সাঁতার জানত না ছেলেটা।
জানত না, জলে একাকার হয়ে গিয়েছে জমি-পুকুর। ডোবা পাটখেত বলে মনে হচ্ছে যাকে, তার তল নেই।
দূর থেকে হজরত আলি দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁর বছর বারোর ছেলে ফিরোজ জল ভেঙে আসছে মাথায় পরার টোকা নিয়ে। তিনিই বলে এসেছিলেন, মাঠে দিয়ে যেতে। দেখে ফের কাজে মন দেন। খানিক বাদে চোখ তুলে দেখেন, ছেলে তো নেই!
জলকাদা মাড়িয়ে ছুটে যান বাবা। দেখেন, টোকা জলে ভাসছে। যেখানে ভাসছে, সেটা খেত নয়, ডোবা পুকুর। এলাকার বহু জমি, পুকুর, মাঠই এখন জলের তলায়। আলাদা করে চেনার উপায় নেই। কী ঘটেছে আঁচ করে হজরত ঝাঁপিয়ে পড়েন। আশপাশে খেতে কাজ করা অন্যেরাও ছুটে আসেন। পাশের বিএসএফ ক্যাম্পের জওয়ানেরা এসে হাত লাগান। শেষে এক জন নিথর ছেলেটিকে তুলে আনেন। বাড়ির লোকজন তাকে নিয়ে যখন বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছন, দেহে আর প্রাণ নেই।
বৃহস্পতিবার সকালে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় জয়ন্তীপুর এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ফিরোজ মণ্ডল যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, সেই নরহরিপুর সারদাচরণ বিদ্যাপীঠে ছুটি দেওয়া হয়। শিক্ষক-শিক্ষিকারা তার বাড়িতে যান। সেখানে তখন হজরত ও তাঁর স্ত্রী মনোরা বিবি কেঁদে চলেছেন। হজরত মাঝে-মাঝে জ্ঞানও হারাচ্ছেন।
আত্মীয়-পরিজনেরাই জানান, কিছু দিন আগে যে টানা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, তার জেরে জয়ন্তীপুরের বহু কৃষিজমি এখনও জলের নীচে। কোথাও কোমর সমান তো কোথাও হাঁটু সমান জল। এলাকারই এক জনের জল-জমা খেতে পাট ধোয়ার কাজে যান। যাওয়ার আগে ছেলেকে বলেন, টোকা আর জামা পৌঁছে দিতে।
পরিবার সূত্রে খবর, ফিরোজ সাঁতার জানত না। হজরত তাই বলে যান, সে যেন রাস্তা দিয়ে ঘুরে যায়। তাতে দশ মিনিট লাগত। কিন্তু বাবার নিষেধ না শুনে ফিরোজ বাড়ির পিছনে খেতের সোজা পথ ধরে। স্কুল যাওয়ারও তাড়া ছিল তার। হজরতের কথায়, ‘‘পাট ধুচ্ছিলাম। দূর থেকে দেখলাম, ছেলে আসছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি, ছেলে নেই। দৌড়ে গিয়ে দেখি, জলে আমার টোকা ভাসছে।’’