নির্বাচনে সার্বিক ‘অনিয়মে’র অভিযোগ জাতীয় স্তরে নিয়ে যেতে চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে বৃহস্পতিবার এই বার্তাই দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। এবং এই কর্মসূচিকে সামনে রেখে কংগ্রেস-সহ ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চকে শামিল করার প্রস্তুতিও শুরু করেছেন তাঁরা। সেই সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার দলীয় কর্মীদের সাহায্য করা নিয়েও এই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
ফল প্রকাশের ১০ দিন পরে ফের এক দফায় দলীয় স্তরে আলোচনায় বসেছিলেন তৃণমূল নেত্রী। কালীঘাটের ওই বৈঠকে এ দিন ছিলেন দলের রাজ্যসভা ও লোকসভার সাংসদেরা। তবে সূত্রের খবর, দুই কক্ষেরই বেশ কয়েক জন সাংসদ অনুপস্থিত ছিলেন বৈঠকে। সেখানেই ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লিতে কোনও কর্মসূচি নেওয়ার কথা তোলেন দলের আইজীবী-সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা সাম্প্রতিক অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে যে রকম ধর্না- অবস্থান করেছেন, সেই রকমই প্রতিবাদ কর্মসূচির কথা বলেন তিনি। মমতা তখন জানান, ‘এ ব্যাপারে আমরা প্রস্তুতি শুরু করেছি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) থেকে গণনা পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ ইত্যাদি বিষয়ে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের শরিকদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে’। ভবানীপুর কেন্দ্রে গণনার সময়ে তাঁকে মারধর করার কথা জানিয়ে নিজের হাতে কালশিটের দাগও দেখিয়েছেন তিনি।
নির্বাচন পরবর্তী এই বৈঠকে মূল বক্তা ছিলেন মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরুতে নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলের যাবতীয় অভিযোগের বিবরণ দিয়েছেন অভিষেক। সেই সূত্রেই ভোটের পরে বিভিন্ন জায়গায় ‘সন্ত্রাসে’র কথা উল্লেখ করে সাংসদদের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, যদি কোথাও আক্রান্তদের কাছে যাওয়া যায়, তা হলে যাওয়া উচিত। এবং প্রতিটি ঘটনার জন্য পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করে রাখা প্রয়োজন। এই প্রসঙ্গে সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল জানান, অনেক জায়গায় কর্মীরাই চাইছেন না, এখন কেউ তাঁদের কাছে যান। অভিষেক তখন বলেছেন, অনলাইনে অভিযোগ জানিয়ে রাখতে হবে। সেগুলি পরবর্তী সময়ে মামলার কাজে লাগবে। বৈঠকে উপস্থিত মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের বলেছেন, পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদে দল বদল করার প্রবণতা শুরু হয়ে গিয়েছে। সূত্রের খবর, অভিষেক বলেন, ‘এই রকম একটা আক্রমণের জন্য আমরা তৈরি ছিলাম না। তার মধ্যেও ৮০ আসনে জয় যথেষ্ট আশাপ্রদ। যাঁরা জিতেছেন, তাঁরা কঠিন লড়াই করেছেন।’
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘রাজ্যে ৪ মে-র পর থেকে বিজেপির পতাকা নিয়ে যাঁরা হামলা করতে যাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই বিজেপির লোক নন। আমাদের কোনও শ্রমিক বা ছাত্র সংগঠনও নেই। আর তৃণমূলের যে নেতারা এত দিন ‘ডিজে বানানো’র কথা বলে এলেন, তাঁরা কোথায়! শুধু দলের বৈঠকে বিবৃতি আর সংবাদমাধ্যমের সামনে অভিযোগ না-তুলে আক্রান্ত কেউ হয়ে থাকলে, তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান!’’
কালীঘাটে এ দিনের বৈঠকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন মমতা। সাংসদদের বৈঠকের শুরুতেই এ কথা জানিয়ে দেওয়া হয়। এই পদে এসেছেন কল্যাণ। প্রসঙ্গত, কল্যাণকে সরিয়েই কাকলিকে এই পদে এনেছিলেন মমতা। লোকসভায় পরিষদীয় দলের নেতা হিসেবে অভিষেক দায়িত্ব দেওয়ার সময়েই কাকলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দলের একাংশের ধারণা, ভোটের ফল প্রকাশের পরে দল নিয়ে সমাজমাধ্যমে কাকলির ছেলের একটি ‘পোস্ট’ ঘিরেই এ বারের এই বদল।
বৈঠকে আচমকাই কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলে ওঠেন, গণনার দিন লক্ষ্য করেছি, তৃণমূলের পুরনো কর্মীরা শেষ পর্যন্ত ছিলেন। কিন্তু ২০১১ সালের পরে যাঁরা দলে এসেছেন, তাঁরাই আগে গণনা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। মহুয়াকে থামিয়ে মমতা বলে দেন, ‘এ সব নিয়ে আলোচনার সময় এখন নয়’!
কালীঘাটেই আজ, শুক্রবার দলের পরাজিত প্রার্থীদের বৈঠকে ডেকেছেন মমতা। পাশাপাশি, আজই বিধানসভার স্পিকার নির্বাচনের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা তৃণমূলের নবনির্বাচিত বিধায়কদের। তবে আগের দিন পর্যন্ত পরিষদীয় দলের কোনও বৈঠক না-হওয়ায় কিছুটা বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন তাঁরা। বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সকলকে সময় মতো দলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।
বিধানসভায় এ দিন শপথ নিয়েছেন শোভনদেব, ফিরহাদ (ববি) হাকিম, কুণাল ঘোষ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, শিউলি সাহা, দীনেন রায়, সন্দীপন সাহা-সহ তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক। নির্বাচনী লড়াইয়ের পরে কুণালের সঙ্গে এ দিন মুখোমুখি দেখা হয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর। বিরোধী বিধায়ককে দেখে মুখ্যমন্ত্রী বলে ওঠেন, ‘‘জিতে গেলেন তো...!’ হেসে প্রতি নমস্কার জানিয়েছেন তৃণমূলের মুখপাত্রও।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)