বর্ষার বিকেলে কাদা মাঠে ফুটবল খেলছিল কয়েকটা ছেলে। জমে উঠেছিল বল কাড়াকাড়ির লড়াই। কিন্তু হঠাৎই থেমে যায় সব কিছু। মাঠে বাজ পড়ে। মারা যায় চার জন। তারপর থেকেই বাজের আওয়াজে চমকে ওঠে গোটা গ্রাম।
শরৎ এসেছে আপন নিয়মে। আজ, মহাসপ্তমী। বসিরহাট ও সন্দেশখালির নানা মণ্ডপে পঞ্চমী থেকেই ভিড় জমতে শুরু করেছে। কিন্তু পুজোর দিনগুলিতেও গোটা গ্রামকে তাড়া করছে শুধুই আতঙ্ক আর হা-হুতাশ।
সন্দেশখালির মেটেখালি পঞ্চায়েতের দক্ষিণ আখড়াতলা গ্রামে চলতি বছরের অগস্টের প্রথম সপ্তাহে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। মারা যায় শুভজিৎ সর্দার, মিঠুন সর্দার, অমিত সর্দার ও নারায়ন মুণ্ডা। আহত হন কয়েক জন। সেখানেই শেষ নয়। কয়েক দিন আগেই ফের বাজ পড়েছিল আদিবাসী অধ্যুষিত ওই গ্রামে। প্রাণহানি না হলেও সে বারেও ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এ সব কথা বলতে গিয়ে এখনও আতঙ্ক দানা বাঁধে গ্রামের বাসিন্দাদের। ‘‘চার-চারটি দামাল ছেলে। এক লহমায় শেষ হয়ে গেল!’’— আক্ষেপ করছিলেন গ্রামের পুরান মণ্ডল, ভারতী সর্দার, গৌরী সর্দারেরা। তাঁদের কথায়, ‘‘ওদের কেউ আমাদের দিদা, কেউ দাদু বলে ডাকত। ওদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতেও গিয়েছি। তাই এ বার দুর্গাপুজোতে আমাদের কোনও আনন্দ নেই। গ্রামের কেউই নতুন পোশাক কেনেননি।’’ গ্রামের কোথাও ঢাক-কাঁসির শব্দ নেই। বাজছে না মাইক। খুদেরাও চুপ করে গিয়েছে। ইছামতী নদী ঘেঁষা এই গ্রামের প্রাণস্পন্দনটাই যেন কেউ থামিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, অন্যান্য বছর গ্রামের ভিতর বড় বাজেটের পুজো হতো ফ্রেন্ডস ইউনিট ক্লাবে। পুজোর পরেও টানা কয়েক দিন নানা প্রতিযোগিতা, নাচ, গানের অনুষ্ঠান হতো। মেলা বসত। কিন্তু এ বার প্রায় সবই বন্ধ। ছোট একটি মণ্ডপে পুজো হচ্ছে। ক্লাবের সহ সভাপতি মিন্টা মণ্ডল বলেন, ‘‘বন্ধুদের মৃত্যুর পরে কী ভাবে আনন্দ করি বলুন? তাই পুজোর আচারটুকু বাদ দিয়ে উৎসবের বাকি সব বন্ধ রাখা হয়েছে।’’ রাস্তার পাশে মাটির দেওয়ালের উপর অ্যাসবেস্টস লাগানো একটি ঘরের সামনে গুলি খেলছিল কয়েকজন কিশোর। সে দিকে হাত উঁচিয়ে ওই গ্রামের বাসিন্দা সূর্যকান্ত সর্দার বলেন, ‘‘ওখানেই ত্রিপলের উপর পর পর চারটি নিথর দেহ শোয়ানো ছিল। নেতা-মন্ত্রী অনেকেই এসে আর্থিক সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু ছেলেগুলো তো ফিরল না।’’
মৃত শুভজিৎ সূর্যকান্তবাবুর ছেলে। শুভজিতের দিদি সুমিত্রা সর্দারের কথায়, ‘‘দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে ভাই খুব আনন্দ করত। কয়েক মাস আগেই ও আমাকে আবদার করে লাল-সবুজ জামা ও কালো প্যান্ট কিনে দিতে বলেছিল। কিন্তু সেই আবদার রাখতে পারলাম না।’’ রজনী এবং বিশ্রী মুন্ডার বড় ছেলে নারায়ণ সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। সে দিনের দুর্ঘটনা তারও প্রাণ নিয়েছিল। রজনীবাবু বলেন, ‘‘মনে আনন্দ নেই। ঘর থেকে বেরোতেই ভাল লাগে না। আমাদের কাছে দুর্গাপুজো মলিন হয়ে গিয়েছে।’’ ঘটনার দিন মাঠে ছিলেন শিবু মুন্ডা। আহত হলেও প্রাণে বেঁচেছেন। বললেন, ‘‘ঘুমের মধ্যেও বাজের আওয়াজ শুনে বার বার চমকে উঠি।’’ বিদ্যুতের এক ঝলকানিই নির্বাক করিয়ে দিয়েছে গ্রামকে।