বছর বারোর পরিচারিকাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আটকে রাখার অভিযোগে শনিবার রাতে এক দম্পতিকে গ্রেফতার করল হাবরা থানার পুলিশ। শম্ভু পাল ও সুতপা পাল নামে ওই দু’জনকে হাবরার দেশবন্ধু পার্ক এলাকার সুভাষপল্লি থেকে গ্রেফতার করা হয়। রবিবার ধৃতদের বারাসত জেলা আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাদের ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘ওই দম্পতির বিরুদ্ধে শিশু শ্রমিককে পরিচারিকার কাজে নিয়োগ করা, নিগ্রহ করা-সহ মোট সাতটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ওই কিশোরীর বয়ানের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মাস ছয় আগে হাড়োয়ার গোপালপুরের বাসিন্দা সীমা প্রামানিক নামে ওই কিশোরী পেশায় ধুপকাঠি ব্যবসায়ী শম্ভুবাবুর বাড়িতে কাজ করতে আসে। ঠিক হয়েছিল, থাকা-খাওয়া ও মাসে ৩০০ টাকা মাইনে পাবে সে। তাকে এত নিগ্রহ করা হত যে তা সহ্য করতে না পেরে গত ২৫ জুলাই ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। ওই দম্পতি তাকে হাবরা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন ও ২৭ জুলাই ব্যক্তিগত বন্ডে সই করে হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে হাড়োয়ায় তার বাড়িতে রেখে দিয়ে চলে আসেন। যদিও চিকিৎসক তাকে ছাড়তে চাননি।
সীমার পরিবারের অভিযোগ, মেয়েকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে শম্ভুরা ‘কাউকে কিছু জানালে ফল ভাল হবে না’ বলে হুমকি দিয়ে আসেন। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শম্ভুবাবুরা।
হাবরা চাইল্ড লাইনের কর্মীরা এই খবর পেয়ে সীমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মাধ্যমেই হাবরার চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি সীমাকে উদ্ধার করে মধ্যমগ্রামের একটি হোমে রাখে। চাইল্ড লাইন সূত্রে জানানো হয়েছে, মেয়েটির বাবাকে বার বার ফোনে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। মেয়েটি বাড়িতে নিরাপদ ছিল না। তাই তাকে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির অনুমতি নিয়ে হোমে রাখা হয়। পুলিশকেও বিষয়টি জানানো হয়। হোমেই তার চিকিৎসা এবং কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। পুলিশ জানায়, এখনও সে সম্পূর্ণ সুস্থ নয়।
শনিবার ওই হোম থেকে পুলিশের কাছে দেওয়া বয়ানে সীমা জানিয়েছে, তাকে দিয়ে কাপড় কাচা, বাসন মাজা, ঘরবাড়ি ঝাঁট দেওয়ার মতো কাজ থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ-কর্ম করানো হত। এমনকি রাতে ঘুম থেকে তুলেও কাজ করানো হত। ঠিক মতো খেতেও দেওয়া হত না। বাড়ি যাওয়ার জন্য ছুটি চাইলে কপালে জুটত মার। যাতে সে পালাতে না পারে, তার জন্য বাড়ির মূল গেটে তালা লাগিয়ে রাখা হত। যদিও ওই দম্পতির দাবি, সীমাকে দিয়ে সামান্য কাজ করানো হত।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সীমার পারিবারিক অবস্থা খুবই খারাপ। বাবা বেণী প্রামাণিক খেত মজুর। কখনও কাজ মেলে, কখনও মেলে না। মা কুড়নিদেবী গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে বেড়ান। তাঁদের দুই ছেলে, এক মেয়ে। অভাবের জেরে এক প্রকার বাধ্য হয়েই বড় মেয়েকে অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। ভেবেছিলেন, অন্তত খেয়ে পরে থাকতে পারবে। তাঁরা জানাচ্ছেন, চারমাস আগে সীমাকে একবার বাড়িতে আসতে দেওয়া হয়েছিল।
বাড়ি যেতে না দেওয়ার অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন ধৃত দম্পতিও। শম্ভু পাল বলেন, “বাড়ি যেতে দিইনি বলেই বিষ খেয়েছিল। আমরাই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। বাড়িও পৌঁছিয়ে দিই। তারপরেও কেন এই অভিযোগ উঠল বুঝতে পারছি না।”