পাঁচ বছর আগের ঘটনা। মালদহে দলীয় বৈঠকে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা ফেরার জন্য হেলিকপ্টারে উঠবেন, তার আগে শেষ বারের মতো বোঝালেন দুই যুযুধান নেতানেত্রী সাবিত্রী মিত্র ও কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরীকে। দলীয় কর্মীরা এখনও বলেন, দলনেত্রীর কপ্টার চোখের আড়াল হওয়ার শুধু অপেক্ষা, তার পরে ফের একে অন্যের বিরুদ্ধে বিবৃতি-যুদ্ধে নেমে পড়েন সাবিত্রী-কৃষ্ণেন্দু।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের এই ভাইরাস করোনা সংক্রমণের মতোই এখন উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ঘরে ঘরে। তার ফলে ‘বেসুরে’ বাজছেন অনেক নেতাই। কেউ কেউ চলে গিয়েছেন বিজেপি শিবিরে। কিছু দিনের মধ্যে শুভেন্দু অধিকারী প্রচারে আসবেন। তখন ভাঙন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে দলে। ঠিক তার আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গে এসে বৈঠক করে গেলেন শিলিগুড়ি, জলাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারের নেতাদের সঙ্গে। বেসুরো ছাড়াও ‘উপসর্গহীন’ কারা রয়েছেন দলে, তা-ও খোঁজার চেষ্টা করলেন— জানাচ্ছেন স্থানীয় নেতারাই। তবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটানোই ছিল তাঁর সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। দল সূত্রে খবর, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই জট কাটাতে অভিষেকের দাওয়াই, যুযুধান নেতাদের মুখোমুখি বসিয়ে দেওয়া। তাঁদের প্রতি অভিষেকের বার্তা: এ বারেও তৃণমূলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তাই যত দ্রুত সম্ভব দ্বন্দ্ব মিটিয়ে দলের কাজে নামুন। তাতে জয় তরান্বিত হবে।
৪ জানুয়ারি শিলিগুড়ি আসেন অভিষেক। সেখানে দলীয় বৈঠক করার পরে এক দিন আলিপুরদুয়ার, এক দিন জলপাইগুড়ি গিয়ে বৈঠক করেছেন। ৭ তারিখ দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে জনসভা করেন তিনি। এবং শুক্রবার কলকাতা ফিরে যান।
দ্বন্দ্বের রকমারি চেহারা দেখেছেন অভিষেক নিজেও। যেমন, দল সূত্রে খবর, বুধবার চালসার বৈঠকে ময়নাগুড়ি ২ ব্লকের ব্লক সভাপতি শিবশঙ্কর দত্ত এবং প্রাক্তন সভাপতি শশাঙ্ক রায় বাসুনিয়া ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। শিবশঙ্করকে অভিষেক নির্দেশ দেন, পরদিন ঘুম থেকে উঠেই তিনি যেন শশাঙ্কের বাড়িতে গিয়ে বৈঠকে করেন। আবার আলিপুরদুয়ারের কালচিনির বিধায়ক মোহন শর্মা অভিষেকের সামনেই ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেন জেলার কো অর্ডিনেটর পাসাং লামাকে। তৃণমূল সূত্রের খবর, অভিষেক দু’জনের কাউকেই দায়িত্ব থেকে সরাননি। বরং গোর্খা ভোট দলে আনতে দুজনকেই একসঙ্গে দায়িত্ব দিয়েছেন। দুজনকে বৈঠকে বসতে নির্দেশ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি অভিষেক ‘বেসুরো’ মোহন বসুর (টানা ১৭ বছর তিনি জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান) মতো কাউকে কাউকে নিজের ফোন নম্বরও দিয়ে গিয়েছেন বলে দল সূত্রে খবর। মোহনের মুখে শোনা গিয়েছে, “এ দিনের বৈঠক দলের পক্ষে খুবই মঙ্গলের।”
দলকে জেতাতে ব্যক্তিগত লড়াই সরিয়ে রেখে যাতে সকলে একজোট হন, সে জন্য অভিষেক বৈঠকগুলিতে জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ বড় বা ছোট নয়। জলপাইগুড়ি মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী মহুয়া গোপের মতো অনেকেই উজ্জ্বল মুখে সে কথা বলছেন এখন। শশাঙ্ক বাসুনিয়া বৈঠক শেষে মুখে হাসি নিয়েই বলেছেন, “নির্দেশ পেলাম। সেই মতো কাজ করব। তাতে দল জিতলে জিতবে।”
কিন্তু এই ভাবে কি সব দ্বন্দ্ব মিটবে? প্রশ্ন রয়েছে দলের মধ্যেই। যেমন, ‘খুশি’ মোহন বসু জানিয়ে গিয়েছেন, তিনি শুধু মমতার কথাই শুনবেন, জেলা তৃণমূল সভাপতি কৃষ্ণকুমার কল্যাণীর ডাকে সাড়া দেবেন না। আলিপুরদুয়ারের এক তৃণমূল বিধায়কের কথায়, “ভালই হল, তবে দেরি হয়ে গিয়েছে। বছরখানেক আগে শুরু হলে ফল বেশি ভাল মিলত।’’