এক পক্ষ আশায় আছে শহরের ভোটের দিকে তাকিয়ে। অন্য পক্ষ আস্থা রাখছে গ্রামীণ এলাকার ভোট ব্যাঙ্কে। রানিগঞ্জ বিধানসভা আসন নিয়ে এমন অঙ্ক কষা শুরু করে দিয়েছে শাসক ও বিরোধী, দু’পক্ষই।
রানিগঞ্জ বরাবরই বামেদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ১৯৬২ সালে কংগ্রেসের হাত থেকে এই আসনটি ছিনিয়ে নেয় তারা। সে বার জিতে বিধায়ক হন লক্ষ্মণ বাগদি। সীমানা পুনর্বিন্যাসের পরে উখড়া বিধানসভা আসন তৈরি হলে ১৯৬৭ সালে সেখান থেকে জেতেন লক্ষ্মণবাবু। তবে রানিগঞ্জ আসনটি দখলে রেখে দেয় সিপিএম। ২০১১ পর্যন্ত তা ছিল তাদের দখলেই। রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন পুরসভা রানিগঞ্জও ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে টানা দখলে রেখেছিল বামেরা। গত বছর সেই পুরসভা আসানসোল, কুলটি ও জামুড়িয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে পুরনিগম গড়ে তোলা হয়েছে। গত বিধানসভা ভোটে অবশ্য রানিগঞ্জ আসন বামেদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে তৃণমূল। সিপিএম প্রার্থী রুনু দত্তকে হারিয়ে দিয়েছিলেন তৃণমূলের সোহরাব আলি। কিন্তু এ বার এই আসন নিয়ে বামেরা যথেষ্ট আশাবাদী। তার পিছনে যথেষ্ট কারণও রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলের এক সিপিএম নেতা জানান, গত বার পরিবর্তনের হওয়ার মধ্যেও রানিগঞ্জে তৃণমূলের কাছে তাঁরা হেরেছিলেন মাত্র সাড়ে সতেরোশো ভোটে। কিন্তু পুর এলাকায় প্রায় ছ’হাজার ভোটে এগিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু এই বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত অন্ডালের আটটি পঞ্চায়েতের মধ্যে চারটিতে তৃণমূলের থেকে অনেক ভোটে পিছিয়ে পড়ে সিপিএম। অন্ডাল, শ্রীরামপুর, রামপ্রসাদপুর ও মদনপুর পঞ্চায়েতে সিপিএম ধরাশায়ী হওয়ায় তৃণমূল জিতে যায়।
লোকসভা ভোটের ফলের নিরিখে এই কেন্দ্রে এগিয়েছিল বিজেপি। সিপিএমের থেকে তৃণমূল হাজার তিনেক ভোট বেশি পেয়েছিল। সিপিএম নেতাদের দাবি, সেই সময়ে বিজেপির উত্থানের জেরেই তাঁদের খানিকটা ভোট কমেছিল। তবে পরে তা সামাল দেওয়া গিয়েছে। বিজেপিতে চলে যাওয়া ভোটের অনেকটাই আবার গত বছর পুরভোটে দলের দিকে ফিরে এসেছে বলে তাঁদের দাবি। পুরভোটে রানিগঞ্জের ১১টি ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটিতে জয়ী হয় বামেরা। তবে মোট প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে তৃণমূলের থেকে এগিয়েছিল তারা। প্রায় দু’হাজার ভোট বেশি পায় বামেরা। আর এই পরিসংখ্যানই আশা জাগাচ্ছে সিপিএমে। তার উপরে এ বার কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতার পরিস্থিতিতে তাদের ভোট আরও বাড়বে বলে আশা করছেন দলের নেতারা।
এ বারও এই কেন্দ্রে সিপিএমের প্রার্থী রুনুবাবু। জেলা সিপিএমের এক নেতা বলেন, ‘‘পুরভোটে রানিগঞ্জে রুনুবাবুর নেতৃত্বে ফল খারাপ হয়নি। এলাকায় তাঁর ভাবমূর্তিও ভাল। তাই তিনি এ বার জয়ী হবেন বলে মনে করা হচ্ছে।’’ এলাকায় তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বও হাসি ফোটাচ্ছে সিপিএম নেতাদের মুখে। রুনুবাবু ইতিমধ্যে প্রচারে নেমে পড়েছেন। তিনি দাবি করেন, “সন্ত্রাস ও রিগিং না হলে পুরভোটে আমরা আরও চারটি আসনে জিততাম। নির্বাচন কমিশন এ বার অবাধ ভোটের ব্যবস্থা করতে পারলে আমরা এই পুর এলাকাতেই দশ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে যাব। অন্ডালেও আমাদের ফল ভাল হবে। মানুষের সঙ্গে কথা বললে এমন ইঙ্গিতই মিলছে।”
গত বার জয়ী তৃণমূল প্রার্থী সোহরাব রেলের একটি লোহা চুরির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় এ বার তাঁকে প্রার্থী করেনি দল। বদলে টিকিট দেওয়া হয়েছে তাঁর স্ত্রী নার্গিস বানোকে। এই কেন্দ্র নিজেদের দখলে রাখা নিয়ে অবশ্য আশাবাদী শাসক দল। তাদের অন্ডাল ব্লক সভাপতি কাঞ্চন মিত্র জানান, ২০০৮ সালে অন্ডাল, শ্রীরামপুর ও রামপ্রসাদপুর পঞ্চায়েত তাঁদের দখলে ছিল। ২০১৩-তে কাজোড়ো ও খান্দরা পঞ্চায়েত ছাড়া আর কোথাও বামেরা জিততে পারেনি। সেই কাজোড়াতেও আবার সিপিএমের এক পঞ্চায়েত সদস্য তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় বছর দুয়েক আগে পঞ্চায়েত তাঁদের দখলে এসেছে। কাঞ্চনবাবুর বক্তব্য, ‘‘আমাদের যা হিসেব, অন্ডাল ব্লকেই আমরা হাজার পনেরো ভোটে এগিয়ে যাব।’’
পুরভোটে সন্ত্রাসের অভিযোগ নিয়ে সোহরাব আলির প্রতিক্রিয়া, ‘‘রানিগঞ্জে সন্ত্রাস হলে সিপিএম একটি আসনও পেত না।’’ পুর এলাকায় সিপিএমের বেশি ভোট পাওয়ার দাবি প্রসঙ্গে সোহরাবের বক্তব্য, ‘‘ওরা ক্ষমতায় এলে পুরনো এই পুর এলাকাকে আগের ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেওয়া হবে, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচটি ওয়ার্ডে জিতেছিল। কিন্তু এই ক’দিনেই মানুষের ভুল ভেঙেছে। রানিগঞ্জ পুর এলাকাতেও এ বার আমাদের পাল্লা ভারী।’’