Advertisement
E-Paper

স্বামী-মেয়েকে হারিয়েও ব্যবসা চালান উর্মিলা

কেউ বাবা, কেউ স্বামী, কেউ সন্তানকে হারিয়েছেন। তবু বাজি কারখানার মরণ ফাঁদের বাইরে গিয়ে বাঁচার পথ পাননি ওঁরা। ২০০৩ সালে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নিজের বাড়িতেই বাজি বিস্ফোরণে মারা যান মথুরাপুর থানার অন্ধমুনিতলার উদয় বৈরাগী ও তাঁর মেয়ে-সহ ৪ জন। বাড়ির উঠোনে সেখানে আজও তৈরি হচ্ছে বাজি। কাজ করছেন পরিবারের লোকজন। কিছু কর্মীও আছেন।

অমিত কর মহাপাত্র

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০১৫ ০৩:২১

কেউ বাবা, কেউ স্বামী, কেউ সন্তানকে হারিয়েছেন। তবু বাজি কারখানার মরণ ফাঁদের বাইরে গিয়ে বাঁচার পথ পাননি ওঁরা।

২০০৩ সালে বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নিজের বাড়িতেই বাজি বিস্ফোরণে মারা যান মথুরাপুর থানার অন্ধমুনিতলার উদয় বৈরাগী ও তাঁর মেয়ে-সহ ৪ জন। বাড়ির উঠোনে সেখানে আজও তৈরি হচ্ছে বাজি। কাজ করছেন পরিবারের লোকজন। কিছু কর্মীও আছেন।

ভয় করে না?

সে দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হরেকৃষ্ণ হালদার বেঁচে গিয়েছিলেন অল্পের জন্য। সেই তিনিই ওই একই বাজি কারখানায় বসে বললেন, “জীবনের ঝুঁকি আছে বলে ভয় তো লাগেই। তবে আগের মতো ঝুঁকির কাজ এখন বন্ধ। রাজনৈতিক দল, দুষ্কৃতীরা অনেকেই বোমা চায়। তবে আমরা না বলে দিই।” পশ্চিম মেদিনীপুরের ব্রাহ্মণবাড়ের ঘটনা নিয়ে নতুন করে আর কিছু ভাবার নেই, বোঝা গেল কথাবার্তা বলে।

নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে, কিছু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ শব্দবাজি, ছোটো বোমা সবই তৈরি হয় এই সব কারখানায়। অনেক ক্ষেত্রে কর্মী ও কারিগরেরা গিয়ে বরাতদাতাদের আশ্রয়ে থেকে ‘কাজ’ তুলে দিয়ে আসেন। অর্ডার ধরেন কারখানার মালিকেরা। তবে এ সব কথা স্বীকার করতে রাজি নন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কেউই।

“বাড়ির সকলেই বাজির কাজ করি। যার যা কাজ জানা আছে, সে তাই করবে। কপালে মৃত্যু থাকলে হবে। পেট তো চালাতে হবে।” —উর্মিলা বৈরাগী।

মৃত উদয় বৈরাগীর ছেলে সুদর্শন এখন ব্যবসা দেখেন, কাজও করেন নিজের হাতে। তাঁর দাবি, অন্য ব্যবসা করেও চলেনি। তা ছাড়া, এখন বাজি মজুত রাখা হয় না। ফলে ভয়ের আশঙ্কা কম থাকে। স্বামী-কন্যা হারানো উর্মিলাদেবী বলেন, “আমরা বাড়ির সকলেই কাজ করি। যার যা কাজ জানা আছে, সে তাই করবে। কপালে মৃত্যু থাকলে হবে। পেট তো চালাতে হবে।”

বেশি দিন নয়। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগের ঘটনা। বাড়ি থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরে পুজোর আগে বাজি কারখানায় ব্যাপক বিস্ফোরণ। মৃত্যু হয় ৬ জনের। যার মধ্যে কারখানার মালিক জগন্নাথ মণ্ডলও ছিলেন। বাকি পাঁচ জন কর্মী। ক্ষতিগ্রস্ত কারখানার পাশেই আরও একটি কারখানা গড়ে একই ব্যবসা চালাচ্ছেন তাঁর একমাত্র ছেলে অভ্রেন্দু। সঙ্গে কাজ করেন স্ত্রী ইন্দুমতী। ছ’মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে অবলীলায় বললেন, “যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। ভেবে কী করব! এই করেই খেতে হবে।” ওই ঘটনায় ঝলসে গিয়েছিলেন অভ্রেন্দু নিজেও। বাবার মৃত্যু ও নিজের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পরেও নিজের হাতে কাজ করে ওই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। বললেন, “ এটাই আমাদের পেশা। ছেলেবেলা থেকে বাবা নিজের হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছিলেন। ছাড়তে পারি না। বাবার নিজস্ব খরিদ্দার, মহাজন, লোকের চাহিদা বরং বেড়েছে।”

রায়দিঘি থানার কৌতলা গ্রামের আদকপাড়ার ওই কারখানার কর্মী প্রৌঢ় অরবিন্দ সামন্ত বলেন, “ছেলেবেলা থেকে কাজ করছি। নেশার মতো হয়ে গিয়েছে। আগে অনেক দুঃসাহসিক কাজ করেছি বিভিন্ন জেলায় গিয়ে।”

বাজি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কাঁচা টাকার লোভে এই সব কারখানায় কিছুটা কাজ শিখে অনেক কর্মী গোপনে নিষিদ্ধ বাজি তৈরি করছে। পৃথক কারখানাও খুলেছে। সারা বছর ধরে এই ব্যবসা এতটাই লাভজনক যে, বাজি কারখানার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

কৌতলার দাসপাড়া গ্রামের বাজি কারখানার মালিক কপিল পুরকাইতের বাড়ি-লাগোয়া কারখানায় আগুন লাগে ২০০৭ সালে। সে বার আর্থিক ক্ষতি হলেও প্রাণহানি হয়নি। কারখানা সরিয়ে এনেছেন মাঠে। নিজে কারিগর। পেশায় যুক্ত করেছেন ছেলে তনয়কে। বাপ-ব্যাটার কথায়, “যে কোনও কাজেই ঝুঁকি আছে। ঝুঁকি না নিলে পেটের ভাত জোগাড় হবে কী করে?”

পুলিশের একটি সূত্র জানাচ্ছে, ওই একটি মাত্র কারখানার ব্যাবসার লাইসেন্স আছে। বাকিগুলিতে মাঝে মধ্যে নজরদারি চালানো হয়। তবে নজরদারির নমুনা যে কী, তা বিলক্ষণ জানেন স্থানীয় মানুষ। বেআইনি ব্যবসার বিরুদ্ধে কেউ সরসারি মুখ খুলতে সাহস পান না। তবে অনেকেরই অভিযোগ, পুলিশের মদত না থাকলে এই ব্যবসা চলতেই পারত না। বলাইবাহুল্য, এমন অভিযোগ মানতে নারাজ পুলিশ।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy