ডাকাতির ঘটনায় মহিলা ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। সংবাদপত্রে তাঁর বয়ানও ছাপা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, মুখোশ পরা দুষ্কৃতী তার গলায় ধারাল অস্ত্র ধরেছিল। তাকেই ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতার করল পুলিশ। জানা গিয়েছে, মুখ ঢাকা সেই দুষ্কৃতী মহিলার স্বামী। ধরা পড়েছে সে-ও।
পুলিশের দাবি, স্বামী-স্ত্রী ছক কষেই শনিবার বিকেলে অপারেশন চালিয়েছিল বনগাঁ শহরে একটি ঋণ দান সংস্থার অফিসে। বনগাঁর ‘বান্টি-বাবলি’র ঘটনা সামনে আসায় কম বিস্মিত নন তদন্তকারী অফিসারেরা। মহিলার সঙ্গে ছিল তার ন’বছরের ছেলে। পুলিশের অনুমান, সঙ্গে ছোট ছেলে থাকায় পুলিশ কোনও ভাবেই সন্দেহ করবে না, এমনটাই ছিল ছক।
এত ফন্দি শেষমেশ খাটল না। মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ গাইঘাটার ঢাকুরিয়ায় ওই দম্পতির বাড়িতে হানা দিয়ে একটি কুয়ো থেকে প্রচুর সোনার গয়না উদ্ধার করে। একটি বস্তার মধ্যে গয়না ও ইট ভরে কুয়োর জলে ফেলে রাখা হয়েছিল। ঘরে রাখা বাজার করা ব্যাগ থেকে কিছু গয়না ও টাকা মিলেছে। সোনা বন্ধক রেখে ঋণদানকারী সংস্থাটির দাবি, ৬৫ লক্ষ টাকার গয়না এবং ২ লক্ষ টাকা লুঠ হয়েছিল। পুলিশ অবশ্য এ দিন যে গয়না, টাকা উদ্ধার করেছে, তার পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলেই মনে করছে। সে ক্ষেত্রে বাকি গয়না-টাকা কোথা থেকে এল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এত সবের পরে মহিলার অবশ্য দাবি, ‘‘বিশ্বাস করুন, আমি বুঝতে পারিনি যে ডাকাতি করেছে, সে আমার স্বামী। কারণ, ওর তো মুখ ঢাকা ছিল!’’
বনগাঁ শহরের মতিগঞ্জ ওই অফিসটি থেকে সোনা জমা নিয়ে ঋণ দেওয়া হয়। পুলিশ জানায়, রূপালি ঘোষ ও তার স্বামী রতন ঘোষকে ডাকাতির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪ কেজি সোনার গয়না ও নগদ প্রায় তিন লক্ষ টাকা। উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘স্বামী-স্ত্রী ছক কষে ডাকাতির ঘটনা ঘটাচ্ছে, এমনটা আমরা খুব কমই দেখেছি। বনগাঁ থানার পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে। খোয়া যাওয়া গয়না, টাকাও উদ্ধার করেছে।’’ মঙ্গলবার বিকেলে ঘটনার তদন্তে বনগাঁ শহরে আসেন জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তরুণ হালদার। তিনি বলেন, ‘‘ধৃত দম্পতিকে বুধবার আদালতে তোলা হবে। কী কারণে ওই দম্পতি এমন করল, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।’’
ওই সংস্থার শাখা অফিসের কর্তা সজলকান্তি কর বলেন, ‘‘ওই ব্যক্তি বহু টাকা এখান থেকে ঋণ নিয়েছিল। প্রায়ই আসত। কখনও একা, কখনও পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। এমনটা ঘটাতে পারে বুঝতে পারিনি।’’
সম্প্রতি ঝাঁ চকচকে বাড়ি তৈরি করছিল রতন। তা ছাড়া, বিভিন্ন কারণে তার বাজারে প্রচুর টাকা দেনা ছিল। সে কারণেই ডাকাতির পরিকল্পনা করে বলে অনুমান পুলিশের। আদতে ওই যুবক বাংলাদেশি। কয়েক বছর আগে এ দেশে এসেছে। অতীতে রতন অন্য কোনও অপরাধে জড়িত ছিল কিনা, পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের অনুমান, অপরাধের অভিজ্ঞতা না থাকলে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একা এ ভাবে ডাকাতি করার বুকের পাটা থাকা সম্ভব নয়।
পুলিশ জানিয়েছে, রূপালি তার ন’বছরের ছেলেকে নিয়ে শনিবার বিকেল ৪টে নাগাদ ওই সংস্থার অফিসে ঢোকে। কাউন্টারে রসিদ জমা দিয়ে এক নিরাপত্তা কর্মীর সামনে গিয়ে বসে। ওই নিরাপত্তা কর্মীর সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তাও হয় তার। সে সময়ে অন্য এক মহিলাও সেখানে ঢোকেন। রূপালি-সহ সংস্থার অফিসে তখন মোট সাত জন ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, সংস্থার অফিসে ঢোকার সময়ে রূপালিকে মোবাইলে কথা বলতে দেখা গিয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে, অফিসে ঢুকে রূপালি সব কিছু দেখে-শুনে নীচে থাকা তার স্বামীকে মোবাইলে খবর দেয়।
অফিসে ঢোকার আগে রতন মুখোশ পরে নেয়। পরনে ছিল কালো প্যান্ট এবং ফুলহাতা জামা। অফিসে ঢুকেই সে এক নিরাপত্তা কর্মীর পেটে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকায়। সকলকে একটি দিকে নিয়ে আসে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে। তার কাছে থাকা লঙ্কার গুঁড়োও ছিটিয়ে দেয় সকলের দিকে। তারপর সংস্থার এক কর্মীকে ভল্টের দিকে নিয়ে গিয়ে ভল্ট খুলিয়ে সোনার গয়না এবং নগদ টাকা নিয়ে পালায়। গোটা ঘটনাটা ঘটে মিনিট সাতেকের মধ্যে।
বনগাঁ থানা সূত্রে জানান হয়েছে, ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ সংস্থার অফিসে উপস্থিত সাত জনকেই সন্দেহের তালিকায় রেখেছিল। তবে কাউকে আটক করা হয়নি। কিন্তু সকলের পিছনে পুলিশ ‘সোর্স’ লাগায়। সিসিটিভির ফুটেজ থেকে পুলিশ জানতে পারে, রূপালি অফিসে ঢুকে দু’বার ফোন করেছে কাউকে। রূপালির কললিস্ট ঘেঁটে জানা যায়, দু’বারই স্বামী রতনকে ফোন করেছিল রূপালি। তদন্তে নেমে পুলিশ আরও জানতে পারে, ওই দম্পতি সোমবার হাবরায় গিয়ে নগদ ২ লক্ষ টাকা দিয়ে এক জোড়া সোনা বাঁধানো পলা কিনেছে। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। এরপরেই মঙ্গলবার ওই দম্পতির বাড়িতে তল্লাশি চালাতে হাজির হয় পুলিশ। উদ্ধার গয়না, টাকা। গ্রেফতার করা হয় দু’জনকে। তাদের ছেলেকে আপাতত ‘নিরাপদ আশ্রয়’-এ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।