ক’দিন আগেও বৌদির রান্না ছাড়া খাবার ছাড়া মুখে রুচি আসত না নূরউদ্দিন মল্লিকের। ভালমন্দ খাবারের বাটি যাতায়াত করত এ-বাড়ি, ও-বাড়ি। এখন অবশ্য সে সবের বালাই নেই। বরং দুই পরিবারের মধ্যে অদৃশ্য একটা পাঁচিল উঠে গিয়েছে। পঞ্চায়েত ভোটের পরেও সেই পাঁচিল ভাঙবে কি না বলা মুশকিল।
ভাতার ব্লকের বামুনাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজিপুর গ্রামে তৃণমূল প্রার্থী জোলেখা মল্লিকের বিরুদ্ধে ফুটবল চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়েছেন বড় দেওর নূরউদ্দিন মল্লিক। নির্দল হলেও নুরউদ্দিন আসলে তৃণমূল কর্মী। ভাতারের গোষ্ঠী রাজনীতিতে জোলেখা মল্লিকের স্বামী সামসুদ্দিন বর্তমানে তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক বনমালী হাজরার অনুগামী। তিনি একটা সময়ে বনমালীবাবুর বিরোধী হিসাবে পরিচিত, পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থী মানগোবিন্দ অধিকারীর শিবিরে ছিলেন। স্থানীয় সূত্রের খবর, বাড়ির মেজ ছেলে সামসুদ্দিন তৃণমূলের শিবির বদল করলেও মানগোবিন্দের হাত ছাড়েননি সেজ ছেলে নূরউদ্দিন। তৃণমূলের গোষ্ঠী রাজনীতিতে মানগোবিন্দের অনুগামীরা বামুনাড়া পঞ্চায়েতে টিকিট পাবে ধরে নিয়ে নূরউদ্দিন আগাম মনোনয়ন জমা করে ফেলেন। কিন্তু, জেলা থেকে ব্লক—বিভিন্ন স্তরে বৈঠকের পর দেখা যায় ওই এলাকায় বনমালীবাবুর অনুগামীরাই প্রতীক পেয়েছেন। তখন সামসুদ্দিন তাঁর স্ত্রী জোলেখাকে তৃণমূলের হয়ে মনোনয়ন করান।
জোলেখার দাবি, “আমাদের মধ্যে খুব মিল ছিল। আমার হাতে রান্না খেতে ভালবাসত দেওর। বছর খানেক শ্বশুরের ভিটে ছেড়ে নতুন বাড়ি করে আসার পরেও মাছ-মাংস, ভাল জলখাবার ওই বাড়ি যেত। তেমনি ও বাড়ি থেকেও খাবার আসত। মনোনয়ন তুলে নিলে আর কোনও সমস্যা থাকত না।” নূরউদ্দিনের স্ত্রী রোকসেনা বেগমের কথায়, “আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে খুব মিল ছিল। কোথা থেকে কী যে হয়ে গেল!” জোলেখার নামে গ্রামে বেশ কয়েকটা দেওয়াল লিখন হয়েছে। আপনি কবে দেওয়াল লিখবেন বা প্রচার করবেন? কিছুটা বিষণ্ণ গলায় নূরউদ্দিন বলছেন, “গ্রামের মানুষ আমাকে চেয়েছিল বলেই তৃণমূলের হয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু দল প্রতীক দেয়নি। মানসম্মানের কথা ভেবে আর মনোনয়ন প্রত্যাহার করিনি।”
তবে, ভাইয়ের উপরে একটু রেগেই আছেন সামসুদ্দিন। তাঁর কথায়, “ভাইয়ের জমির দখল ওঠাতে গিয়ে আমরা জেল খাটলাম। বউদির বিরুদ্ধে সেই ভাই-ই দাঁড়াল! ভাবতেই পারছি না। গ্রামের মানুষকে কী জবাব দেব? সিপিএম-বিজেপির হয়ে দাঁড়ালেও না হয় কথা ছিল। তা বলে নির্দল! আমার ভাইটা খুব ভাল ছিল, কেন এমন করল?” এর পরেই তাঁর হুঁশিয়ারি, লড়াই যখন শুরু হয়েছে, তখন ছেড়ে কথা নয়। ভোটের দিন বুথের কাছেই ঘেঁষতে দেব না! যা শুনে নূরউদ্দিনের দাবি, “বুথ দখল করতে গেলে গ্রামের মানুষই বাধা দেবেন। তবে ভোটে যে জিতবে, সে কিন্তু তৃণমূলই থাকবে।”
পরিবারের মধ্যে রাজনীতির ‘অনুপ্রবেশ’ যে খারাপ হতে চলেছে, তা আগাম আঁচ পেয়েছিলেন সামসুদ্দিন-নূরউদ্দিনের বাবা আব্দুল মান্নান মল্লিক। তিনিও বলছেন, “সেজ ছেলেকে মনোনয়ন তুলে নিতে বলেছিলাম। শুনল না তো।”