লোকসভা নির্বাচনে লড়াই হয়েছিল বামেদের হাত ধরে। তার পরেই ৬টি বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে একা লড়তে গিয়ে ফল হয়েছিল শোচনীয়। তারও পরে আবার কালীগঞ্জে বিধানসভা উপনির্বাচনে বামেদের সমর্থনে প্রার্থী দিয়ে আগের ৬টির চেয়ে তুলনায় ভাল ফল হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এ বার বিধানসভা নির্বাচনে একলাই চলতে চাইছে কংগ্রেস। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাঠানো নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে প্রদেশ কংগ্রেসের বৈঠকে অন্তত তেমনই ইঙ্গিত উঠে এল। এবং যা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল দলের অন্দরেই।
প্রদেশ কংগ্রেসের দফতর বিধান ভবনে রবিবার দলের নির্বাচন কমিটির বৈঠকে ছিলেন স্ক্রিনিং কমিটির সদস্যেরা। আর সোমবার প্রদেশ কংগ্রেসের পদাধিকারীদের সঙ্গে বৈঠক ছিল এআইসিসি-র সিনিয়র (নির্বাচনী) পর্যবেক্ষকদের। সূত্রের খবর, সিনিয়র পর্যবেক্ষক এবং কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সুদীপ রায় বর্মণ ওই বৈঠকে বলেছেন, সিপিএমের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট করা ‘ভুল’ হয়েছিল। ত্রিপুরায় বামেরা কংগ্রেসের ভোট নিয়েছে কিন্তু কংগ্রেসকে সে ভাবে ভোটারে বাক্সে সমর্থন করেনি। পশ্চিমবঙ্গেও একই রকম ভুল হয়েছে। সেই ‘ভুল’ সংশোধন করে কংগ্রেসের একা লড়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন সুদীপ। তাঁর আরও বক্তব্য ছিল, কংগ্রেসের প্রধান শত্রু বিজেপিই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে কোনও ভাবে ক্ষমতায় আসতে না-দেওয়ার লক্ষ্যে কংগ্রেসকে লড়তে হবে। সূত্রের খবর, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও বলেছেন, রাজ্যে একা লড়াই করার পক্ষেই মত ভারী। তবে সমঝোতা বা জোটের প্রশ্নে এআইসিসি যা বলবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তেমনই হবে। এআইসিসি-র তরফে রাজ্যে দলের পর্যবেক্ষক গুলাম আহমেদ মীর অবশ্য এই বিষয়ে মন্তব্য করেননি। তবে সিনিয়র পর্যবেক্ষকদের অনুরোধে বৈঠকে উপস্থিত পদাধিকারীদের মধ্যে বেশির ভাগ হাত উঠেছে একলা চলার পক্ষেই, বাম-জোটের পক্ষে তুলনায় হাত ছিল কম।
সুদীপদের এই সওয়ালের পরেই কংগ্রেসের অন্দরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন, এমন এক নেতা এ দিনের বৈঠকেই প্রশ্ন করেছেন— একা লড়ে রাজ্যে কোনও আসন জেতার দায়িত্ব দলের কোনও নেতা কি নিতে পারবেন? একা চললে কোন কোন আসনে কংগ্রেসের সম্ভাবনা আছে, এমন কোনও তালিকা আছে? গত লোকসভা ভোটের নিরিখে মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুরের যে বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে (১১টি মোট) কংগ্রেস এগিয়ে আছে, তার সবই বামেদের ভোট ধরে। দলীয় সূত্রের খবর, এমন প্রশ্নের উত্তরে এআইসিসি ও প্রদেশ নেতারা নীরবই ছিলেন।
কংগ্রেসেরই একাংশ মনে করাচ্ছেন, ত্রিপুরায় দল ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি ঘুরে আবার কংগ্রেসে ফিরে গত বিধানসভা নির্বাচনে আগরতলা কেন্দ্র থেকে সুদীপ নিজেই জিতেছেন সিপিএমের সমর্থনে। দ্বিতীয়ত, এই রাজ্যেও তৃণমূল তৈরির পরে কংগ্রেস প্রথম বার প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছিল এবং আব্দুল মান্নান বিরোধী দলনেতা হয়েছিলেন বামের সঙ্গে জোটের জোরে। তৃতীয়ত, সাম্প্রতিক কালে রাজ্যে একমাত্র বিধানসভা উপনির্বাচনে (সাগরদিঘি) কংগ্রেস জিততে পেরেছিল বামের সঙ্গে সমঝোতা করেই। তা হলে ‘ভুল সংশোধনে’র ভিত্তি কী! কংগ্রেসের এক নেতার আরও প্রশ্ন, ‘‘লোকসভা ভোটের পরে দলের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের সময়ে এক দিকে মুর্শিদাবাদে ‘বিক্ষুব্ধ রাজনীতি’কে মদত দেওয়া শুরু হয়েছে দলের মধ্যে। বামেদের সঙ্গে সমঝোতা হলে কংগ্রেস আসন জিততে পারে মূলত তিন জেলায় এবং তাতে পাছে অধীর চৌধুরী, ইশা খান চৌধুরীরা সব কৃতিত্ব পেয়ে যান, তাই কি নিজেদের নাক কেটে আমরা দলেরই একাংশের যাত্রাভঙ্গ করতে চাইছি?’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)