শান্তিবৈঠকে বসতে চলেছে আমেরিকা এবং ইরান। শনিবার (স্থানীয় সময় অনুযায়ী) ইসলামাবাদে বৈঠক হওয়ার কথা। সেই বৈঠকে যোগ দেবেন আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। তবে শান্তিবৈঠক শুরুর আগেই ‘বেঁকে’ বসেছে ইরান। দাবি, তাদের দেওয়া শর্ত পূরণ না-হলে কোনও আলোচনাই হবে না আমেরিকার সঙ্গে। সেই শর্তের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ভাবে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি রয়েছে। এ ছাড়াও, তেহরানের তরফে জানানো হয়েছে, তাদের বাজেয়াপ্ত করা সম্পদ অবিলম্বে ছেড়ে দিতে হবে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় (ভারতীয় সময়) ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহম্মদ বাকের ঘালিবাফ এক্স পোস্টে শর্তগুলির কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি লেখেন, ‘দু’পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক ভাবে সম্মত হওয়া দু’টি পদক্ষেপ বা শর্ত এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। লেবাননে যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনা শুরুর আগে ইরানের বাজেয়াপ্ত সম্পদ ছেড়ে দেওয়া।’ তিনি স্পষ্ট করেন, আলোচনা শুরুর আগে অবশ্যই এই দু’টি বিষয় পূরণ করতে হবে।
একই সুর শোনা গিয়েছে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির কণ্ঠেও। তিনি বলেছেন, আমেরিকাকে অবশ্যই তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে হবে। সেই প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে লেবাননের বিষয়টি। আরাঘচি মনে করান, লেবাননের উপর ইজ়রায়েল যে হামলা শুরু করেছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। ইরানের হুঁশিয়ারির পর শান্তিবৈঠকে আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ভান্স-বার্তা
ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ভান্স ইরানকে বার্তা দেন। এয়ার ফোর্সের বিমানে ওঠার আগে ভান্স বলেন, ‘‘আমরা আলোচনার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। আমি মনে করি, ইতিবাচক আলোচনা হবে।’’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য উল্লেখ করে ভান্স এ-ও বলেন, ‘‘যদি ইরানিরা সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনা করতে চান, তবে আমরা অবশ্যই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তাঁরা যদি আমাদের সঙ্গে খেলতে চান, তবে ফল ভুগতে হবে।’’
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি
ভান্স ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পরই ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে এক বাক্যের একটি পোস্ট করেন। সেই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পুনর্গঠন!’ কূটনৈতিক মহলের মতে, ট্রাম্প ইসলামাবাদের আলোচনার মাধ্যমে নতুন করে কিছু গঠনের আশা প্রকাশ করেছেন। তবে একই সঙ্গে হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রাখলেন ট্রাম্প। আলোচনা শুরুর আগে নিউ ইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি ইসলামাবাদের আলোচনা ফলপ্রসূ না-হয় তবে ইরানের উপর হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলি। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা সব কিছু নতুন করে শুরু করছি। আমরা জাহাজগুলিতে সেরা অস্ত্র এবং বারুদবোঝাই করছি। আমরা আগে ওদের বিরুদ্ধে যা ব্যবহার করেছিলাম, এগুলি তার চেয়েও উন্নত। যদি কোনও চুক্তি না-হয় তবে আমরা সেগুলি ব্যবহার করব।’’ পরে আরও একটি পোস্ট করেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ‘তোলাবাজি’ ছাড়া ইরানের হাতে আর কোনও ‘তাস’ নেই। পোস্টে লেখেন, ‘ইরানিরা বুঝে পারছেন না যে, আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহার করে বিশ্বের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদী তোলাবাজি ছাড়া আরও পথ নেই।’ তার পরেই ট্রাম্পের হুমকি, ‘আজও তারা টিকে আছে শুধু আলোচনা করার জন্য়ই।’ অর্থাৎ, ইসলামাবাদের বৈঠক ফলপ্রসূ না-হলে আবার ইরানের উপর হামলা চালানো হবে, তা বার বার বুঝিয়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প।
আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা ইসলামাবাদে
ইসলামাবাদে আলোচনার টেবিলে বসতে চলেছে আমেরিকা এবং ইরান। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান। শনিবার দুই বিবদমান দেশের বৈঠকে বসার কথা। কিন্তু তার আগেই ইসলামাবাদ যেন নিরাপত্তার দুর্গে পরিণত হয়েছে। গোটা ইসলামাবাদকে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মুড়ে ফেলা হয়েছে। আমেরিকা এবং ইরানের সমঝোতা বৈঠক কোন দিকে মোড় নেবে, সে দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। বৈঠক কি ফলপ্রসূ হবে, না কি ভেস্তে যাবে, তা নিয়ে ক্রমশ উত্তেজনার পারদ চড়ছে।
আরও পড়ুন:
হরমুজ়-সঙ্কট
হরমুজ় প্রণালী গোটা বিশ্বের অর্থনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক। বিশ্বের মোট খনিজ তেলের এক পঞ্চমাংশ এই জলপথে যাতায়াত করে। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ বাহিনীর হামলার পর হরমুজ় প্রণালী প্রায় সব দেশের জন্যেই বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। রিপোর্টে দাবি, আমেরিকার সঙ্গে দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে তারা রাজিই হয়েছে দিনে অনধিক ১৫টি জাহাজের শর্ত দিয়ে। বলা হয়েছে, এই ১৫টি জাহাজের গতিবিধিও ইরানের কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নিয়ন্ত্রিত হবে। এবং তার জন্য দিতে হবে শুল্কও। অনেকের মতে, ইসলামাবাদের বৈঠকে সেই বিষয়টিও উঠবে। এই শুল্ক নিয়েই বার বার ইরানকে নিশানা করছেন ট্রাম্প।
এ ছাড়াও, ইরানের আর শর্ত ছিল বিদেশে তাদের যত সম্পত্তি আটকে রাখা হয়েছে, সেগুলিকে মুক্ত করতে হবে। শান্তিবৈঠক শুরুর আগে ইরান কর্তৃপক্ষ সে বিষয়টি মনে করিয়ে দিলেন আমেরিকাকে। একই সঙ্গে লেবাননে যুদ্ধবিরতির কথা বলেছেন। উল্লেখ্য, যুদ্ধবিরতিতে আমেরিকাকে সমর্থন করলেও ইজ়রায়েল স্পষ্ট করে দেয়, লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখবে তার। বুধবার সংঘর্ষবিরতি ঘোষণার পরও অশান্ত হয়ে রয়েছে লেবানন। সে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইজ়রাল হামলা চালাচ্ছে। অনেকের মৃত্যুও হয়েছে। তা নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করেছে ভারতও। ইসলামাবাদের বৈঠকের আগে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার বিষয় উল্লেখ করল ইরান।