপুকুরিয়ার পানচিতা গ্রামে। সেখানে সোমবার গিয়ে দেখা মেলেনি তাঁর। রতনবাবুর শ্বশুরবাড়ি ওই এলাকাতেই। সেখান থেকে জানানো হয়, রথযাত্রা উপলক্ষে তিনি সস্ত্রীক পুরী গিয়েছেন। তাঁর মোবাইল বন্ধ ছিল। ধর্মপুকুরিয়া পঞ্চায়েতের প্রধান সিপিএমের সন্তোষ রায় বলেন, ‘‘বৃহস্পতিবার পঞ্চায়েত অফিসে এসে ইন্দিরা আবাস যোজনার ঘর নিয়ে আমার সঙ্গে দীর্ঘ ক্ষণ কথা বলেন উনি। পরেও ফোনেও একবার কথা হয়েছে। এত কাণ্ড জানা ছিল না।” দলের ধর্মপুকুরিয়া শাখা সম্পাদক তাপস বিশ্বাস বলেন, ‘‘আইন আইনের পথে চলবে।”