Advertisement
E-Paper

তৃণমূলের গোঁসায় থমকে কলেজ তৈরি

গ্রামের নাম ঘটিহারানিয়া। সেখানকার এক হতদরিদ্র সংসারে প্রথম সাক্ষর পাঞ্চালী নস্কর। স্বপ্ন ছিল, স্কুলের শিক্ষক হবে। সে স্বপ্ন ভেঙে যেতে সময় লাগেনি। কারণ, গত বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তিই হতে পারেনি সে। বাড়ি থেকে নিকটতম কলেজের দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। যাতায়াতের ভাড়াই মাসে হাজার টাকা। পাঞ্চালীর আক্ষেপ, “কে দেবে বাসভাড়ার টাকা? বই-খাতা কেনা, কলেজ ফি কুলোনই মুশকিল।”

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০১৫ ০১:২৭
এই জমিতেই কলেজ হওয়ার কথা। — নিজস্ব চিত্র

এই জমিতেই কলেজ হওয়ার কথা। — নিজস্ব চিত্র

গ্রামের নাম ঘটিহারানিয়া। সেখানকার এক হতদরিদ্র সংসারে প্রথম সাক্ষর পাঞ্চালী নস্কর। স্বপ্ন ছিল, স্কুলের শিক্ষক হবে। সে স্বপ্ন ভেঙে যেতে সময় লাগেনি। কারণ, গত বছর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তিই হতে পারেনি সে। বাড়ি থেকে নিকটতম কলেজের দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। যাতায়াতের ভাড়াই মাসে হাজার টাকা। পাঞ্চালীর আক্ষেপ, “কে দেবে বাসভাড়ার টাকা? বই-খাতা কেনা, কলেজ ফি কুলোনই মুশকিল। এখন বাড়ির কাজ করি। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন আমাদের দেখতে নেই। ”
এই গ্রামেরই নিমাই সর্দার কোনও মতে টাকা জোগাড় করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু দূরত্বের কারণে পড়া ছেড়ে দিতে হয় তাকে। আবু ছালাম মোল্লা, অশোক মণ্ডলরা আবার নিকটতম কলেজে সুযোগ না পেয়ে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে, দক্ষিণ বারাসাত কলেজে। সপ্তাহে দু’এক দিনের বেশি কলেজে যেতে পারে না। “তিনবার গাড়ি বদল করে কলেজে যেতে হয়। দিনে খরচ ৭০ টাকার বেশি। কলেজ যেতে-আসতেই দিন শেষ। পড়ব কখন?” এলাকার বাসিন্দা প্রাক্তন শিক্ষক গোবিন্দ হালদার, বসুদেব পুরকাইতরা জানান, এখানকার উচ্চমাধ্যমিক-উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের অর্ধেকই প্রতি বছর পড়া বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

এই ছেলেমেয়েদের মুখ চেয়ে কলেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন এলাকার মানুষরা। ২০১২ সালে জয়নগরের বিধায়ক তরুণকান্তি নস্কর রাজ্য উচ্চশিক্ষা দফতরে চিঠি দিয়ে জয়নগর ২ ব্লকে একটি কলেজ তৈরির দাবি জানান। উচ্চশিক্ষা দফতর জানায়, স্থানীয় মানুষকেই নিয়মমাফিক প্রস্তাব ও নথি পাঠাতে হবে। সেই কাজ শুরুও হয়েছিল। ব্লকের মানুষদের আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘটিহারানিয়া গ্রামে একটি কনভেনশন করে প্রাথমিকভাবে ‘নলগোড়া- চুপড়িঝাড়া উন্নয়ন কমিটি’ গড়াও হয়। যেখানে আছেন সব দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

নির্ধারিত ছিল জমিও। চুপড়িঝাড়া মৌজার ৪৬ নম্বর দাগে একলপ্তে ১৬ বিঘা সরকারি খাস জমি রয়েছে। বাড়তি যা জমি (৯ বিঘে) এবং টাকা (রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে ন্যূনতম ১৫ লক্ষ টাকার স্থায়ী আমানত ও ৫ লক্ষ টাকার সাধারণ সঞ্চয়) দরকার, তা দিতেও রাজি এলাকার বাসিন্দারা।

বস্তুত ঘটিহারানিয়া গ্রামের এই জমিতে কলেজ গড়ার স্বপ্ন কয়েক দশক ধরে দেখে আসছেন এলাকাবাসী। তাই ওই জমি বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলি পাট্টা বিলি বা দখল করতে চাইলে বাধা দিয়ে এসেছে এলাকাবাসী। এই জমিতে কলেজ হলে তা জয়নগর ২,মথুরাপুর ২ ও কুলতলি ব্লকের প্রায় চল্লিশটি হাইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষে পৌঁছনো সহজ হবে।

জমি, টাকা, উৎসাহ, সবই আছে। এখন প্রয়োজন শুধু ‘নলগোড়া- চুপড়িঝাড়া উন্নয়ন কমিটি’-র নাম রেজিস্ট্রি করার। পথ আটকে দাঁড়াচ্ছে ‘তুই আগে না মুই আগে’ রাজনীতি।

উন্নয়ন কমিটির সভাপতি কুলতলির সিপিএম বিধায়ক রামশঙ্কর হালদার, সম্পাদক গোবিন্দ হালদার। তিনি এসইউসিআই নেতা। সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন তৃণমূলের স্থানীয় এক যুব নেতা গৃহশিক্ষক সুব্রত মাল। আর এক যুব তৃণমূল নেতা দীপক ঘোষও কমিটির সদস্য। কিন্তু নাম নেই তৃণমূলের ব্লক সভাপতি গোপাল মাঝির।

তৃণমূলের গোঁসা সেখানেই। স্থানীয় তৃণমূল নেতা আবু তালেব শেখ স্পষ্টই বলেন, “আমরা শাসক দল। গড়লে আমরাই কলেজ গড়ব। অথচ আমাদের নেতার নাম নেই। এটা অপমান।’’ তাঁর ক্ষোভ, কমিটি গড়া নিয়ে গোপালবাবুর সঙ্গে কোনও আলোচনাই করা হয়নি। তাই দলের নেতৃত্ব নির্দেশ দিয়েছেন, ওই কমিটির সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে। কিন্তু সুব্রতবাবু তো আছেন? আবু তালেবের বক্তব্য, কমিটিতে থাকার জন্য তিনি দলীয় অনুমোদন নেননি।

গোবিন্দবাবুদের যুক্তি, কাজের সুবিধার জন্য স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবেই তাঁদের কমিটিতে রাখা হয়েছে। তা নিয়ে এত জটিলতা হবে, তাঁরা বোঝেননি। কমিটির সদস্যদের বক্তব্য, কলেজ গড়ার জন্য তাঁরা শাসকদলের সঙ্গে আপসে যেতে চান। কিন্তু তার উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না।

তৃণমূলের চুপড়িঝাড়া অঞ্চল কমিটির সভাপতি আবেদ আলি হালদার দলীয় প্যাডে গোবিন্দবাবুকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তাঁদের ব্লক সভাপতিকে উন্নয়ন কমিটির সম্পাদক পদ না দিলে তাঁরা কমিটিতে থাকবেন না। বিধায়ক রামশঙ্করবাবু বলেন, “আমাদের একমাত্র চাহিদা, কলেজ হোক। কলেজের স্বার্থে আমি পদ ছাড়তে রাজি আছি।” তাঁর আক্ষেপ, কলেজ নির্মাণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পৌঁছে গিয়েছে।

গ্রামবাসী তো বটেই, কমিটির সদস্যরাও বিলক্ষণ জানেন, শাসক দলের সবুজ সঙ্কেত না পেলে কলেজ গড়ার উদ্যোগ মাঠে মারা পড়বে। এ বিষয়ে তাঁরা আপস করতে চাইলেও নানাভাবে তা এড়িয়ে যাচ্ছেন গোপালবাবু। তৃণমূলেরই একাংশের অবশ্য বক্তব্য, রাজনীতি চান না তাঁরাও। কিন্তু বিধানসভা ভোটের আগে কলেজ গড়ার কৃতিত্ব অন্য দলকে দিতে চাইছেন না তাঁরাও। আবার দলের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগকেও বিরোধীদের হাতের অস্ত্র হতে দিতে নারাজ তাঁরা।

গোপালবাবু বলেন, “ওরা নিজেদের মতো কমিটি গড়ে আমাদের কাছে প্রতিনিধি চেয়েছিল। এটা কি ঠিক? দলীয়ভাবে বসে ঠিক করব, ওই কমিটিতে থাকা যাবে কিনা।”

রাজনৈতিক ক্ষমতার এই টানাপড়েনে আরও কত পাঞ্চালী নস্কর, নিমাই সর্দারের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন মিলিয়ে যাবে, সেটাই দেখার।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy