E-Paper

‘পড়তে চাই’, বালিকার আর্জি শুনে স্কুলে ফেরালেন গ্রামবাসী

আউশগ্রামের দ্বারিয়াপুরের বাসিন্দা রূপা দাস সুশীলা যজ্ঞেশ্বর পাবলিক ইনস্টিটিউশনে ষষ্ঠ শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৬
রূপা দাস। নিজস্ব চিত্র

রূপা দাস। নিজস্ব চিত্র

বাড়ির সামনে দিয়ে অন্য পড়ুয়ারা যখন স্কুলে যেত, বছর বারোর মেয়েটি তখন কোনও দিন উনুনে ভাত বসিয়েছে, কখনও আগলাচ্ছে ছোট ভাইকে। ওই পড়ুয়াদের পিছু পিছু তার মনও ছুটত স্কুলের দিকে। কিন্তু উপায় ছিল না। বাবা-মা খরচ জোটাতে না পারায়, স্কুলছুট হয়েছিল সে। দিন কয়েক আগে স্থানীয় সুস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক কর্মীর কাছে কেঁদে ফেলে মেয়েটি জানায়, সে স্কুলে যেতে চায়। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামে সে খবর জানাজানি হতে, ওই ছাত্রীকে স্কুলে ফেরানোর ব্যবস্থা করলেন গ্রামবাসী।

আউশগ্রামের দ্বারিয়াপুরের বাসিন্দা রূপা দাস সুশীলা যজ্ঞেশ্বর পাবলিক ইনস্টিটিউশনে ষষ্ঠ শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু গত বছর নতুন ক্লাসে তাকে আর পাঠাননি বাবা-মা সঞ্জয় ও সন্তোষী। তাঁরা দু’জনই দিনমজুর। বাড়ির নানা কাজ, চার বছরের ভাইয়ের দেখাশোনা করেই এক বছর কেটেছে রূপার। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী বনলতা গোস্বামী জানান, তিনি সুযোগ পেলেই এলাকার মেয়েদের খোঁজ নেন। এক দিন রূপার কাছে জানতে চান, সে স্কুলে যায় কি না। বনলতার কথায়, ‘‘প্রশ্ন শুনে কেঁদে ফেলে রূপা। জানায়, স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি বাবা-মা।’’ এর পরেই এক আশা কর্মীকে নিয়ে তিনি রূপারবাড়ি যান।

সন্তোষী জানান, স্বামী-স্ত্রীর আয়ে কোনও মতে সংসার চলে। মেয়েকে স্কুলে ভর্তির প্রায় আড়াইশো টাকা জোগাড় করতে পারেননি। সন্তোষীর কথায়, ‘‘শুধু ফি নয়, বইপত্র, যাতায়াত-সহ নানা খরচ আছে। আমাদের সামর্থ্য নেই। তাই মেয়ের ইচ্ছে থাকলেও, পড়াতে পারিনি।’’ বনলতা বিষয়টি জানান স্থানীয় ক্লাবের কর্তা দেবাঙ্কুর চট্টোপাধ্যায়কে। এর পরেই ওই ক্লাবের সদস্যেরা-সহ গ্রামের কয়েক জন এগিয়ে আসেন। ১৬ জানুয়ারি তাঁরা রূপাকে আবার স্কুলে ভর্তি করেন। ১৯ জানুয়ারি থেকে স্কুলে যাচ্ছে সে। দেবাঙ্কুর বলেন, ‘‘ব্যাগ, বইপত্র-সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দেওয়া হয়েছে রূপাকে। প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের স্কুলে যাতায়াতের টোটো ভাড়াও দেওয়া হচ্ছে।’’

শিক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, পূর্ব বর্ধমানে পঞ্চম-অষ্টম শ্রেণিতে স্কুলছুটের হার ০.৮ শতাংশ। জেলার সহকারী স্কুল পরিদর্শক অতনু হাজরা বলেন, “কোনও পড়ুয়া যদি টানা দিন পনেরো স্কুলে না আসে, বাড়ি গিয়ে খোঁজ নেওয়া হয়। কেউ আর্থিক কারণে ভর্তি হতে না পারলে, ফি ছাড়াই ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে।” ওই ছাত্রী চাইলে নিখরচায় হস্টেলে রেখে পড়ানোর ব্যবস্থা হবে, আশ্বাস তাঁর।

রূপার স্কুলের প্রধান শিক্ষক জয়দীপ দাস বলেন, “স্কুলে না আসায়, আমরা মেয়েটির বাড়ি গিয়েছিলাম। কিন্তু কারও দেখা পাইনি। ভেবেছিলাম, হয়তো অন্যত্র চলে গিয়েছে ওরা।’’ বিডিও (আউশগ্রাম ১) বিমান কর বলেন, “মেয়েটির ইচ্ছাশক্তি ও গ্রামবাসীর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। ব্লক প্রশাসন সর্বতো ভাবে মেয়েটির পাশে থাকবে।’’

রূপা জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কুল থেকে পাওয়া পোশাক সযত্নে রেখে দিয়েছিল সে। আশা ছিল, স্কুলে ফিরবেই। সেই পোশাক পরে স্কুলে যাওয়ার পথে রূপা বলে, ‘‘বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা, খেলাধুলো করার আনন্দ কতটা, বলে বোঝাতেপারব না!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Ausgram

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy