ধন্যি ছেলের অধ্যবসায়।
চুরির টাকায় বড়লোক হয়ে বাকি জীবনটা বসে খাবে, এই ছিল আশা। সে জন্য বছর চব্বিশের যুবক একের পর এক চুরি করে যাচ্ছিল। শেষমেশ অবশ্য ধরা পড়েছে বসিরহাটের সাঁইপালার ছেলে সুব্রত চক্রবর্তী। তার ‘উচ্চাশা’র কথা শুনে থ দুঁদে পুলিশ অফিসারেরাও। এক প্রবীণ অফিসারের কথায়, ‘‘সারা জীবন বহু চোর-ডাকাত দেখেছি। কিন্তু ছোট থেকে বড় চোর হবে বলে স্বপ্ন দেখে, এমন কারও কথা তো শুনিনি!’’
বৃহস্পতিবার সুব্রতকে গ্রেফতার করে কয়েক লক্ষ টাকার সোনা-রুপোর গয়না, ল্যাপটপ উদ্ধার হয়েছে। বসিরহাটের এসডিপিও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বসিরহাট থানায় এক সাংবাদিক সন্মেলনে বলেন, ‘‘গত কয়েক মাস ধরে বসিরহাট, হাড়োয়া, বাদুড়িয়া, হাসনাবাদ, মিনাখাঁ থানা এলাকায় একের পর এক চুরি হচ্ছিল। তদন্তে নেমে কুলকিনারা করতে পারছিল না পুলিশ। পরে চোরের ফেলে যাওয়া একটি সাইকেল উদ্ধার করে তদন্তের কিনারা হয়েছে।’’ এসডিপিও জানান, ওই সাইকেলের ‘চেসিস নম্বর’ থেকে হদিশ মেলে সুব্রতর। জানা গিয়েছে, নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পরে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দিয়েছিল ছেলেটা। কিন্তু বড়লোক হওয়ার স্বপ্নটা ছিল বরাবর। পড়াশোনা করে বেশি দূর এগোনো যাবে না বুঝে এ বার সে চুরিবিদ্যাকেই স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার করে। চোরাই মাল রাখা এবং কেনার জন্য সুব্রতর মামা হাসনাবাদের ভেবিয়ার সদরপুর গ্রামের সুকুমার সর্দার ও ভেবিয়ার স্বর্ণ ব্যবসায়ী অষ্ট মণ্ডল, বিশ্বজিৎ মণ্ডলকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি চুরি প্রকোপ বেড়েছিল বসিরহাট মহকুমায়। প্রায় দিনই খড়মপুর, কাটিয়াহাট, কলেজপাড়া, সাঁইপালা, স্টেশনপাড়া, ট্যাঁটরা, দন্ডিরহাট, শিবহাটি, ইটিন্ডা, আঁধারমানিক, মন্দিরপাড়া, রামানন্দপুর গ্রামে কোথাও গ্রিল-দরজার তালা ভেঙে কোথাও আবার ছাদের দরজা ভেঙে চুরির ঘটনা ঘটছিল। অথচ প্রায় কোনও ক্ষেত্রেই গৃহকর্তা সকালের আগে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না।
তদন্তে নেমে পুলিশ প্রাথমিক ভাবে জানতে পারে, রাতে গৃহস্থের বাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে ঘুমের ওষুধ স্প্রে করে তবেই ঘরে ঢুকছে দুষ্কৃতী। জনা কয়েক দুষ্কৃতীকে এর আগে ধরে জেরা করেও পুলিশ একের পর এক চুরির কিনারা করতে পারছিল না। আর চুরিও বন্ধ হচ্ছিল না। চোরের উপদ্রবের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ গরমের দিনেও জানলা বন্ধ করে রাতে ঘুমোতে বাধ্য হচ্ছিলেন।
ইতিমধ্যে চুরির ঘটনা ঘটে বসিরহাটের কলেজপাড়া এলাকার ভবাণীপুরের পার্থ ঘোষের বাড়িতে। পরিবারের অন্যদের নিয়ে বাজারে বেরিয়েছিলেন গৃহকর্তা। সেই সুযোগে দুষ্কৃতী ছাদের দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে আলমারি খুলে গয়নাগাটি ও অন্য মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে পালায়। পুলিশ গিয়ে বাড়ির পাশের একটি বাড়ির গায়ে হেলান দেওয়া একটি সাইকেল বাজেয়াপ্ত করে থানায় আনে। বসিরহাট থানার আইসি গৌতম মিত্র বলেন, ‘‘চোর ধরার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় এসআই কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। তিনিই ওই সাইকেলের চেসিস নম্বর দেখে দুষ্কৃতীকে শনাক্ত করেন। এরপর একে একে সকলকে গ্রেফতার করা হয়।’’
কাজলবাবু জানালেন, চুরি বন্ধ করতে না পারায় বড়কর্তাদের কাছে নিয়মিত বকুনি খেতে হচ্ছিল। সাধারণ মানুষের কটূক্তিও হজম করতে হচ্ছিল। ইতিমধ্যে গত ১৫ অগস্ট বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচাতে কাজলবাবু বসিরহাট পুরাতন বাজারে একটি সাইকেলের দোকানে আশ্রয় নেন। সে সময়ে তাঁর চোখে পড়ে, সাইকেলের চেসিস দেখে বিল করছেন দোকানি। কাজলবাবুর মাথায় খেলে, বাজেয়াপ্ত করা সাইকেলটির চেসিস নম্বর থেকেও নিশ্চয়ই কোনও সূত্র মিলতে পারে। সেই মতো ওই নম্বর খুঁজে বের করেন তিনি। তারই সূত্র ধরে পুলিশ জানতে পারে, সাঁইপালার বাসিন্দা সুব্রত চক্রবর্তী নামে এক জন ওই সাইকেলটি কিনেছিলেন।
সাঁইপালা এসে পুলিশ আবার একাধিক সুব্রত চক্রবর্তীর হদিশ পায়। সকলকেই জেরা করা হয় দফায় দফায়। শেষমেশ এক জন স্বীকার করে, সাইকেলটি তারই। এরপরে পুলিশের কাছে বাকি কাজটা সহজ হয়ে যায়। সাঁইপালায় সুব্রতর একতলা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে বেশ কয়েক ভরি সোনা-রুপোর গয়না, দু’টি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, সিমকার্ড মেলে। সুব্রতকে জেরা করে বাকিদের হদিশ পায় পুলিশ।
ধোপদুস্তুর চেহারার সুব্রত বলে, ‘‘ছোট থেকে ভাবতাম বড়লোক হতে হবে। অনেক ভেবে ঠিক করেছিলাম, পড়াশোনা করে নয়, বড়লোক হয়ে আয়েষ করে জীবন কাটানোর একটাই উপায় হল চুরি। তালা ভাঙার আগে ক্লোরোফর্ম ছিটিয়ে দিতাম। ধরা পড়ার ভয়ে কখনও দল পাকাইনি। কেন যে সে দিন মনের ভূলে সাইকেলটা ফেলে এসেছিলাম, না হলে পুলিশ কিছুতেই আমাকে ধরতে পারত না!’’