Advertisement
E-Paper

বিরিয়ানি খেয়েই পদ-র ফাঁদে বাবু

বেআইনি অস্ত্র ব্যবসার সূত্রে বন্ধুত্ব। দু’জনেই প্রোমোটিংয়ে নামার পর আরও ঘনিষ্ঠতা। রাজ্যে পালাবদলের পর দু’জনেরই রাতারাতি রাজনৈতিক জার্সি বদল। কিন্তু এই সান্নিধ্যের সুযোগ নিয়েই এক জনকে খতম করতে ত্রুটিহীন টোপ দিয়েছিল অন্য জন। গত বৃহস্পতিবার মধ্যমগ্রামের রাস্তায় বাবু সেনের খুনের ঘটনায় তার সেই পুরনো ‘বন্ধু’ প্রদীপ দেব ওরফে ‘পদ’-কে শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১০ মে ২০১৫ ০২:৫৬
থানায় পদ। ছবি: সুদীপ ঘোষ।

থানায় পদ। ছবি: সুদীপ ঘোষ।

বেআইনি অস্ত্র ব্যবসার সূত্রে বন্ধুত্ব। দু’জনেই প্রোমোটিংয়ে নামার পর আরও ঘনিষ্ঠতা। রাজ্যে পালাবদলের পর দু’জনেরই রাতারাতি রাজনৈতিক জার্সি বদল। কিন্তু এই সান্নিধ্যের সুযোগ নিয়েই এক জনকে খতম করতে ত্রুটিহীন টোপ দিয়েছিল অন্য জন। গত বৃহস্পতিবার মধ্যমগ্রামের রাস্তায় বাবু সেনের খুনের ঘটনায় তার সেই পুরনো ‘বন্ধু’ প্রদীপ দেব ওরফে ‘পদ’-কে শনিবার সন্ধ্যায় পুলিশ গ্রেফতার করেছে। মধ্যমগ্রাম থেকেই তাকে ধরা হয় বলে উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী জানান।

বাবু ও তার ছায়াসঙ্গী নিতাইয়ের খুনে এই নিয়ে ধৃতের সংখ্যা দাঁড়াল দুই। শুক্রবার বিশ্বজিৎ সাহা নামে হৃদয়পুরের এক প্রোমোটারকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এ ছাড়া কামারহাটির জমি-কারবারি বাবু মণ্ডলকেও খুঁজছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যায় টিভি সিরিয়ালের এক অভিনেত্রীর উত্তর কলকাতার বাড়িতে পুলিশ তল্লাশি চালায়। ওই অভিনেত্রী বাবু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ বলে পুলিশের দাবি। শুক্রবারও বাবু মণ্ডলের বক্তব্য ছিল, ‘‘আমায় ফাঁসানো হচ্ছে।’’ শনিবার এই প্রোমোটারের মোবাইল ছিল আগাগোড়া ‘নট রিচেবল’।

তদন্তকারীদের একাংশ মনে করছেন, হত্যা রহস্যের চাবিকাঠি রয়েছে বাবু মণ্ডলের কাছেই। পদ এবং বাবু মণ্ডলের আঁতাঁতেই বাবু সেনকে খুন করা হয়েছে বলে মোটামুটি নিশ্চিত তাঁরা। এই বাবু মণ্ডলের সঙ্গেই প্রোমোটিং নিয়ে গণ্ডগোল মেটাতে মধ্যমগ্রামে পদ-র বাড়িতে বৃহস্পতিবার দুপুরে বাবু সেনকে ডাকা হয়েছিল। বাবু মণ্ডলের প্রতিনিধি হাজির ছিল সেই বৈঠকে। কিন্তু পুলিশ বলছে, ওই বৈঠক আসলে ফাঁদ।

Advertisement

কেন? তদন্তকারী এক অফিসার বলেন, ‘‘বাবু সেনরা পদ-র বাড়ি থেকে বেরিয়ে কখন মধ্যমগ্রাম স্টেশন থেকে ডান দিকে বেঁকল, কখন উড়ালপুলের দিকে গেল, সব খবরই আততায়ীরা পাচ্ছিল। প্রতি ইঞ্চি গতিবিধির খবর তাদের দিচ্ছিল পদ-র লোকজন।’’ এমনকী, ঘাতকদের মধ্যে পেশাদার বন্দুকবাজদের পাশাপাশি পদ-র লোকজনের থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

এর আগে মধ্যমগ্রাম, বারাসত এলাকার বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পদ-কে পুলি‌শ একাধিক বার গ্রেফতার করেছিল। প্রত্যেক বারই সে জামিনে ছাড়া পায়। যত জনের খুনের সঙ্গে পদ-র নাম জড়িয়েছে, তাদের প্রায় সকলেই খুন হওয়ার আগে পদ-র বাড়ি বা ডেরায় ভূরিভোজ খেয়েছেন। বৃহস্পতিবার বাবু সেনদের জন্যও বিরিয়ানি-সহ জম্পেশ মোগলাই খানার বন্দোবস্ত ছিল।

কিন্তু কে এই পদ?

পুলিশ জানায়, বামফ্রন্ট আমলে লেকটাউন এলাকার একদা ত্রাস পিনাকী বিভিন্ন অপরাধের পর গা ঢাকা দিত মধ্যমগ্রাম বা হৃদয়পুরে। সেই সূত্রেই পিনাকীর সঙ্গে পদ-র ঘনিষ্ঠতা হয়। পিনাকীর এক সময়ের ডান হাত বাবু শঙ্কর এক বার তার পিস্তল চুরি করে। রাগে অন্ধ পিনাকী তখন বাবু শঙ্করকে খতম করতে কাজে লাগায় পদ-কে। ভয়ঙ্কর অপরাধে সে-ই প্রথম হাতেখড়ি পদ-র। এর পর আরও খুন ও তোলাবাজির ঘটনায় জড়াতে থাকে তার নাম। পাশাপাশি জমি-বাড়ির সিন্ডিকেট, প্রোমোটিংয়ের রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসে সে।

এক যুগেরও বেশি আগে বাবু সেনের সঙ্গে পদ-র আলাপ। সেই বাবুকে খতম করতে পদ অন্যতম প্রধান ভূমিকা নিল কেন?

পুলিশ সূত্রের খবর, প্রোমোটিং-ব্যবসায় জাঁকিয়ে বসতে বাবু মণ্ডলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট-এর প্রধান কাঁটা ছিল বাবু সেন। পদ-ও বুঝেছিল, মধ্যমগ্রামে জমি-বাড়ি-ফ্ল্যাটের কারবারের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে হলে বাবু সেন-ই একমাত্র বাধা। পদ-র বারণ সত্ত্বেও তার এলাকায় জমি-বাড়ির ব্যাপারে নাক গলাতে শুরু করেছিল বাবু সেন। উপরন্তু পদ-র শত্রু ঢাকাই গৌতম ও তার দলবলকে অস্ত্র বেচতে শুরু করেছিল বাবু সেন। পদ এ নিয়ে অসন্তোষ জানালে বাবু জানিয়ে দিয়েছিল, সে পেশাদার ব্যবসায়ী। বন্দুক-পিস্তল কে কিনছে, তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। ফলে পদ আরও ক্ষেপে যায়।

এর মধ্যে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে বাবু সেনের বিরুদ্ধে সুরজিৎ দাস নামে এক যুবককে খুনের অভিযোগ ওঠে। এক পুলিশ অফিসার জানান, বাবু সেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন সুরজিতের ভাই বিশ্বজিৎ। তবে তত দিনে পুলিশ ও শাসক দলের একাংশের সঙ্গে বাবু সেনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। সেই সুবাদে বিশ্বজিৎকে গাঁজার কারবারের মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পাঠায় বাবু সেন। জেলেই বিশ্বজিতের সঙ্গে পদ-র এক ভাইয়ের আলাপ হয়। দু’জনে ঠিক করে, বাবু সেনকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে এবং পদ-কেও সেটা বোঝাতে হবে।

ভাইয়ের সঙ্গে আলাপের সূত্রে পদ ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয় বিশ্বজিতের সঙ্গে।
বিশ্বজিৎকেও পুলিশ খুঁজছে। সে-ই সেতুবন্ধনের কাজটা করে। তার উদ্যোগেই বাবু মণ্ডল ও পদ একজোট হয়ে যায় বাবু সেনের বিরুদ্ধে।

বাকিটা নিখুঁত অপারেশন!

madhyamgram promoter murder case madhyamgram murder accused arrested promoter babu sen prime accused pradip deb arrested
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy