Advertisement
E-Paper

এ বার এক বইতেই খোঁজ মিলবে ছত্রভোগ থেকে জটার দেউলের

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস। বিচ্ছিন্ন ভাবে সেই উপাদানগুলি সংরক্ষণ বা গবেষণার কাজ হয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগের অভাব নিয়ে অভিযোগ বিস্তর। এ বার জেলা গ্রন্থাগারের উদ্যোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার পর্যটন মানচিত্র।

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:০৩

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস। বিচ্ছিন্ন ভাবে সেই উপাদানগুলি সংরক্ষণ বা গবেষণার কাজ হয়েছে। কিন্তু সরকারি উদ্যোগের অভাব নিয়ে অভিযোগ বিস্তর। এ বার জেলা গ্রন্থাগারের উদ্যোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার পর্যটন মানচিত্র। তাতে থাকছে জেলার প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানগুলি কোথায় মিলবে তার খোঁজখবরও। আমতলার কাছে বিদ্যানগরে অবস্থিত জেলা গ্রন্থাগারের হীরকজয়ন্তী বর্ষ উদযাপন উপলক্ষে তারা প্রকাশ করতে চলেছে বিশদ তথ্য ও ছবি সম্বলিত গ্রন্থ, পর্যটন মানচিত্র, ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সংস্করণও। জেলা থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ, ক্ষুদ্র পত্র-পত্রিকা, সংবাদপত্র সংগ্রহ ও চর্চাকেন্দ্র গঠনও করা হচ্ছে।

এই জেলায় এক দিকে যেমন রয়েছে নানা প্রত্নক্ষেত্র তেমনই রয়েছে ঐতিহাসিক স্থান। যেমন রয়েছে পাল সেন যুগের মন্দিরের জন্য বিখ্যাত সাগরের মন্দিরতলা বা একাদশ শতকের জটার দেউল তেমনই রয়েছে ১৭৫৬ সালে মুর্শিদাবাদের নবাব সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধস্থল। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন নানা জায়গাও রয়েছে এই জেলায়। যেমন ছত্রভোগ। এসেছেন নানা মনীষীও। গবেষক ও পর্যটক, দু’তরফেই এই জায়গাগুলি সম্পর্কে বিশদ তথ্যের খোঁজ করা হত। কিন্তু কোনও একটি জায়গা থেকে তা পাওয়ার উপায় ছিল না। এ বার সেই সমস্যারই সমাধান হতে চলেছে।

জেলা গ্রন্থাগারের আধিকারিক মধুসূদন চৌধুরী জানান, পর্যটন মানচিত্রে ও গ্রন্থে উল্লেখ থাকছে জেলার ঐতিহ্যশালী স্থাপত্য, প্রত্নক্ষেত্র, প্রত্ন ও লোকসংস্কৃতির সংগ্রহশালা, বিভিন্ন ধর্মের উপাসনাস্থল, লোকায়ত থান, সমাধিক্ষেত্র, মেলা, ঐতিহাসিক ও লোকসাহিত্যের যুদ্ধস্থল, দুর্গ, তাম্রশাসনের প্রাপ্তিস্থল, মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব সাহিত্যে উল্লিখিত স্থান, মনীষীদের স্মৃতি জড়িত স্থান, কিংবদন্তির জলাশয়, আদি গঙ্গাসহ অন্য নদীর অতীত ও বর্তমান গতিপথ ইত্যাদি। থাকছে ওই জায়গাগুলিতে যাওয়ার পথনির্দেশও। মধুসূদনবাবুর কথায়, মুর্শিদাবাদে পর্যটন মানচিত্র তৈরি হলেও এমন কাজ অতীতে রাজ্যের অন্য কোনও জেলায় হয়নি। জেলার সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ২৯৬টি গ্রন্থাগারের পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে একগুচ্ছ পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, প্রতিটি ক্ষেত্রে জেলার বিশেষজ্ঞ, গবেষক, লেখক ও ইতিহাসবিদদের প্রত্যক্ষ পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।

জেলার প্রত্ন গবেষক দেবীশঙ্কর মিদ্যা বলেন, “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অসাধারণ একটা কাজ হচ্ছে। আমরাও আমাদের এত দিনের গবেষণা ও ক্ষেত্র সমীক্ষার নির্যাসটুকু গ্রন্থাগারের হাতে তুলে দিচ্ছি।”

দেবীশঙ্করবাবু জানান, এই গ্রন্থে থাকছে জয়নগরের কালিদাস দত্ত স্মৃতি সংগ্রহশালা, কাশীনগরের সুন্দরবন প্রত্ন গবেষণা কেন্দ্র, খাড়ি ছত্রভোগ সংগ্রহশালা, বারুইপুরের সুন্দরবন সংগ্রহশালা, বিষ্ণুপুরের তুলসীচরণ স্মৃতি সংগ্রহশালাসহ প্রায় কুড়িটি সংগ্রহশালার খোঁজখবর। এই সংগ্রহশালাগুলিতে কী কী রয়েছে, তার খবরও থাকবে বইটিতে। থাকবে ওয়েবসাইটেও। সেই সঙ্গে থাকবে জেলার বিভিন্ন প্রত্নক্ষেত্র সম্পর্কে বিশদ তথ্য। যেমন, পাল সেন যুগের মন্দিরের জন্য বিখ্যাত সাগরের মন্দিরতলা, মধ্যযুগের নদীবন্দর হরিনারায়ণপুর, থেকে শুরু করে গোবর্দ্ধনপুর, কঙ্কণদিঘি, বড়াশি-ছত্রভোগ, আটঘড়া, দেউলপোতা, হিরন্ময়পুর ও ধোষা, বাইশহাটা, তিলপি, রাক্ষসখালি, বকুলতলা সম্পর্কে পর্যটক থেকে গবেষক সকলেই প্রাথমিক তথ্য পাবেন। ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলির মধ্যে একাদশ শতকের জটার দেউল, ১৬৭০ শকাব্দে নির্মিত মন্দিরবাজারের কেশবেশ্বরের মন্দির, জয়নগরের গোপাল জিউয়ের মন্দির, দেববেড়িয়ার মন্দির, চিনা মন্দির, বাওয়ালিয়ার একগুচ্ছ মন্দির, রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি জড়িত গোসাবার হ্যামিলটনের কাঠের বাংলো, কুলপিতে মান্না বিবির সমাধি মন্দির, ঘুঁটিয়ারি শরিফ, বহড়ুতে ফ্রেসকো শিল্পের শ্যামসুন্দর জিউয়ের মন্দির সম্পর্কেও এ যাবৎ প্রাপ্য প্রায় সব তথ্যই থাকবে।

থাকবে শ্রীচৈতন্যের স্মৃতি জড়িত বারুইপুরের মহাপ্রভুতলা ও ছত্রভোগ, নেতড়ায় নীলরতন সরকার ও যোগীন্দ্রনাথ সরকারের বাড়ি, ফলতায় জগদীশচন্দ্র বসুর স্মৃতি জড়িত গবেষণা কেন্দ্র ও উদ্যান, রবীন্দ্র স্মৃতি জড়িত গোসাবার বাংলো, বারুইপুর ও জয়নগরে বঙ্কিমচন্দ্রের স্মৃতি জড়িত বাড়ি, কোদালিয়ায় সুভাষচন্দ্র বসুর বাড়ি, তারাশঙ্করের স্মৃতি জড়িত বজবজের খুকি মা কালী, ১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দের স্মৃতি জড়িত বজবজ পুরাতন স্টেশন সম্পর্কেও নানা তথ্য। ইতিহাস গবেষক বিমল পণ্ডিতের মতে, “অতীতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক কাজ হয়েছে। কিন্তু এবার সম্মিলিত ভাবে হওয়ায় কাজটি সম্পূর্ণতা পাচ্ছে। এটি একটি আকর গ্রন্থ হিসাবে থাকবে।”

লোকসংস্কৃতি গবেষক সঞ্জয় ঘোষ বলেন, “দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল এই কাজ। বেসরকারি ভাবে তা সম্ভব ছিল না। গ্রন্থাগারের এই উদ্যোগ জেলাবাসীকে সচেতন করে জেলার এই ঐতিহ্যগুলি টিকিয়ে রাখবে।”

তিনি জানান, প্রাচীন লোকায়ত থানগুলির মধ্যে দক্ষিণ রায়, গাজীবাবা, বিবি মা, পঞ্চানন, বিশালাক্ষী, রক্তগাজী, জামাইবলি ইত্যাদি এবং মেলাগুলির মধ্যে সাগর মেলা, নন্দার মেলা, বোলসিদ্ধির বাণফোঁড় মেলা, জয়নগরের ঝাঁপ, দক্ষিণ বিষ্ণুপুরের মেলা, বড়াশির গাজন প্রাচীন। সাহিত্য গবেষক বাণী দাসের বক্তব্য, মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব সাহিত্যে যে স্থান নাম ও মন্দিরগুলি পাওয়া যায় বাস্তবে তার অস্তিত্ব রয়েছে। এই জেলায় আদিগঙ্গার দুই তীরে বহু ধর্মস্থান সুদূর অতীতের মতো বর্তমানেও রয়েছে। রয়েছে সাহিত্যে উল্লিখিত যুদ্ধক্ষেত্রও।

তিনি জানান মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, রায়মঙ্গল ও চৈতন্যভাগবতে পাওয়া যায় ছত্রভোগ, চক্রতীর্থ, অম্বুলিঙ্গ মন্দির ও ঘাট, নেতিধোপানির ঘাট, ত্রিপুরাসুন্দরীর মন্দির, হাতিয়াগড়, বদরিকাকুণ্ড ইত্যাদি ও লোককাব্যে যুদ্ধক্ষেত্র হিসাবে পাওয়া যায় খনিয়া (দক্ষিণ রায় ও বরখান গাজি), হাতিয়াগড় ও বড়াল (অকানন্দ-বকানন্দ ও পীর গোরাচাঁদ), বিজয়নগর ও শাহজাদাপুর (মুকুট রাজা ও বরখান গাজী) ইত্যাদি।

সামনের বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি সকলের হাতে গ্রন্থ ও মানচিত্র আসার কথা।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy