পুজোর আর একমাসও দেরি নেই। নাওয়া-খাওয়া ভুলে মৃৎশিল্পীরা গড়ে তুলছেন দেবী প্রতিমা। কিন্তু, প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন কাঁচামালের দাম একলাফে যতটা বেড়েছে প্রতিমার দাম তেমন বাড়েনি। অনেক শিল্পীরই আশঙ্কা, প্রতিমার গুণমান ঠিক রাখা যাবে তো?
শিল্পীরা জানান, বাঁশ স্থানীয় ভাবে মিললেও শোলা, মাটি, রং সবই কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি দরে কিনতে হয়। এ বছর বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে পরিবহণ খরচও। বেড়েছে শিল্পীদের সহকারিদের মজুরিও।
প্রতিমা তৈরির জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল মাটিরই আকাল এ বার। বর্ধমান শহরের শ্যামলাল এলাকার মৃৎশিল্পী সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এখন হাওড়ার উলুবেরিয়া থেকে মাটি আনতে হচ্ছে। মাটির দর সম্পর্কে সঞ্জীববাবুর বক্তব্য, ‘‘গত বছর এক ট্রাক মাটির দাম ছিল ১০ হাজার টাকা। এ বার তা ১২ হাজারে দাঁড়িয়েছে।’’ পারবীরহাটার মৃৎশিল্পী উত্তম পাল জানান, ডায়মন্ডহারবার থেকে মাটি আনতেও আগের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি খরচ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দামোদরের ক্যানাল পাড় থেকে আগে পলি মাখানো মাটি ১০ টাকা প্রতি বস্তায় মিললেও, তার দর এখন ১৩ টাকা।
এ ছাড়া কাঠামো তৈরির জন্য দরকারি মুলি বাঁশের দামও বেড়েছে গড়ে ৫ টাকা করে। বিভিন্ন কাজে দরকারি সুতলি দড়ির দর বেড়েছে কেজি প্রতি ১৫ টাকা।
পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রঙের দামও। শিল্পীরা জানান, মূলত কলকাতা থেকেই রং কেনা হয়। এ বার কিলোগ্রাম প্রতি রঙের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০০ টাকার মতো। দাম বেড়েছে প্রতিমা সাজানোর জন্য দরকারি শোলারও। শিল্পীরা জানান, আগে দুর্গা, কার্তিক, গণেশ-সহ সবকটি প্রতিমা সাজাতে খরচ হতো ১৮০০ থেকে ১৯০০ টাকা। এখন তা কিছুতেই ২৫০০ টাকার কম হচ্ছে না। কাটোয়ার বনকাপাসির শিল্পী বঙ্কিম গড়াই বলেন, ‘‘কলকাতার বিধাননগরে দু’হাত দড়ির বের বিশিষ্ট শোলার বান্ডিলের দাম গড়ে ২০০ টাকা ও ছোট শোলার সেট গড়ে দেড়শো টাকা বেড়ে গিয়েছে।’’
শিল্পীদের কথার সমর্থন মিলল কাঁচামাল বিক্রেতাদের বক্তব্যেও। বর্ধমানের বিসি রোডে পঞ্চাশ বছর ধরে প্রতিমার রং, সাজপোশাক, জরি প্রভৃতির ব্যবসা করছেন বৈদ্যনাথ দে। তিনি বলেন, ‘‘দাম বাড়ার জেরে খদ্দেররা আগের তুলনায় পরিমাণে অনেকটাই কম করে সামগ্রী কিনছেন।’’
এর সঙ্গে সমস্যা বেড়েছে, সুলভে প্রতিমা শিল্পীদের সহকারি না মেলায়। মিললেও তাদেরকে গত কয়েক বছরের তুলনায় খানিকটা বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে। প্রতিমায় শেষ তুলির টান দিতে আসা প্রধান কারিগরের মজুরিও গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় হাজার টাকা বেড়েছে বলে দাবি।
কিন্তু আচমকা কাঁচামালের দাম বাড়ল কেন? শিল্পীদের দাবি, মুলি বাঁশের উৎপাদন কম। তা ছাড়া এই ধরনের বাঁশের চাহিদা নির্মাণ শিল্পের বিভিন্ন কাজেও বেড়েছে। মাটি কমার পিছনে যুক্তি হিসেবে শিল্পীদের বক্তব্য, এলাকায় ইটভাটার সংখ্যা বেড়েছে। তবে রঙের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে বিক্রেতাদের বক্তব্য, মুম্বই, আহমেদাবাদ, কানপুর থেকে আনা রঙের পাইকারি দর গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ খানিকটা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও।
কাঁচামালের দাম বাড়লেও প্রতিমার দাম তেমন ভাবে বাড়েনি বলেই দাবি শিল্পীদের। খালুইবিল মাঠ এলাকার শিল্পী সমীর পালের দাবি, ‘‘সামগ্রিক ভাবে মুর্তি তৈরির কাঁচামালের দাম ২০ শতাংশের কাছাকাছি বাড়লেও প্রতিমার দাম বাড়াতে পারিনি।’’ গত বছর একটি দুর্গার একটি ছোট প্রতিমা ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে। এ বারও দর একই রয়েছে বলে দাবি শিল্পীদের।
তার সঙ্গে এ বার অনেক পুজো কমিটিই প্রতিমা তৈরির জন্য বরাদ্দ কমিয়েছেন। বড়নীলপুরের পুজোর আয়োজক জানান, প্রতিমার জন্য এ বার গতবছরের তুলনায় ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কা, কী ভাবে প্রতিমার গুণমান বজায় রাখা যাবে? ক্রেতাদের অনেকেরই আশঙ্কা, প্রতিমার গুণমান ও রঙের উজ্জ্বলতা আগের থেকে অনেকটাই কমবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিল্পীরও আশঙ্কা, প্রতিমার গায়ে এ বার হয়তো মোটা কাপড় দিতে হবে। বাঁশের কাঠামোও আগের তুলনায় পাতলা হতে পারে। খরচ সামলাতে খড়ও ফাঁপিয়ে বাঁধার ভাবনাচিন্তা করছেন অনেক শিল্পীই।
শঙ্কা রেখেই এ বার তাই বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইছেন শিল্পীরা!