এক নেতা কর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে ইঙ্গিতে বোঝাচ্ছেন, প্রার্থী হিসেবে তাঁর নামেই সিলমোহর দেবে দল। আর এক নেতা অন্য একটি এলাকায় বাইক মিছিল করে বার্তা দিচ্ছেন, যে যাই বলুক, সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে তাঁর হাতেই। তিনিই প্রার্থী হতে চলেছেন।
প্রথম জন মন্তেশ্বরের বিধায়ক তথা রাজ্যের গ্রন্থগার মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। দ্বিতীয় জন মন্তেশ্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি আহমেদ হোসেন শেখ। ঘটনাচক্রে যাঁদের অহি-নকুল সম্পর্কের কথা অজানা নয় কারও। সিদ্দিকুল্লা, নাকি আহমেদ— এ বার বিধানসভা ভোটের টিকিট কার হাতে যাবে, তা নিয়ে জল্পনা তীব্র হচ্ছে। চর্চায় উঠে আসছে, তৃতীয় মতও— দুই নেতার দ্বন্দ্বে ‘নেপোয় দই’ মারবে তৃতীয় কেউ। জেলা তৃণমূল সভাপতি রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের অবশ্য কোনও বিতর্কে জড়াতে নারাজ। তাঁর উত্তর, ‘‘কোন কেন্দ্রে কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে দলই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’’
গত বিধানসভা নির্বাচনে মন্তেশ্বর কেন্দ্রে তৃণমূল জয়লাভ করে ৩১,৮০৫ ভোটে। ব্যবধানের নিরিখে পূর্ব বর্ধমানে যা ছিল সর্বাধিক। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে এই ব্যবধান আরও বেড়ে হয় ৪৬,৬২২। তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, আগে মন্ত্রীর সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির সম্পর্ক আক্ষরিক অর্থেই মধুর ছিল। পরে নানা বিষয়ে মতানৈক্য প্রকট হয়। পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তাঁরা। সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে ২০২৫-র অগস্টে, যখন মন্ত্রীর গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির অনুগামীদের বিরুদ্ধে। ‘মন্ত্রীকে এলাকায় দেখা পাওয়া যাওয়া না’ অভিযোগ তুলে সরব হন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির অনুগামীরা। ওই ঘটনার ঠিক আগেই পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির ঘরে সরকারি ইঞ্জিনিয়ারদের মারধরের অভিযোগ ঘিরে সরগরম হয়েছিল গোটা মন্তেশ্বর। সরব হয়েছিলেন মন্ত্রীও। কয়েক মাস আগে অন্তর্কলহ এতই তীব্র হয় যে, মন্তেশ্বরের একটি বৈঠক নিরাপত্তার কারণে সরিয়ে আনা হয় মহকুমাশাসকের কার্যালয়ে।
সম্প্রতি মন্ত্রীকে নিজের কেন্দ্রে সক্রিয় হতে দেখা গিয়েছে। পঞ্চায়েত এলাকায় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তৃণমূল সূত্রের খবর, অনুগামীদের সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রী জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী (মমতা বন্দ্যেপাধ্যায়) ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক) সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। মন্তেশ্বর কেন্দ্রে তাঁর প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে তিনি আগ বাড়িয়ে এ নিয়ে কিছু ঘোষণা করতে চান না। বৃহস্পতিবার মন্ত্রী বলেন, ‘‘মন্তেশ্বরের কাছাকাছি থাকি। এই কেন্দ্রে পাঁচ বছর কাজ করেছি। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে। কাটোয়ার করজ গ্রামে একটি বড় মাদ্রাসা চালাই। মন্তেশ্বর কেন্দ্র ছাড়তে চাইছি না। মুখ্যমন্ত্রীকে মন্তেশ্বর ছাড়া অন্য কোন কেন্দ্রে টিকিট না দেওয়ার কথা বলেছি। উনি বলেছেন, ঠিক আছে দেখব।’’ দল তাঁকে অন্য কেন্দ্রে প্রার্থী হতে বললে কী করবেন? কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলেন, ‘‘উত্তর দেব না। নেগেটিভে যাচ্ছ কেন?’’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মন্তেশ্বরে জমিয়তে উলেমায়ে হিন্দের ভাল প্রভাব রয়েছে। সংগঠনের রাজ্য সভাপতি খোদ সিদ্দিকুল্লা।
আহমেদ নিজে প্রার্থিপদ বিতর্কে মন্তব্য করতে না চাইলেও নেতৃত্বের উপরে চাপ তৈরি করে চলেছেন তাঁর অনুগামীরা। তাঁদের যুক্তি, সাংগঠনিক ক্ষমতা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির হাতে থাকায় তাঁকেই প্রার্থী করা উচিত দলের। জেলার প্রভাবশালী কিছু নেতা আহমেদের হয়ে ব্যাট ধরেছেন। প্রভাবশালী এক নেতার কথায়, ‘‘মন্তেশ্বর ব্লকের মধ্যে রয়েছে পূর্বস্থলী উত্তর কেন্দ্রের তিনটি পঞ্চায়েত। লোকসভা ভোটে ওই তিন পঞ্চায়েতে দল খুব বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিল না। মন্তেশ্বরের পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিকে প্রার্থী করা পূর্বস্থলী উত্তর কেন্দ্রেও জয় নিশ্চিত।’’
আহমেদ অনুগামী বলে পরিচিত, পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ রাকিবুল শেখ রাখঢাক না করেই বলেন, ‘‘এলাকার মানুষ সারা বছর বিধায়ককে পান না। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মানুষের আপদে বিপদে থাকেন। ভূমিপুত্রকেই প্রার্থী হিসাবে দেখতে চাই।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)