Advertisement
E-Paper

অপুষ্টি, লাল তালিকায় অঙ্গনওয়াড়ির ১০৭৫ শিশু

ওদের নামের পাশে লাল ঢ্যাঁড়া! এক, দু’জন নয়। একেবারে ১০৭৫ জনের! সকলেই শিশু। কারও বয়স পাঁচ, কারও দুই, কেউ বা এক বছরের।

নুরুল আবসার

শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:৫৮
রোহিত সর্দার। ৫ বছর ২ মাস। ওজন ১১ কিলো। স্বাভাবিকের চেয়ে দুই কিলো কম।

রোহিত সর্দার। ৫ বছর ২ মাস। ওজন ১১ কিলো। স্বাভাবিকের চেয়ে দুই কিলো কম।

ওদের নামের পাশে লাল ঢ্যাঁড়া!

এক, দু’জন নয়। একেবারে ১০৭৫ জনের! সকলেই শিশু। কারও বয়স পাঁচ, কারও দুই, কেউ বা এক বছরের।

নামের পাশে লাল ঢ্যাঁড়া পড়েছে ওদের স্বাস্থ্যের কারণে। তা দিয়েছে প্রশাসনই। কারণ সকলেই ভুগছে ‘মারাত্মক অপুষ্টি’তে।

ওই সব শিশুর দেখা মিলছে কলকাতার অপর পাড়ে, হাওড়া জেলায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ৯০ শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছে বলে প্রায়ই দাবি করেন, সেখানে গত জানুয়ারি মাসে শুধু হাওড়া জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের সমীক্ষাতেই উঠে এসেছে ১০৭৫টি শিশুর কথা। তাই তাদের ‘লাল’ তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ‘মারাত্মক অপুষ্ট শিশু’। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ওই রকম শিশু মিলেছে ডোমজুড় (১৯৪টি), সাঁকরাইল (১৭০টি) এবং উলুবেড়িয়া-২ ব্লকে (১১৮টি)।

উলুবেড়িয়া-২ ব্লকের জোয়াড়গড়িয়া পঞ্চায়েতের মধুবাটি সর্দার পাড়ায় গিয়ে দেখা গিয়েছে, ওই সব শিশুদের বেশিরভাগই থাকে ছিটেবেড়ার টালির চালের ঘরে। শিবানী সর্দার, তাই ভাই শিবনাথ এবং তাদের দাদা রোহিত ‘লাল’ তালিকাভুক্ত। তাদের ঘরে গিয়ে দেখা গিয়েছে, সেখানে একাংশ জুড়ে রয়েছে ‘ঢাড্ডা’ (জরির কাজ করার বিশেষ ধরনের কাঠের ফ্রেম)। সেখানে কাজ করেন শিবানী-শিবনাথদের বাবা তারকবাবু। বাড়ির চারদিকের পরিবেশ নোংরা। দুর্গন্ধে ভরা। শৌচাগার নেই। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ভরসা খোলা মাঠ। সকলে স্নান করেন সামনের পুকুরের নোংরা জলে। ছেলেমেয়েদের অপুষ্টির কথা বিলক্ষণ জানেন তারকবাবু। তিনি বলেন, ‘‘জরির কাজ করে যে টাকা পাই, তাতে সকলের ভাত-কাপড়ের সংস্থান করতেই নাকাল হচ্ছি। এরপর আবার পুষ্টিকর খাবার!’’

পাশেই মধুবাটি রায়পাড়া। লক্ষণ রায় ও তাঁর স্ত্রী প্রভার একমাত্র সন্তান কুশনের বয়স তিন ছুঁই ছুঁই। সে-ও ‘লাল’ তালিকাভুক্ত। তার বাবা চানা বিক্রি করেন। তিনিও বলেন, ‘‘যা রোজগার করি, তাতে সপ্তাহে একদিন মাছও জোটে না। ছেলেকে পুষ্টিকর খাবার দেব কী ভাবে?’’

গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের স্বাস্থ্য-শিক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগে শিশুবিকাশ প্রকল্পের মাধ্যমে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র চালানো হয়। ওই কেন্দ্রে ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের খিচুড়ি খাওয়ানো হয়। সপ্তাহে তিন দিন করে ডিম দেওয়া হয়। অপুষ্ট শিশুদের ডিম দেওয়া হয় প্রতিদিন। এ ছাড়া তাদের দেওয়া হয় স্বনির্ভর গোষ্ঠীর তৈরি করা ‘পৌষ্টিক লাড্ডু’ নামে বিশেষ ধরনের ছাতু। প্রতি মাসে শিশুদের ওজন নেওয়া হয়। বয়স অনুযায়ী একটি শিশুর কত ওজন হতে পারে, তার হিসাব করা চার্ট রয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের হাতে। যে সব শিশুর ওজন খুব কম, তারাই পড়ে ‘লাল’ তালিকায়। কোনও শিশুর যা ওজন হওয়া উচিত, তার কাছাকাছি থাকলে তারা পড়ে ‘হলুদ’ তালিকায়। সঠিক ওজনের শিশুদের ‘সবুজ’ তালিকাভুক্ত করা হয়।

হাওড়ায় যে ‘মারাত্মক অপুষ্ট’ শিশুর খোঁজ মিলেছে, তারা যে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে যায় না, এমন নয়। তা হলে কেন অপুষ্টি?

জেলা সমাজকল্যাণ দফতরের কর্তাদের দাবি, যে সব পরিবার আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া, সেই সব পরিবারের শিশুদেরই অপুষ্টির হার বেশি। শুধু বাড়তি ডিম এবং ছাতু দিয়ে এই সমস্যা দূর করা মুশকিল। কিন্তু গ্রামবাসীরা এই দাবি মানতে চাননি। তাঁদের পাল্টা দাবি, পারিবারিক অনটনের জন্যই শিশুদের অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু জেলায় বহু কেন্দ্রই বেহাল। মানা হয় না স্বাস্থ্যবিধান। ফলে, অপুষ্টির দায় ওই দফতরও এড়াতে পারে না।

উলুবেড়িয়া-২ ব্লকের জোয়ারগড়িয়া পঞ্চায়েতের মধুবাটি-রায়পাড়া অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, সেটির নিজস্ব ভবন রয়েছে। শৌচাগার থাকলেও দরজা নেই। ফলে, ছাত্রছাত্রীদের শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হলে মায়েরা তাদের নিয়ে যান মাঠে। কেন্দ্রে নলকূপ না থাকায় জল আনতে হয় দূর থেকে। প্রতি বৃহস্পতিবার ছাত্রছাত্রীদের ভিটামিন খাওয়ানোর কথা। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, আশাকর্মীরা ভিটামিন টনিক পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন। কে ভিটামিন খাওয়াবেন, তা নিয়ে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর সঙ্গে আশাকর্মীদের বিবাদে নিয়মিত ভিটামিন খাওয়ানো হয় না শিশুদের। তা ছাড়া, কোনও শিশু কোনও দিন কেন্দ্রে যেতে না পারলে বাড়িতে তার খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেই।

জেলা প্রশাসন সূত্রে দাবি, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলিকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা চলছে। জানুয়ারি মাসের সমীক্ষায় ১০৭৫টি ‘মারাত্মক অপুষ্ট শিশু’ পাওয়া গেলেও চার মাস আগে সংখ্যাটা ১৩০০ ছিল। ওই সব শিশুর চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হবে। অপুষ্টির কারণ খুঁজতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের বড় হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করানো হবে।

জেলাশাসক শুভাঞ্জন দাস বলেন, ‘‘মারাত্মক অপুষ্ট শিশুর সংখ্যা আমরা কমাচ্ছি। আশা করছি, মে মাসের মধ্যে সংখ্যাটা ৮০০-তে নামাতে পারব। এ দায়িত্ব শুধু অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রেরই নয়। স্বাস্থ্য বিভাগের সহায়তা দরকার।’’

সরকার নানা উদ্যোগের কথা বলছে। কিন্তু আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া ওই সব শিশুদের পরিবারের হাল না ফিরলে কী ভাবে অপুষ্টি পুরোপুরি দূর হবে, সে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। তা ছাড়াও, সমাজকল্যাণ দফতরের আধিকারিকদের একাংশ মনে করছেন, পাঁচ বছর হয়ে যাওয়ার পরে ‘মারাত্মক অপুষ্ট’ যে সব শিশুকে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র ছেড়ে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হতে হয়, সেখানে মিড-ডে মিল মিললেও প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার তারা পায় না। ফলে, পুষ্টির অভাব নিয়েই তাদের বড় হতে হয়।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy