তপসিয়ায় সরকারি বাস দুর্ঘটনাগ্রস্ত হওয়ার পর চাপ বেড়েছে রাজ্য পরিবহণ দফতরের উপর। ‘সার্টিফিকেট অফ ফিটনেস’ (সিএফ) না-থাকা অবস্থায় একটি সরকারি বাস রাস্তায় চলছিল এবং সেই বাসই দুর্ঘটনায় পড়ে উল্টে যায়। ঘটনার পর থেকেই পরিবহণ দফতর বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত সরকারি বাসগুলির উপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। পাশাপাশি সেই সব বাসের বর্তমান অবস্থা কী, কোথায় কোন বাস চলছে এবং কোনটির সিএফ বকেয়া রয়েছে, তার বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করেছেন পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী।
প্রশাসনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, ২০২৫-২৬ সাল পর্যন্ত কলকাতা ও শহরতলির রাস্তায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪০টি সরকারি বাস চলাচল করছে। এই বাসগুলি পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ নিগম বা ডব্লিউবিটিসি পরিচালিত। তবে এর মধ্যে একটি বড় অংশ পিপিপি মডেলে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা ঠিকাদারের মাধ্যমে চালানো ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এমন বাসের সংখ্যা আনুমানিক ২৫০টির কাছাকাছি। পরিবহণ দফতর এখন জানতে চাইছে, এই ২৫০টি বাসের মধ্যে কতগুলির সিএফ নবীকরণ করা হয়নি বা মেয়াদ উত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬-এর সকালে তপসিয়া মোড় এলাকায় হাওড়া থেকে কামালগাজি বা বারুইপুরগামী একটি সরকারি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, বাসটির একটি টায়ার ফেটে যাওয়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে পুলিশি তদন্তে সামনে আসে, ওই বাসটির সিএফ ২০১৭ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং দীর্ঘদিন ধরেই সেটি বৈধ ফিটনেস ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করছিল। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই পরিবহণ দফতরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ক্ষেত্রে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাসচালকের ভূমিকা সন্দেহের চোখে দেখছে পরিবহণ দফতর। তাদের একাংশের মতে, কোনও বাস রাস্তায় নামানোর আগে চালক সেই বাস প্রসঙ্গে অবগত থাকেন। ওই বাসের টায়ার যখন ভাল অবস্থায় ছিল না, তখন তা জানা সত্ত্বেও কেন ওই চালক বাস রাস্তায় নামানোর ঝুঁকি নিলেন? তাই ওই চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছেন পরিবহণ দফতরের আধিকারিকদের একাংশ।
আরও পড়ুন:
পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী বলেন, ‘‘যাত্রী পরিষেবার মান উন্নত করতে পিপিপি মডেলে বাস চালু করেছিল রাজ্য সরকার । যে সব বেসরকারি সংস্থা এই বাস চালানোর দায়িত্ব নিয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণ ও সিএফ নবীকরণের দায়িত্ব তাদেরই। কোনও বাসের সিএফ না থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্ট সংস্থার। তবে পরিবহণ দফতরের নিজস্ব ডিপোর অধীনে থাকা সরকারি বাসগুলির ক্ষেত্রে নিয়মিত ইঞ্জিনিয়ার ও আধিকারিকেরা পরীক্ষা করেন এবং সেখানে সিএফ ফেল থাকা বাস রাস্তায় নামার প্রশ্নই ওঠে না।’’
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে সব ডিপো ও বেসরকারি অপারেটরের কাছে কড়া নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। বাস চালানোর আগে টায়ার, ব্রেক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাগ্রস্ত বাসের চালকের ভূমিকা নিয়েও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবহণ দফতর। দফতরের আধিকারিকদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে প্রতিটি সরকারি ও পিপিপি বাসের সিএফ, বিমা ও রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য ডিজিটাল পোর্টালে আপডেট রাখার ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি ডিপো ও অপারেটরকে মাসিক ভিত্তিতে ফিটনেস রিপোর্ট জমা দিতে বলা হবে, যাতে কোনও বাস দীর্ঘদিন ধরে নথিপত্র ছাড়া রাস্তায় চলতে না পারে। একই সঙ্গে আকস্মিক পরিদর্শন ও রাস্তায় চলমান বাসের মোবাইল স্কোয়াডের মাধ্যমে ফিটনেস পরীক্ষা জোরদার করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষের তরফে। যাত্রী নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।